ISLAMIC

COLLECTED BY
Adv. N.U.MIAZI
Special thanks to quraneralo.com

বিদ’আতের অর্থ এবং তার কুপ্রভাব
Posted by MUKTER ZAMAN • নভেম্বর 17, 2012 • Printer-friendly
Download article as PDF

প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না
বিদ’আতের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে “নযীরহীনভাবে কিছু নব আবিস্কার করা ।” যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেছেন : “তিনি (নযীরবিহীন) আসমান ও যমীনের স্রষ্টা” সূরা বাকারাহ /১১৭
পারিভাষিক অর্থে বিদ’আত বলা হয় : “ধর্মের মধ্যে যে নবাবিস্কৃত ইবাদাত , বিশ্বাস ও কথার সমর্থনে কুরআন ও সুন্নাহের মধ্যে কোন দলীল মিলে না অথচ তা ছাওয়াবের উদ্দেশ্যে করা হয় তাকেই বিদ’আত বলা হয় ।”
ব্যক্তি , সমাজ , ধর্মীয় মাসআলা মাসায়েলের উপর বিদ’আতের কুপ্রভাব অত্যন্ত ভয়ানক । তবে বিদ’আতের স্তর রয়েছে । স্তরভেদে বিদ’আতের ক্ষতিকর কুপ্রভাবগুলো প্রযোজ্য । একটি কথা মনে রাখতে হবে ক্ষেত্র বিশেষে বিদ’আতকে যত ছোটই ভাবা হোক , তা রাসূল (সাঃ) এর এ (শরী’আতের মাঝে প্রত্যেক নবাবিস্কারই বিদ’আত আর প্রত্যেক বিদ’আত ভ্রষ্টতা আর প্রত্যেক ভ্রষ্টতার পরিণাম জাহান্নাম) বাণীর আওতা হতে কোন অবস্থাতেই বের হবে না । অতএব বিদ’আতের ভয়ানক ক্ষতিকর কুপ্রভাবগুলো আমাদের জানা দরকার । এ করণেই নিম্নে সংক্ষেপে সেগুলো উল্লেখ করা হলঃ
আল্লামাহ শাতেবী (রহঃ) সহ অন্যান্য ইসলামী বিশেষজ্ঞগণ বিদ’আতের যে সব কুপ্রভাব উল্লেখ করেছেন সেগুলো নিম্নরুপঃ
১. বিদ’আতীর কোন আমল কবুল করা হবে না : রাসূল (সাঃ) বলেছেন : “যে ব্যক্তি দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু আবিষ্কার করবে বা কোন নবাবিষ্কারকারীকে আশ্রয় দিবে তার উপর আল্লাহ এবং সকল ফেরেশতা ও মানুষের অভিশাপ……. তার ফরয ইবাদাত বা তাওবাহ , নফল ইবাদাত বা ফিদইয়া কবুল করা হবে না ….।” বুখারী , কিতাবুল জিযিয়াহ , হা/৩১৮০ ।
ইমাম আওযা’ঈ বলেন কোন কোন বিশেষজ্ঞ আলেম বলেছেন : বিদ’আতীর সালাত , সিয়াম , সাদাকাহ , জিহাদ , হাজ্জ , উমরাহ , কোন ফরয ইবাদাত বা তাওবাহ , নফল ইবাদাত বা ফিদইয়া গ্রহণযোগ্য হবে না । অনুরুপ কথা হিশাম ইবনু হাস্সানও বলেছেন ।
আইউব আস-সুখতিয়ানী বলেন : বিদ’আতী তার প্রচেষ্টা যতই বৃদ্ধি করবে আল্লাহর নিকট হতে তার দূরত্ব ততই বৃদ্ধি পাবে ।
এছাড়া যে বিদ’আতকে পছন্দ করে তার ধারনা শরীয়ত পূর্ণ নয় , অথচ আল্লাহ তা’আলা বলেছেন : “আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করে দিয়েছি” সূরা মায়েদা/২ ) কারণ তার নিকট যদি দ্বীন পরিপূর্ণ হয়ে যেয়েই থাকে তাহলে সে শরীয়তের মধ্যে নতুন কিছুর প্রবেশ ঢুকাবে কেন বা তাকে অবহিত করার পরেও কেনই বা বিদ’আতের উপর আমল করবে ।
২. বিদ’আত পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত বিদ’আতীর কোন প্রকার তওবাহ করার সুযোগ জুটবে না : “আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক বিদ’আতির বিদ’আতকে পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তওবার পথ রুদ্ধ করে দিয়েছেন” – সহীহ আত তারগীব ওয়াত তারহীব ১/১৩০পৃ হাদীস নং ৫৪ ।
৩. বিদ’আতী নবী (সাঃ) এর হাওযে কাওসারের পানি পান করা হতে বঞ্চিত হবে : আবু হাসেম হতে বর্ণিত , তিনি বলেন আমি সাহালকে বলতে শুনেছি তিনি রাসূল (সাঃ) কে বলতে শুনেছেন , “আমি তোমাদের পূর্বেই হাওযে কাওসারের নিকট পৌঁছে যাব । যে ব্যক্তি সেখানে নামবে এবং তার পানি পান করবে সে আর কখনও পিপাসিত হবে না । কতিপয় লোক আমার নিকট আসতে চাইবে , আমি তাদেরকে চিনি আর তারাও আমাকে চেনে । অতঃপর আমার ও তাদের মধ্যে পর্দা পড়ে যাবে । রাসূল (সাঃ) বলবেন : তারা তো আমার উম্মাতের অন্তর্ভুক্ত । তাকে বলা হবে আপনি জানেন না আপনার পরে তারা কি আমল করেছে । তখন যে ব্যক্তি আমার পরে (দ্বীনকে) পরিবর্তন করেছে তাকে আমি বলবো : দূর হয়ে যা , দূর হয়ে যা” সহীহ মুসলিম হা/৪২৪৩ ।
৪. বিদ’আতী অভিশপ্ত : কারণ রাসূল (সাঃ) বলেছেন : “যে ব্যক্তি দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু আবিস্কার করবে বা কোন নবাবিস্কারকারীকে আশ্রয় দিবে তার উপর আল্লাহ এবং সকল ফেরেশতা ও মানুষের অভিশাপ ।” বুখারী , কিতাবুল জিযিয়াহ , হা/৩১৮০ ।
৫. বিদ’আতীর নিকট যাওয়া ও তাকে সম্মান করা ইসলামকে ধ্বংস করার শামিল : পূর্বোল্লিখিত হাদীসটিই এ দলীল হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে । ( যদিও আল্লামাহ শাতেবী (রহঃ) একটি দূর্বল হাদীস দ্বারা দলীল দিয়েছেন ।) কারণ বিদআতীকে আশ্রয় দিলেই তাকে সম্মান করা হয় । আর যখন এ কারণে ইবাদাতগুলো কবুল করা হয় না , তখন আশ্রয়দানকারী তার ইসলামকে যে ধ্বংস করে দিল তাতে কোন সন্দেহ নেই ।
বিশিষ্ট তাবে’ঈ হাসসান ইবনু আতিয়াহ (রহঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে তিনি বলেন : “কোন সম্প্রদায় যখন তাদের দ্বীনের মধ্যে কোন বিদ’আত চালু করে তখন আল্লাহ তা’য়ালা তাদের থেকে অনুরুপ একটি সুন্নাতকে উঠিয়ে নেন । অতঃপর কিয়ামাত পর্যন্ত তাদের নিকট সুন্নাতটি আর ফিরিয়ে দেন না” । -মুকাদ্দিমা দারেমী ।
আরো এসেছে যে , “কোন ব্যক্তি ইসলামের মধ্যে কোন প্রকার বিদ’আত চালু করলেই সে তার চেয়ে উত্তম সুন্নাতকে পরিত্যাগ করে” । – আল ইতিসাম ১/১৫৩ ।
ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন : “প্রত্যেক বছরই লোকেরা একটি করে বিদ’আত চালু করবে আর একটি করে সুন্নাতকে মেরে ফেলবে । শেষ পর্যন্ত বিদ’আত জীবিত হবে আর সুন্নাতগুলো মারা যাবে” । -আল ইতিসাম ১/১৫৩ ।
৬. আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিকট হতে বিদ’আতীর দূরত্ব বাড়তেই থাকবে : হাসান বছরী হতে বর্ণিত , তিনি বলেন : বিদ’আতী সালাত , সিয়াম ও ইবাদাতে যতই তার প্রচেষ্টা বৃদ্ধি করবে ততই আল্লাহর নিকট হতে তার দূরত্ব বৃদ্ধি পাবে ।
আইউব আস-সুখতিয়ানী বলেন : বিদ’আতী তার প্রচেষ্টা যতই বৃদ্ধি করবে আল্লাহর নিকট হতে তার দূরত্ব ততই বৃদ্ধি পাবে ।
রাসূল (সাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসেও এ অর্থের ইঙ্গিত বহন করছে । তিনি খারেজিদের সম্পর্কে বলেছেন : “…… তারা দ্বীনের মধ্য হতে এমনভাবে বেরিয়ে যাবে যেমনভাবে তীর ধনুক হতে বেরিয়ে যায় ।” (বুখারী , মুসলিম) ।
এ বেরিয়ে যাওয়া তাদের বিদ’আতের কারণেই । এ হাদীসের মধ্যেই বলা হয়েছে “অথচ তাদের সালাত ও সিয়ামের তুলনায় তোমাদের সালাত ও সিয়ামগুলোকে তোমরা তুচ্ছ মনে করবে” ।
৭. বিদ’আত ইসলামী লোকদের মাঝে দুশমনী , ঘৃণা , বিভেদ ও বিভক্তি সৃষ্টি করে : কারণ বিদ’আত লোকদেরকে বিভক্তির দিকে আহবান করে , কুরআন তারই প্রমাণ দিচ্ছে । আর এ থেকেই দুশমনী ও ঘৃণার সৃষ্টি হয় । আল্লাহ তা’য়ালা বলেন : “তোমরা সেই সব লোকদের মত হয়ো না যারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং তাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণাদি আসার পরেও মতভেদ করেছে , তাদের জন্য রয়েছে ভয়ংকর আযাব” – সূরা আলে-ইমরান : ১০৫ ।
তিনি আরও বলেন : “নিশ্চয় এটিই আমার সোজা সরল পথ তোমরা তারই অনুসরণ কর , তোমরা বহু পথের অনুসরণ করো না , কারণ তা তোমাদেরকে তাঁর এক পথ হতে বিচ্ছিন্ন করে দিবে” – সূরা আন’আম : ১৫৩ ।
তিনি আরও বলেন : “নিশ্চয় যারা তাদের দ্বীনকে খন্ড-বিখন্ড করেছে এবং তারা দলে দলে বিভক্ত হয়ে গেছে আপনি তাদের কোন কিছুতেই অংশীদার নন” – সূরা আন’আম : ১৫৯ ।
হাসান বছরী (রহঃ) বলেন : তুমি বিদ’আতীর নিকট বসবে না , কারণ সে তোমার হৃদয়কে রোগাক্রান্ত করে দিবে ।
অতএব দ্বীন পরিপূর্ণরুপে ও সুস্পষ্টভাবে আসার পরেও যদি কোন ব্যক্তি তাতে সন্তুষ্ট না হতে পেরে নতুন কিছুর অনুপ্রবেশ ঘটায় , তা ইসলামের মধ্যে বিভক্তির কারণ এতে কোন সন্দেহ নেই । আর এ বিভক্তিই পরস্পরের মাঝে দুশমনী সৃষ্টি করে । যার জলন্ত প্রমাণ আমরা সমাজের মাঝে দিবালোকের ন্যায় প্রত্যক্ষ করছি । অতএব বাস্তবতাও তার বিরাট একটি দলীল ।
৮. বিদ’আত মুহাম্মাদ (সাঃ) এর শাফা’আত প্রাপ্তি হতে বাধা প্রদান করবে : কারণ হাদীসের মধ্যে বলা হয়েছে যে , বিদ’আতীকে হাওযে কাওছারের পানি পান করা হতে বঞ্চিত করা হবে । তিনি তাদের দূর হয়ে যেতে বলবেন । এটি প্রমাণ করছে যে তারা তাঁর শাফা’আত হতেও বঞ্চিত হবে ।
এখানে শাতেবী (রহঃ) একটি দূর্বল হাদীস দিয়ে দলীল গ্রহণ করে , সেটির অর্থকে সহীহ আখ্যা দিয়েছেন । সেটি হচ্ছে ‘বিদ’আতী ছাড়া আমার উম্মাতের সবাই আমার শাফা’আত পাবে’ (আল-ইতিসাম ১/১৫৯) ।
৯. বিদ’আত সহীহ সুন্নাহকে বিতাড়িত করে তার স্থলাভিষিক্ত হয় : বাস্তব নমুনায় এর বিরাট প্রমাণ । সালাত শেষে জামা’বদ্ধ হয়ে হাত তুলে দো’আ করলে , সালাতের পরে পঠিতব্য মুতাওয়াতির সূত্রের সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত দো’আ ও যিকিরগুলো পড়া হয় না । এছাড়া ইসলামের বিভিন্ন ইবাদাতের মধ্যে দূর্বল হাদীস দ্বারা প্রমাণিত এরুপ বহু আমল আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে যা সরাসরি সহীহ হাদীসর বিপরীত আমল । বিজ্ঞ পাঠকবৃন্দে নিকট এর চেয়ে আর বেশী কিছু বলা প্রয়োজন মনে করছি না । অতএব দূর্বল বা জাল হাদীসের উপর আমল করলে সহীহ সুন্নাহ বিতাড়িত হবেই । সালাফদের ভাষ্য উল্লেখ করে পূর্বে (৫) এ বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে ।
১০. বিদ’আত সৃষ্টিকারী তার নিজের ও তার অনুসরণকারী বিদ’আতের সাথে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তির সমপরিমাণ গুনাহের অংশীদার হবে : রাসূল (সাঃ) বলেছেন : “যে ব্যক্তি ভ্রষ্টতার দিকে আহবান করবে সে তার গুণাহ ও তার অনুসাররি গুণাগ বহন করবে । অনুসরণকারীদের গুণাহ সমূহে সামান্য পরিমাণ ঘাটতি না করেই” (বুখারী ও মুসলিম)
কোন সন্দেহ নেই বিদ’আতের দিকে আহবান করা বা তার উপর আমল করা পথভ্রষ্টতারই একটি অংশ । কারণ রাসূল (সাঃ) বলেছেন : ‘সব বিদ’আতই ভ্রষ্টতা’ ।
১১. বিদ’আতীর অমঙ্গলজনক শেষ পরিণতির ভয় রয়েছে : কারণ বিদ’আতী গুণাহের সাথে জড়িত , আল্লাহর অবাধ্য । আল্লাহ যা হতে নিষেধ করেছেন সে তার সাথে জড়িত । তার সে অবস্থায় মৃত্যু হলে অমঙ্গলজনক মৃত্যু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে । এছাড়া কিয়ামত দিবসে তাকে অমঙ্গলজনক পরিণতির সম্মুখীন হতে হবে । এর প্রমাণ তিন নম্বরে বর্ণিত হাদীস , যা পড়লে সহজেই বঝা সম্ভব ।
১২. বিদ’আতীর উপর দুনিয়াতে বেইজ্জতী আর আখেরাতে আল্লাহর ক্রোধ চাপিয়ে দেয়া হবে : (আখেরাতেও বেইজ্জতী হতে হেব তার প্রমাণ তিন নম্বরে বর্ণিত হাদীস) আল্লাহ তা’আলা বলেন : “অবশ্যই যারা গাভীর বাচ্চাকে উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে তাদের উপর তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে দুনিয়াতেই ক্রোধ ও লাঞ্ছনা এসে পড়বে । মিথ্যারোপকারীদেরকে আমি অনুরুপ শাস্তি দিয়ে থাকি” (সূরা আরাফ:১৫২) ।

সামেরীর প্ররোচনায় গাভীর বাচ্চা দ্বারা তারা পথভ্রষ্ট হয়েছিল এমনকি তারা তার ইবাদাতও করেছিল । আল্লাহ তা’আলা আয়াতের শেষে বলেছেন : “মিথ্যারোপকারীদেরকে আমি অনুরুপ শাস্তি দিয়ে থাকি এটি ব্যাপকভিত্তিক কথা । এর সাথে বিদ’আতেরও সাদৃশ্যতা আছে । কারণ সকল প্রকার বিদ’আতও আল্লাহর উপর মিথ্যারোপের শামিল । যেমনটি আল্লাহ তা’আলা বলেছেন :
“নিশ্চয় তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে , যারা নিজ সন্তানদেরকে নির্বুদ্ধিতাবশতঃ বিনা জ্ঞানে হত্যা করেছে এবং আল্লাহ তাদেরকে যেসব রিযিক দিয়েছিলেন , সেগুলোকে আল্লাহর উপর মিথ্যারোপ করে হারাম করে দিয়েছে । নিশ্চয় তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং সুপথগামী হয়নি” (সূরা আন’আম : ১৪০)।
অতএব আল্লাহর দ্বীনের মধ্যে যে ব্যক্তিই বিদ’আত সৃষ্টি করবে তাকেই তার বিদ’আতের কারণে লজ্জিত ও লাঞ্ছিত হতে হবে । তাবেঈ’দের যুগে বাস্তবে বিদ’আতীদের ভাগ্যে এমনটিই ঘটেছিল । তাদেরকে তাদের বিদ’আত নিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে ।
১৩. সুন্নাতের বিরোধীতা করার কারণে বিদ’আতী নিজেকে ফিতনার মধ্যে নিক্ষেপ করে : সুফিয়ান ইবনু ওয়াইনাহ বলেন : আমি ইমাম মালেক (রহঃ) কে যে ব্যক্তি মদীনার মীকাতে পৌঁছার পূর্বেই ইহরাম বাঁধলো তার সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলাম । তিনি উত্তরে বললেন : সে আল্লাহ ও তার রাসূল (সাঃ) এর বিরুদ্ধাচারণকারী । তার উপর দুনিয়াতে ফিতনার তার আখিরাতে পীড়াদায়ক শাস্তির আশঙ্কা করছি । তুমি কি আল্লাহ তায়ালার বাণী শুননি ।
“যারা তাঁর নির্দেশের বিরোধীতা করবে তারা যেন সতর্ক হয় তাদেরকে ফিতনা পেয়ে যাওয়া বা তাদেরকে পীড়াদায়ক শাস্তি গ্রাস করা থেকে” (সূরা আন-নূর : ৬৩ ।
১৪. বিদ’আতের অন্যতম ভয়াবহতা কারণ এই যে , সহীহ সুন্নাহ , তার ধারক – বাহক ও তার উপর আমলকারীকে বিদ’আতী ঘৃণা করবে এবং তাকে মন্দ জানবে ।
১৫. বিদ’আতী নিজেকে শরী’আতের মধ্যে কিছু সংযোজনকরী হিসাবে প্রকাশ করে : অথচ আল্লাহ তা’আলা তাঁর দ্বীনকে তাঁর বান্দাদের জন্য পূর্ণ করে দিয়েছেন । “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামাতকে সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের জন্য ইসলামকে ধর্ম হিসাবে পছন্দ করলাম ।” সূরা মায়েদা /৩
১৬. বিদ’আত হচ্ছে জ্ঞান ছাড়া আল্লাহর ব্যাপারে কথা বলা : শরী’আতের মধ্যে নিজের পক্ষ থেকে কিছু বানিয়ে বললে তা যে কতই ভয়ানক সেটি অনুধাবন করা যায় আল্লাহ কর্তৃক তাঁর নবী (সাঃ) কে সম্বোধন করে বলা নিম্নোক্ত কঠোর ভাষার আয়াতগুলিতে :
“সে যদি আমার নামে কোন কিছু রচনা করতো , তাহলে আমি তার ডান হাত ধরে ফেলতাম , অতঃপর তার গ্রীবা কেটে দিতাম তোমাদের কেউ তাকে রক্ষা করতে পারতো না” (সূরা আল-হাক্কাহ : ৪৪-৪৭) ।
রাসূল (সাঃ) কেও নিজের পক্ষ হতে কিছু বনিয়ে বলার অনুমতি দেয়া হয়নি , এ আয়াত তার জাজ্বল্য প্রমাণ । তেমন তিনি তাঁর নিজের পক্ষ থেকে কিছু বলতেন না । আল্লাহ তা’আলা বলেন :
“আর তিনি নিজ ইচ্ছায় কিছু বলেন না , যতক্ষণ না তাঁর নিকট ওহী নাযিল হয়” (সূরা আন-নাজম:৩-৫) ।
১৭. বিদ’আতীর জ্ঞান উলট-পালট হয়ে তার নিকট সব কিছুই গোলমেলে হয়ে যায় । ফলে সে বিদ’আতকে সুন্নাত আর সুন্নাতকে বিদ’আত মনে করে ।
অতএব বিদ’আতের ভয়াবহতা হতে রক্ষা পেতে হলে , আমাদের মাঝে প্রচলিত বিদ’আতগুলো হতে সতর্ক হয়ে সেগুলোকে পরিত্যাগ করে সহীহ সুন্নাহ মাফিক আমল করা ছাড়া আখেরাতে মুক্তির জন্য আমাদের সামনে আর কোন বিকল্প পথ খোলা নেই । আসুন আমরা দুর্বল ও বানোয়াট হাদীসগুলো জেনে সেগুলো পরিত্যাগ করি এবং সহীহ হাদীসের উপর ভিত্তি করে আমাদের জীবন গড়ি ।
বিদ’আতের সাথে জড়িত হওয়ার কারণগুলো নিম্নরুপ :
১. কুরআন , সুন্নাহ ও আরবী ভাষা সম্পর্কে অজ্ঞতা ।
২. অতীতের সত্যানুসারী ব্যক্তিগণের মত ও পথের অনুসরণ না করা ।
৩. প্রবৃত্তি বা মনোবৃত্তির অনুসরণ করা ।
৪. সন্দেহমূলক বস্তুর সাথে জড়িত থাকা ।
৫. শুধুমাত্র স্বীয় বুদ্ধির উপর নির্ভর করা ।
৬. বড় বড় আলেমের উদ্ধৃতি দিয়ে তার অন্ধ অনুসরণ করা , যা গোঁড়ামির দিকে নিয়ে যায় । আর তখনই সে কুরআন ও সুন্নাতের দলীলগুলোকে অমান্য করে ।
৭. মন্দ লোকদের সংস্পর্শে থাকা ও চলা ।
পাঠক ভাই ও বোনেরা ! যে ব্যক্তি উপরোক্ত আলোচনা বুঝতে সক্ষম হবেন , আমার মনে হয় সে ব্যক্তি নিজেকে বিদ’আত ও তার ভয়াবহত হতে রক্ষার্থে এখন থেকে যাচাই – বাছাই করে পথ চলবেন । যাতে করে অসতর্কতা বশতঃ বিদ’আতের মধ্যে জড়িয়ে না যান । যে আমলই আমরা করি না কেন তা যাচাই – বাছাই করেই করা উচিত । কারণ হতে পারে বহু আমল আমার , আপনার জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে যেগুলো দুর্বল বা বানোয়াট হাদীসের উপর নির্ভরশীল ।
রসূল (সাঃ) এর নিম্নোক্ত বাণী কোন ব্যক্তির ভুলে যাওয়া ঠিক হবে না : “আমার এ নির্দেশের মাঝে যে ব্যক্তি এমন কিছু নবাবিষ্কার করবে যা তার অন্তর্ভুক্ত ছিল না , তা পরিত্যজ্য ।” (বুখারী হা/২৬৯৭ ; মুসলিম হা/৩২৪২ ; আবু দাউদ হা/৩৯৯০ ; ইবনু মাজাহ হা/১৪)
তিনি আরও বলেন : “যে ব্যক্তি এমন আমল করল যার উপর আমার কোন নির্দেশ নেই সে আমলটি অগ্রহণযোগ্য ।” মুত্তাফাকুন আলাইহি হা/৩২৪৩ ।
অতএব আমরা কার স্বার্থ রক্ষার্তে তথাকথিত হুজুরদের ধোঁকায় পড়ে নবী (সাঃ) হতে সহীহ সনদে বর্ণিত হাদীসগুলো ছেড়ে দিয়ে নিজেদেরকে বিপদগামী করব ?
আসুন ! আমরা রাসূল (সাঃ) এ শাফায়াত প্রাপ্তির প্রত্যাশায় নিজেদেরকে তাঁর সহীহ সুন্নাহমুখী করি । আর অনুধাবন করি নিম্নোক্ত হাদীসটি । কারণ একমাত্র তাঁর সহীহ সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার বিষয়টি যে কত বড় গুরুত্বপূর্ণ এটি তারই প্রমাণ বহন করছে : রাসূল (সাঃ) বলেছেন : “সেই সত্তার কসম যার হাতে আমার আত্মা যদি মূসা (আঃ) জীবিত থাকতেন তাহলে আমার অনুসরণ করা ছাড়া তার আর কোন সুযোগ ছিল না ।” মুসনাদ ইমাম আহমাদ হা/১৪৬২৩ ।
অতএব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের সার্বিক কল্যাণ একমাত্র রাসূল (সাঃ) এর আদর্শের মধ্যেই আমাদেরকে খুঁজে নিতে হবে ।
আসুন ! আমরা জাল ও য’ঈফ হাদীসগুলো জানি এবং তথাকথিত হুজুরদের জাল ও য’ঈফ হাদীস নির্ভর ফতোয়া ও আক্বীদাহ হতে নিজেদেরকে মুক্ত করি । আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর ও তাঁর নবীর যথাযথ অনুসরণ করার তাওফীক দান করুন । আমীন ।

আপনার কি মনে হয় ইসলামিক পশু জবাই পদ্ধতিটি খুব নিষ্ঠুর? আসুন দেখা যাক, বিজ্ঞান কি বলে :
Posted by QuranerAlo.com Editor • অক্টোবর 22, 2012 • Printer-friendly
Download article as PDF

প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না

Western World এ পশু জবাইয়ের প্রচলিত নিয়ম(CPB Method):
Captive bolt pistol(CPB ) নামের এক ধরনের যন্ত্র দ্বারা পশুর কপালে প্রচন্ড আঘাত করা হয়। ধারনা করা হয় এতে পশু unconscious হয়ে পড়ে এবং জবাইয়ের পর ব্যথা অনুভব করে না।
গবেষণা :
জার্মানির Hanover University এর প্রফেসর Wilhelm Schulze এবং তার সহযোগী Dr. Hazim এর নেতৃত্বে একটি গবেষণা পরিচালিত হয়। গবেষনার বিষয়বস্তু ছিল :
১. Western World এ প্রচলিত নিয়মে(CPB Method) এবং
২.ইসলামিক নিয়মে পশু জবাইয়ে পশুর যন্ত্রণা এবং চেতনাকে চিহ্নিত করা।
Experimental Setup:
Brain এর surface কে touch করে পশুর মাথার খুলির বিভিন্ন জায়গায় surgically কিছু electrode ঢুকিয়ে দেয়া হয়। পশুকে এরপর সুস্থ হওয়ার জন্য কিছু সময় দেয়া হয়। তারপর পশুগুলোকে জবাই করা হয়। কিছু পশুকে ইসলামিক নিয়মে আর কিছু পশুকে western world এর নিয়মে। জবাই করার সময় Electro Encephalo Graph (EEG) এবং Electro Cardiogram (ECG) করে পশুগুলোর brain এবং heart এর condition দেখা হয়।

Result:
ইসলামিক পদ্ধতিতে জবাইয়ের ফলাফলঃ
১. জবাইয়ের প্রথম ৩ সেকেন্ড EEG graph এ কোন change দেখা যায় না। তারমানে পশু কোন উল্লেখযোগ্য ব্যথা অনুভব করে না।
২. পরের ৩ সেকেন্ডের EEG record এ দেখা যায় , পশু গভীর ঘুম এ নিমগ্ন থাকার মত অচেতন অবস্থায় থাকে। হঠাৎ প্রচুর পরিমানে রক্ত শরীর থেকে বের হয়ে যাবার কারনে brain এর vital center গুলোতে রক্তসরবরাহ হয়না। ফলে এই অচেতন অবস্থার সৃষ্টি হয়।
৩. উপরিউল্লিখিত ৬ সেকেন্ড এর পর EEG graph এ zero level দেখায়। তারমানে পশু কোন ব্যথাই অনুভব করেনা ।
৪. যদিও brain থেকে কোন সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল না , তবুও heart স্পন্দিত হচ্ছিল এবং তীব্র খিঁচুনি হচ্ছিল (spinal cord এর একটা reflex action) । এভাবে শরীর থেকে প্রচুর পরিমানে রক্ত বের হয়ে যাচ্ছিল এবং এর ফলে ভোক্তার জন্য স্বাস্থ্যসম্মত মাংস নিশ্চিত হচ্ছিল ।
Western World এ প্রচলিত পদ্ধতিতে(CPB Method) জবাইয়ের ফলাফলঃ
১. মাথায় প্রচন্ড আঘাত করার পরের মুহূর্তে পশুটিকে দৃশ্যত অচেতন মনে হচ্ছিল
২. কিন্তু EEG এর দ্বারা বোঝা যাচ্ছিল পশুটি খুব কষ্ট পাচ্ছে ।
৩. ইসলামিক পদ্ধতিতে জবাই করা পশুর তুলনায় CBP দিয়ে আঘাত করা পশুটির heart স্পন্দন আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল । যার ফলে পশুটির শরীর থেকে সব রক্ত বের হতে পারে নি । এবং ফলশ্রুতিতে, পশুটির মাংস ভোক্তার জন্য অস্বাস্থ্যকর হয়ে যাচ্ছিল ।
Western World এর পদ্ধতি(CPB Method) এবং MAD COW রোগঃ
Texas A & M University এবং Canada এর Food Inspection Agency একটা পদ্ধতি(Pneumatic Stunning) আবিষ্কার করেছে যেটাতে একটা metal bolt পশুর brain এ fire করা হয় এবং এর ফলে brain এর টিস্যু পশুর সারা শরীরে ছড়িয়ে পরে । Brain tissue এবং spinal cord হল Mad Cow আক্রান্ত গরুর সবচেয়ে সংক্রামক অংশ। এছাড়াও brain এবং heart এ electric shock এর মাধ্যমে পশুকে অচেতন করেও কিছু কিছু জায়গায় পশু জবাই করা হয় যেটা মাংসের quality এর উপর খুব খারাপ প্রভাব ফেলে ।
ভারতীয় পদ্ধতিঃ
ভারতে পশুর মাথা এক কোপে আলাদা করে ফেলা হয় । এতে করে ঐচ্ছিক পেশীগুলো হঠাৎ করে সঙ্কুচিত হয়ে পরে যা অনেক পুষ্টি সমৃদ্ধ তরল বের করে দেয় এবং heart হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শরীর থেকে রক্ত বের হতে পারে না , যা বের হওয়া স্বাস্থ্যকর মাংসের জন্য দরকার ।
এছাড়া ইসলামে spinal cord না কেটে শ্বাসনালী , এবং jugular vein দুটো কাটার ব্যাপারে জোর দেয়া হয়েছে । এর ফলে রক্ত দ্রুত শরীর থেকে বের হয়ে যেতে পারে । Spinal cord কাটলে cardiac arrest এর সম্ভাবনা থাকে যার ফলে রক্ত শরীরে আটকে যাবে যা রোগজীবানু এর উৎস ।
এখানে রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর একটি হাদীস মনে করিয়ে দেয়ার প্রয়োজন অনুভব করছিঃ “আল্লাহ সবাইকে দয়া করার হুকুম দেন । তাই যখন জবাই কর তখন দয়া কর । জবাই করার পূর্বে ছুরিতে ধার দিয়ে নাও যাতে পশুর কষ্ট কম হয়” । তিনি পশুর সামনে ছুরিতে শান দিতে বা এক পশুর সামনে আরেক পশুকে জবাই করতেও নিষেধ করেছেন । এই জিনিস্টা কুরবানীর সময় আমারা ভুলে যাই ।
সবশেষে , আমরা কি এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে পশু জবাই করার ইসলামিক পদ্ধতিটিই সবচেয়ে বিজ্ঞানসম্মত এবং পশু এবং পশুর মালিক উভয়ের জন্যই উপকারী?
রমযান মাসে যদি সব শয়তান শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকে তাহলে এ মাসে মানুষ নিয়মিতভাবে পাপ করতে থাকে কীভাবে?
Posted by QuranerAlo.com Editor • আগস্ট 8, 2012 • Printer-friendly
Download article as PDF

প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না
প্রশ্ন: এটি খুব সাধারণ এবং সকলের মনে উদয় হওয়া একটি প্রশ্ন তাহলো, রমযান মাসে যদি সব শয়তান শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকে তাহলে এ মাসেমানুষ নিয়মিতভাবে পাপ করতে থাকে কীভাবে?

উত্তর: ডা. জাকির নায়েক: হ্যাঁ, আমি এই সাধারণ প্রশ্নের সাথে একমত এবং এখন আমার বিভিন্ন আয়াত, হাদীস ইত্যাদির কথা মনে হচ্ছে যেখানে উল্লেখ আছে যে, রমযান মাসে শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে দেওয়া হয়। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মনে এই প্রশ্ন উত্থিত হয়।
শুধু আমাদেরই নয়, বিভিন্ন মুসলিম এবং অমুসলিমদের ভেতরেও এই প্রশ্ন ওঠে যে যদি শয়তান শৃঙ্খলাবদ্ধ হয় তাহলে মানবজাতি এরকম পাপ কাজ চালিয়ে যেতে পারে কীভাবে? এই ধরনের প্রশ্ন উত্থাপিত হয় মূলত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীসদ্বয়ের উপর ভিত্তি করে।
মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
“হে মানবজাতি তোমাদের মাঝে পবিত্র রমযান মাস সমাগত এবং আল্লাহ তোমাদেরকে এই মাসে রোযা রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন আর এই মাসে বেহেশেতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয় এবং দোজখের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে দেওয়া হয় আর এই মাসেই আছে কদরের রাত যেটি হাজার মাস থেকে উত্তম এবং যে ব্যক্তি এই মাসের অনুগ্রহ হতে বঞ্চিত হলো সে ব্যক্তি সত্যিকার অর্থেই বঞ্চিত, দুর্ভাগা।” (মুসনাদ-ই আহমদ, পৃষ্ঠা-২৩০, হাদীস নং ৭১৪৮ এবং সুনানে নাসাঈ, অধ্যায়-৫, রোযা-৫, রোযা, হাদীন নং ২১০৬)
তিনি এই হাদীসে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবেই উল্লেখ করেছেন যে, পবিত্র রমযান মাসে শয়তানকে আল্লাহ তায়ালা শৃঙ্খলাবদ্ধ করে দেন। সুতরাং খুব সহজভাবেই এই প্রশ্ন উত্থিত হয় যে, শয়তান শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকার পরেও মানবজাতি পাপ কাজে লিপ্ত থাকে কীভাবে?
• এখন এই লোকগুলোকে বোঝাতে আমাদেরকে এটি অনুধাবন করতে হবে যে, শয়তান যদিও শৃঙ্খলাবদ্ধ কিন্তু তার মানে এই নয় যে, শয়তান একেবারে শেষ বা মরে গেছে বরং শয়তান জীবিত তারা মরে যায় না। তাদের ক্ষমতা রোধ হয়ে যায়। ব্যাপারটি ভালোভাবে বোঝার জন্য একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। বাঘের কথাই ধরুন। যে বাঘটি মুক্ত তার পক্ষে মানুষ হত্যা করার সম্ভাবনা খুবই বেশি এমনকি বাঘে পেলে হত্যা করে বৈকি! আপনার জীবন তখন বিপদাপন্ন কিন্তু যখন ওই বাঘটি খাঁচাবন্দি বা শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকবে তখন কিন্তু আপনি ওই বাঘ হতে নিরাপদ। তবে আপনার ওই নিরাপত্তা নির্ভর করে যতটুকু দূরত্ব আপনি বাঘের সাথে রেখেছেন তার ওপর। বাঘকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করার পরেও আপনি যদি ওই বাঘের খুব কাছাকাছি চলে যান তাহলে আপনাকে হত্যা করার একটা সুযোগ কিন্তু ওই বাঘের জন্য থেকে যায়।
সুতরাং যতটা সম্ভব, ওই বাঘের কাছ থেকে বেশি দূরত্ব বজায় রাখতে হবে তাহলেই আপনি নিরাপদ থাকবেন। একইভাবে আপনি যদি রমযান মাসে শয়তান হতে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখেন তাহলে আপনিও নিরাপদ থাকতে পারবেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ كُلُوا مِمَّا فِي الْأَرْضِ حَلَالًا طَيِّبًا وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
অর্থ: হে মানবজাতি! পৃথিবীতে যা কিছু বৈধ ও পবিত্র খাদ্যবস্তু রয়েছে তা হতে তোমরা আহর করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করিও না, নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। (সূরা বাকারা, অধ্যায়-২, আয়াত-১৬৮)
এখানে বলা হয়েছে- “শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ এবং তার কুমন্ত্রণা থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য সতর্ক হও” কুরআনের অনেক জায়গায় আল্লাহ তায়ালা এই শয়তানের পদাঙ্ক হতে বাঁচার জন্য তাগিদ দিয়েছেন। আল্লাহ এই কথা বলেন নি যে তোমরা শুধু শয়তানের কাছ থেকে সতর্ক হও, কারণ অনেক সাধারণ এবং ঈমানদার মুসলমান আছেন যারা তাদের সামনেই শয়তানকে দেখতে পান এবং এতে করে তারা নিজেরাই সতর্ক হতে পারে বা সুযোগ পায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, একটি যুবতী মেয়ে একজন ঈমানদার যুবকের কাছে এসে বলল, চলো আজ আমরা দু’জনে একসাথে রাত কাটাই। তখন ওই যুবক বলবে, দু’জনে একসাথে রাত কাটাব! একটা মেয়ের সাথে রাত কাটাব! এটা হারাম, এটা যিনা, ব্যভিচার। সে তাৎক্ষণিকভাবে এটার প্রতিবাদ করবে। কিন্তু ওই একই যুবতী যদি ওই যুবকের সাথে ফোনে কথা বলে তাহলে এটা তেমন কোন ব্যাপার নয়, পরবর্তীতে মেয়েটি ছেলেটিকে বলল, চলো আমরা স্ন্যাকস, ম্যাকডোনাল্ড, ফ্রাইড চিকেন ইত্যাদি খাই।
এটার জন্য তাদের আধা ঘণ্টা ব্যয় হলো এবং এটিও তেমন কোন ব্যাপার নয়। এরপর মেয়েটি বলল আচ্ছা আমরা রাতের খাবার কেন খাচ্ছি না, চলো রেস্টুরেন্টে যাই। তারা গেল কিন্তু এটাও তেমন কোন সমস্যা নয়। এরপর মেয়েটি বলল, তাহলে রাতটা তুমি আমার সাথে কাটাচ্ছো না কেন? তখন ছেলেটি বলল, একটি মেয়ের সাথে রাত কাটাব চমৎকার, কোন সমস্যা নয়। আর এটাই হলো শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ। আর শয়তানের এই পদাঙ্ক অনুসরণ একজন মুমিন বান্দাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এই কারণে আল্লাহ আমাদেরকে শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করা থেকে সতর্ক হতে বলেছেন। যদি শয়তান সরাসরিভাবে কোনো ঈমানদার ব্যক্তির সামনে উপস্থিত হয় তাহলে ওই মুমিন ব্যক্তি তাকে ভয় করে এবং তার থেকে বাঁচতে পারে। শয়তানের পদাঙ্ক হলো এমন একটি জিনিস যেটি খুবই বিপদজনক।
সুতরাং আমরা এটাই বুঝতে পারি যে, যখন শয়তান শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকে তখন পদচারণাও বন্ধ থাকে। যে কারণে অনেক পাপ কাজও বিরত থাকে। এখন যদি কেউ আগ বাড়িয়ে শয়তানের কাছে যায় তাহলে শয়তানের কাছে তার মাথানত এবং বিভিন্ন পাপ কাজ করার বা পাপে জড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা চরমে পৌছে। তাই পবিত্র রমযান মাসে আমরা যতই শয়তানের কাছ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করবো ততই আমাদের পাপ কাজে জড়িত হওয়ার সম্ভাবনা হ্রাস পাবে। আপনি যদি শৃংখলাবদ্ধ বাঘের কাছে যান যদিও সে আবদ্ধ, তবুও সে কিন্তু অল্প জায়গার ভেতরে ঘোরাফেরা করতে পারে একইভাবে শয়তানও একই কাজ করতে পারে। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “শয়তানরা শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়ে যায়।” তারা স্বল্প জায়গায় ঘোরাফেরা করতে পারে। সুতরাং কেউ যদি শয়তানের ঘোরাফেরার আওতায় বাইরে থাকে তাহলে সে শয়তান থেকে নিরাপদ থাকতে পারবে।
• আমি এ প্রসঙ্গে দ্বিতীয় যে কারণটি অনুভব করি সেটা হলো- আমরা একটি ব্যাপার অনুধাবন করতে ব্যর্থ হই তাহলো যদিও শয়তান রমযান মাসে শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকে কিন্তু বাকি আরো ১১ মাস সে কিন্তু মুক্তই থাকে। ওই ১১ মাসে শয়তান মানুষের ওপর যে সব কুমন্ত্রণা এবং পাপে জড়াতে পেরেছে তার প্রভাব মানুষকে পবিত্র রমযান মাসেও প্রভাবিত করে। আমি আপনাদেরকে সহজভাবে বোঝানোর জন্য একটি উদাহরণ দিচ্ছি- একজন মাদক বিক্রেতা যে বিভিন্ন প্রকার চেষ্টা করে কলেজ, ভার্সিটির তরুণ ছাত্রছাত্রীদেরকে মাদকাসক্ত করে ফেলে। এটিতে সফল হওয়ার জন্য প্রথমে তারা কি করে? প্রথমে তারা ছাত্রদেরকে বিনামূল্যে মাদক দেয়। তাদেরকে মাদক গ্রহণের জন্য উৎসাহিত করে।
পরবর্তীতে তারা ছাত্রদের উপর মাঝে মাঝে অল্প পরিমাণে মূল্য আদায় করতে শুরু করে এবং দিনে দিনে টাকার পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়।’ কিন্তু ততদিনে ওই ছেলেমেয়েরা যথেষ্ট পরিমাণে মাদকের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় যদি ওই দমাদক বিক্রেতারা ওই ছাত্রছাত্রীদের কাছে না যায় তাহলে ওই ছাত্রছাত্রীরাই নিজেরা ওই মাদক বিক্রেতাকে খুঁজে বের করে। ওই মাদক বিক্রেতারা তাদের কৌশল অনুযায়ী অন্য কোনো লোকের কাছে গিয়ে একই ধরনের কৌশল প্রয়োগ করে। সুতরাং যে লোকেরা মাদকের প্রতি আসক্ত হয়েছে তারা নিজেরাই মাদকের দোকানে গিয়ে সেটি গ্রহণ করে। একইভাবে যারা শয়তানের প্রতি আসক্ত হয়েছে তারা শয়তান অনুপস্থিত থাকলেও তাদের মাঝে শয়তানকে খোঁজা বা শয়তানের আসক্তি তাদের ভেতর প্রবলভাবে কাজ করে। কিন্তু ‍মুমিন মুসলিম যারা শয়তানের প্রতি আসক্ত হয় নি তাদের পক্ষে শয়তানের কাছে থেকে দূরে থাকা বা কুমন্ত্রণা থেকে বিরত খুবই সহজ।
• এ প্রসঙ্গে তৃতীয় কারণ হিসাবে বলবো, অনেক ইসলামি চিন্তাবিদ আছেন যারা বলেন যে, পবিত্র রমযান মাসে বড় বড় শয়তানরা অনুপস্থিত থাকে কিন্তু ছোট এবং শয়তানের দোসররা মুক্ত থাকে এবং তারাই মানুষের ভিতরে কুমন্ত্রণা ঢুকিয়ে দেয়। এই শ্রেণীতে আরেকটি যুক্তি আছে তাহলো, যদিও আল্লাহ রমযান মাসে শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে দেন তথাপি তারা মানুষের অন্তরে তাদের কুমন্ত্রণা দিতে থাকে এবং এরই মাধ্যমে তারা মানুষকে তাদের কাছাকাছি নিয়ে যায়।
আল্লাহ বলেন,
الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ
“তারা মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয় এবং তারা আসে হয়তো মানুষ কিংবা জ্বিনের ভেতর থেকে।” (সূরা নাস, আয়াত ৫,৬)
এখানে শয়তানের কথা বলা হয়েছে। শয়তান এমনই সত্তা যে মানুষের হৃদয়কে কলুষিত করে এবং পলায়ন করে এবং সে হতে পারে মানুষ কিংবা জ্বিন জাতি হতে। সুতরাং এমনও হতে পারে যে, আল্লাহ তায়ালা যে শয়তানকে বন্দি করেন সে হয়ত জ্বিন জাতির সদস্য কিন্তু মানবজাতির ভেতরের শয়তান তখনো মুক্ত থাকে। সুতরাং এক শ্রেণীর শয়তান যারা জ্বিন জাতি হতে আসে তারা অনুপস্থিত থাকে। কিন্তু মানবজাতীয় শয়তান উপস্থিত থাকে। তাই আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে শয়তানের কুমন্ত্রণা হতে। এই কুমন্ত্রণাই হলো আসল জিনিস যেটি মানুষকে শয়তানের দিকে টেনে নিয়ে যায়। এই ব্যাপারটি হাদীসে পরিষ্কার করা হয়েছে। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ তোমাদের জন্য রমযানকে উপস্থিত করেছেন। তোমাদের উচিত রোযা রাখা এবং এই রোযার উদ্দেশ্য হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা।
শয়তান কি শৃঙ্খলাবদ্ধ হবে? আল্লাহ আমাদেরকে রোযা রাখার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন এবং বলেছেন যে, রোযার মাসে শয়তান শৃঙ্খলাবদ্ধ হবে। সুতরাং যদি তুমি রোযা রাখ তাহলে তোমার পেছনে যে শয়তান লেগে আছে আল্লাহ তাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে দেবেন। এখানে শয়তান হতে বাঁচার জন্য শর্ত হলো আমাদেরকে অবশ্যই রোযা রাখতে হবে। যদি তুমি যথাযথ নিয়তের সাথে রোযা রাখো তাহলে নিশ্চিতভাবে শয়তান তোমার ভেতরে প্রবেশ করতে পারবে না।
• এটা প্রমাণ করার সবচেয়ে যৌক্তিক উপায় হলো, যদি আমরা রমযান মাসে বিভিন্ন মুসলিম দেশের অপরাধ প্রতিবেদন দেখি তাহলে দেখা যাবে যে, অন্য মাসের তুলনায় এটি অনেক কম। কিন্তু যদি রমযান মাসে একটি অমুসলিম দেশের অপরাধ প্রতিবেদন দেখি তাহলে দেখা যাবে এটি অন্যান্য মাসের মতই রয়েছে। এর প্রধান কারণ হলো তারা রোযা পালন করে না, তারা মুসলিম নয় এবং শয়তান তাদের উপর তখনও প্রভাবশীল থাকে। যদিও সব মুসলমান রোযা থাকে না কিন্তু বেশির ভাগই রোযা থাকে এবং এই কারণে পবিত্র রমযান মাসে অন্যান্য অমুসলিম দেশের তুলনায় মুসলিম দেশগুলোতে অপরাধের পরিমাণ কম থাকে।
বিয়ে করতে কি কোন প্রস্তুতির দরকার হয়?
Posted by QuranerAlo.com Editor • অক্টোবর 4, 2012 • Printer-friendly
Download article as PDF

প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না
লিখেছেন: স্বপ্নচারী

আমাদের সমাজে ছেলেমেয়েরা কেন বিয়ে করে?
অনেক তরুণ-তরুণীরা হয়ত বিয়ে করতে চায় কারণ তাদের বন্ধুবান্ধবরা বিয়ে করে ফেলছে, কারও আবার বাবা-মা চাপ সৃষ্টি করছে বিয়ে করার জন্য, কেউ ঘরের পারিবারিক জীবনের সমস্যা থেকে মুক্তির জন্যও বিয়ে করতে চায়। কেউ কেউ অন্যের শারীরিক সৌন্দর্য দেখে বা অর্থ-সম্পদের কারণে বিয়ে করতে আগ্রহী হয়। কেউ কেউ খুঁজে একজন সঙ্গী, কেউ পারিবারিকভাবে শক্ত একটা অবলম্বন পেতেও বিয়ে করতে চায় যেটা একটা বিয়ের মাধ্যমে সম্ভব। আবার মুসলিম হিসেবে রাসূলের সুন্নাহ পালনের মাধ্যমে ইবাদাত হিসেবেও বিয়ে করতে চান।
আরেকটা মানুষের সাথে আজীবন থাকার অভিপ্রায়ে যখন যাত্রা শুরু হয় দু’জন ছেলে এবং মেয়ের, তখন তাদের অনেক রকমের প্রস্তুতির দরকার পড়ে। দু’টো পরিবারকে তারা জুড়িয়ে দেয়, এখানে আরেকটা পরিবারের সাথে *নিজেদেরকে* মানিয়ে নেয়ার ব্যাপার থাকে। অনেক ধরণের চারিত্রিক গুণ প্রয়োজন, যেগুলো ছাড়া দিব্যি সমস্যাবিহীন *সিঙ্গেল* লাইফ কাটানো গেলেও বিবাহিত তা অবধারিত প্রয়োজন। তাই এগুলোর অবর্তমানে যদি সম্পর্কে চাপ বা টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়, অন্য কাউকে দায় দেয়ার নেই, ভোগান্তি তো হবেই।
বর্তমান সময়ে টেলিভিশন মিডিয়া, কমার্শিয়ালের মাঝে ডুবে থেকে অনেক ছেলেমেয়েরাই বিয়েকে মডার্ন ডেটিং টাইপের কিছু ভেবে বসেন। কেবল অবিমিশ্র সুখ, উদ্দাম আনন্দ। অথচ, বিয়ের পর দেখা যায় টুথব্রাশ এখানে কেন, টাওয়েল ওখানে কেন টাইপের ছোট ছোট জিনিসেও অমিল পাওয়া যায় একজন আরেকজনের। বিয়ের প্রথম দিকে ভালোবাসা উপচে পড়ার কারণে এইসব অগ্রাহ্য করলেও কিছুদিন পর আরেকজনের এইসব ছোটখাটো অমিলগুলোও অসহ্যবোধ হতে থাকে।
পারিবারিক এই সম্পর্কের ব্যাপারে কুরআনে ব্যবহৃত শব্দ হলো — ‘আল মুহসানাত’, ‘আল মুহসিনিন’ যা ‘ইহসান’ শব্দটি থেকে এসেছে। [১] এই শব্দটির একটি অর্থ যেমনটা বুঝায় তা হলো — কোন একটি দুর্গ চারিদিকে সেনা দিয়ে শক্তিশালীভাবে সুরক্ষিত। সেইসূত্রে, একজন স্ত্রীকে দুর্গের ন্যায় কঠিন সুরক্ষা দেয় তার স্বামী — সুরক্ষা দেয় যাবতীয় দুঃখ থেকে, অস্থিরতা-শঙ্কা থেকে, অজ্ঞতা থেকে, লজ্জাহীনতা থেকে। একজন স্ত্রীরও একই রকম দায়িত্ব রয়েছে। তারা একে অপরের পোশাকের মতন। [২] বিয়ে তাই কেবল আনন্দ আর উচ্ছ্বাস নয়, দায়িত্ববোধের ব্যাপারও বটে।
ইন্টারনেটে পর্নোগ্রাফির সার্চ যেসব দেশ থেকে হয়, তার মধ্যে প্রথমদিকে বেশ কিছু মুসলিম দেশের নাম আছে। [৩] পারিবারিক অশান্তি এবং সংসার জীবনে তৃপ্তি না থাকাই এই কারণ বলে মনে করেন বোদ্ধারা। সংসার জীবনের শুরুতে আবেগ-উচ্ছ্বাস বেশি থাকে, দেখা যায় প্রথম ছ’মাস ছেলে-মেয়ে কেউই তাদের বন্ধুমহলে কোন সময়ই দেন না। কিন্তু পরে ধীরে ধীরে তা হ্রাস পেতে থাকে। সবাই তার অধিকারের ব্যাপারে খেয়ালী হতে থাকেন, নিজের কর্তব্যের ব্যাপার ভুলে যেতে থাকেন। হ্যাঁ স্বামী-স্ত্রী দু’জনেরই দু’জনের প্রতি অধিকার রয়েছে, কর্তব্যও রয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সবারই উচিত নিজের কর্তব্যটা করে যাওয়া এবং অপরজনের কাছে আশা-আকাংখা না করা।
কথাটা অদ্ভুত ঠেকলো?
একজন মু’মিন কেবলমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার উপরেই ভরসা করে। তার সমস্ত চাওয়া, সমস্ত আকাঙ্ক্ষার কথা কেবল আল্লাহর কাছেই হয়। মাটির তৈরি দুর্বল মানুষের উপরে যখন অনেক আশা-আকাংখার ভার ন্যস্ত হয় — তখন নিঃসন্দেহে সেই মানুষ এতটা ভার নেয়ার যোগ্য থাকে না।
আর তাই, মানুষ হিসেবে আমাদের আশাভঙ্গ হয়ে কষ্ট পেয়ে এলোমেলো হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে। বিয়ে করার আগে বিয়ে করার উদ্দেশ্য ঠিক রাখা প্রয়োজন। কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টিই যেন মুখ্য থাকে, তাঁকে সন্তুষ্ট করার আশায়, চরিত্রকে ঠিক রাখতে, নির্লজ্জতা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জীবনধারণ করছেন/করতে চান — এমন একজনকে মুসলিম/মুসলিমাহদের সঙ্গী করতে চাওয়া উচিত।
প্রকৃতপক্ষে পারিবারিক জীবন নিয়ে মানসিক কিছু প্রস্তুতির প্রয়োজন আছে। দেখলাম, ভালো লাগলো, প্রেম করো, ধুম করে বিয়ে করো — এই সবই ভুল চিন্তা ও কাজ যা অস্বাস্থ্যকর দাম্পত্য জীবনের সূচনা করে। একজন পশ্চিমা সাইকোলজিস্ট আর ম্যারিজ কাউন্সিলরের একটা লেখা পড়লাম যাতে তিনি জোর দিয়েছেন বিয়ের আগে থেকে বিবাহ পরবর্তী দ্বায়িত্বগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করার ব্যাপারে। পারিবারিক আর ব্যক্তিগত পরস্পরের দ্বায়িত্ব গ্রহণ ও পালন এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
প্রশ্ন হলো, আপনি কীভাবে জানেন যে আপনি আসলেই বিয়ে করতে প্রস্তুত? আর আরো সূক্ষ্মভাবে বললে, আপনি যে আপনার পছন্দ করা একজন নির্দিষ্ট মানুষকেই বিয়ে করতে প্রস্তুত তা কী করে নিশ্চিত হলেন? আপনি বিয়ের জন্য প্রস্তুত কিনা, এটা জানার জন্য আপনার নিজেকে জানা জরুরি। এই কারণে কিছু ব্যক্তিগত হিসাব করতে বসতে হবে নিজের ভালো দিকগুলো জানতে আর নিজের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করতে। আপনার জানা দরকার আপনার সাথে আল্লাহর সম্পর্ক কেমন, আর আপনার সঙ্গী/সঙ্গিনীর সাথে আল্লাহর সম্পর্ক আপনি কেমন আশা করেন?
• আপনি কি আসলেই আপনার জীবনটা অন্য কারো সাথে ভাগাভাগি করতে প্রস্তুত?
• আপনি কি আপনার পরিবার গঠনের জন্য দ্বায়িত্ব নিতে, বিভিন্ন বিষয়ে কম্প্রোমাইজ করতে, সঙ্গী/সঙ্গিনীর সাথে একত্রে কাজ করতে, আপনার ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক লক্ষ্যগুলো পূরণের জন্য প্রস্তুত?
• বিয়ের পর পরিবারে আপনি কতটুকু অবদান রাখবেন সেটা জানা গুরুত্বপূর্ণ এবং একটা স্বাস্থ্যকর, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবার গঠন করতে আপনি কতখানি কী করতে পারবেন, করতে চান — সেটা জানাও জরুরি।

প্রস্তুত হওয়া
আপনি আসলেই বিয়ে করতে চান কিনা এবং বিয়ে করতে প্রস্তুত কিনা, তা জানার জন্য বিবাহপূর্ব প্রস্ততির জ্ঞান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিয়ের পর সাংসারিক সম্পর্ক কেমন হতে পারে, সেই ব্যাপারে কিছু জ্ঞান ও ধারণা জানা যেতে পারে এই প্রচেষ্টার ফলে। পশ্চিমা বিশ্বে ধর্ম নির্বিশেষে প্রি ম্যারিটাল কাউন্সেলিং হয়ে থাকে।
আপনার সাথে আল্লাহর সম্পর্ক বৃদ্ধির জন্য তাগিদ এবং প্রয়োজনীয়তা আপনি এই চিন্তাভাবনার মাধ্যমে বের করতে পারবেন ইনশাআল্লাহ। এছাড়া বেশিরভাগ মানুষকেই দেখা যায় তারা কী — এটা বুঝার আগেই তারা বিয়ে করে ফেলে, ফলে নানাবিধ জটিলতা হয়, অস্বস্তিকর পারিবারিক সম্পর্কের পেছনে এর ভূমিকা থাকে।
• আপনার বাচনভঙ্গী, শব্দচয়ন = মোটকথা কমিউনিকেশন স্কিল
• বাজেট করা এবং টাকাপয়সার হিসেব করা
• রাগকে সংযত করতে পারা
• আপনার সাথে কারো সমস্যা হলে কীভাবে তা সামলান
• সম্পর্কের টানাপোড়েন হলে সমাধান করার ব্যাপারে আপনি প্রস্তুতি
বিয়ের জন্য এই সবগুলোই খুব দরকারি গুণাবলী। তাই এইসব ব্যাপারে সম্ভব হলে কারো সাথে কাউন্সেলিং করে নেয়া উচিত।
সম্ভাব্য পছন্দ?
যখন কেউ সম্ভাব্য জীবনসঙ্গী নির্বাচনের কাছাকাছি চলে আসেন, তখন থেকেই ইস্তিখারা নামায আদায় করা প্রয়োজন, পরিবারের এবং বন্ধুদের মাঝে যারা জ্ঞানী এবং প্রজ্ঞাসম্পন্ন মানুষ — তাদের সাথে আলাপ করা দরকার। আলাপ ও উপদেশের জন্য যিনি ধর্মীয় জ্ঞানে এবং আচরণে উন্নত — এমন মানুষের পরামর্শই নেয়া দরকার। ইসলামে আল্লাহর স্মরণকারীদের মাঝে পরামর্শ খুবই কল্যাণময় এবং প্রয়োজনীয়।
বিয়ে হলো দ্বীনের অর্ধেক। এটি জীবনে নেয়া সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটা। তাই সম্ভাব্য জীবনসঙ্গীর ব্যাপারে, তার আচার-আচরণ সম্পর্কে, দ্বীনের ব্যাপারে তার অবস্থান, তার চরিত্র সম্পর্কে যতটুকু সম্ভব খোঁজ নেয়া ভালো। আর তার স্বভাব, ব্যবহারের সাথে অপরজনের মিলবে কিনা, এটা নিয়ে চিন্তাভাবনার প্রয়োজন আছে।
জীবনসঙ্গী পছন্দ করার আগে একটা কথা মাথায় রাখা প্রয়োজন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ
“চারটি বিষয়কে সামনে রেখে মেয়েদেরকে বিয়ে করা যেতে পারেঃ তার ধন সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার রূপ-সৌন্দর্য ও তার ধর্মপরায়নতা। এক্ষেত্রে ধর্মপরায়ন স্ত্রী লাভে বিজয়ী হও, তোমার হাত কল্যাণে ভরে যাবে।” [বুখারী ও মুসলিম] – [৫]
উস্তাদ নুমান আলী খানের একটা অসাধারণ আলোচনা আছে বিয়ের উপরে। বিবাহিত অবিবাহিত সবারই উপকার হবার কথা এই আলোচনা থেকে। দেখার জন্য আবশ্যকীয় একটি ভিডিও এটি –
বিয়ের পর দু’জন নতুন মানুষ একসাথে থাকতে শুরু করলে সহনশীলতা খুবই দরকার পড়ে। সবাই মূলতঃ কেবল নিজের *প্রাপ্তি* বা *আকাঙ্ক্ষা* নিয়ে ভাবতে থাকে বেশি করে, আর তাই প্রবঞ্চিত অনুভব করার সম্ভাবনা থাকে।
সমগ্র পৃথিবীর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান পরিবার। পরিবারে অশান্তি থাকলে মুসলিম সমাজে অরাজকতা তৈরি হবে। পরিবারে শান্তি না থাকলে তা চরিত্র স্খলনের সম্ভাবনা তৈরি করে দেয়। পরিবারে প্রশান্তি না থাকলে সদস্যরা তাদের দ্বীনের দায়িত্বসমূহ পালনে উদাসীন এবং অমনোযোগী হয়ে পড়তে পারেন। আর তাই, এই সিদ্ধান্ত খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
মুসলিম তরুণদের উচিত প্রেম করতে ঝাঁপিয়ে না পড়ে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণার্থে চরিত্রকে রক্ষার জন্য চোখকে, মনকে সংযত করা। একজন সফল মু’মিন হতে হলে নিজেকে সংযত রাখা জরুরী। [৪] পাশাপাশি দরকার আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে দুআ করা। একটা সুন্দর দু’আ হলো– “রাব্বানা হাবলানা মিন আযওয়াযিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা ক্কুররাতা আ’ইয়ুনিন ওয়া জা’আলনা লিল মুত্তাক্কিনা ইমামা”।
অর্থঃ “হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে এবং আমাদের সন্তানের পক্ষ থেকে আমাদের জন্যে চোখের শীতলতা দান কর এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের জন্যে আদর্শস্বরূপ কর।” [সূরা ফুরক্কানঃ ৭৪]
আল্লাহ আমাদের মুসলিম ভাই এবং বোনদের সহায় হোন, তাদের রহম করুন, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের যোগ্য করে দিন। সুন্দর সুন্দর পরিবার গঠনের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর কলুষতা থেকে মুক্ত থাকুক, নতুন প্রজন্মকে সত্যিকার দ্বীন উপহার দেয়ার যোগ্য হোক নতুন পরিবার গড়া মুসলিম মুসলিমাহরা। আল্লাহ আমাদের সবাইকে রহম করুন।
রেফারেন্স
[১] [ভিডিও] দি হেলদি ম্যারেজ :: নুমান আলী খান
[২] আল কুরআন – সূরা আল-বাকারাহ [১৮৭]
[প্রবন্ধ] অন ইসলাম ডট নেট :: Do You Really Want to Get Married?: Dr Aneesah Nadir
[ভিডিও] ইস্তিখারা কী ও কীভাবে :: আব্দুল নাসির জাংদা
[প্রবন্ধ] বিয়ের প্রস্তাবে করণীয় ও বর্জনীয়
[৩] [পরিসংখ্যান] Internet Pornography Statistics
[৪] আল কুরআন – সূরা মু’মিনুন [১-৬]
[৫] রিয়াদুস সলিহীন হাদিস – ৩৬৫
মানুষের উপর জিনের আছর : কারণ, প্রতিকার ও সুরক্ষার উপায় -১
Posted by QuranerAlo.com Team • নভেম্বর 23, 2012 • Printer-friendly
Download article as PDF

প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না
লেখক : আব্দুল্লাহ শহীদ আব্দুর রহমান
সম্পাদনা : আবু শুআইব মুহাম্মদ সিদ্দিক
প্রথম কথা
একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারের কাছে বসা ছিলাম। তার স্ত্রীও একজন ভাল ডাক্তার। উভয়ে ধর্মপ্রাণ। হজ করেছেন এক সাথেই। দুটো মেয়েকেই তানজীমুল উম্মাহ মাদরাসাতে ভর্তি করিয়েছেন। আমাকে বললেন, তানজীমুল উম্মাহ মাদরাসা আরবী মিডিয়ামের স্কলাস্টিকা তাই না? আমি বললাম, হ্যা। উদ্দেশ্য তার উৎসাহকে স্বাগত জানানো। মানে তারা দুটো সন্তানকেই মাদরাসায় ভর্তি করিয়ে গর্ববোধ করেন। কতখানি ধর্মপ্রাণ হলে এমন হতে পারে তা আপনার ভেবে দেখার বিষয় বটে। রোগী দেখার ফাঁকে ফাঁকে আমার সাথে গল্প করছেন। শুধু আমার সাথেই নয়। আলেম-উলামাদের কাউকে কাছে পেলে আন্তরিকতার সাথেই আলাপ করেন। জানতে চান। জানাতে চান।
একজন মহিলা আসল, সাথে তার মেয়ে। সে রোগের বিবরণ দিয়ে বলল, কয়েকদিন আগে ওকে জিনে আছর করেছিল। ওঝা-ফকিরেরা জিন তাড়িয়েছে। এ কথা শুনে ডাক্তার সাহেব রেগে গেলেন। বললেন, কিসের জিন? জিন বলতে কিছু আছে নাকি? জিন আবার মানুষকে ধরে নাকি? যত সব অন্ধ বিশ্বাস! জিন-ভূত বলতে কোন কিছু নেই। জিনে মানুষ ধরে না। মানুষকে আছর করে না। এটা মানসিক রোগ দ্বারা সৃষ্ট একটি কল্পনা। এ কল্পনার কারণে সৃষ্টি হয়েছে একটি অস্বাভাবিক অবস্থা।
তার আবেগ কমে গেলে আমি তাকে এ বিষয়টি বুঝাতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু এতে তার কোন আগ্রহ দেখলাম না। আমি বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে চাইলেই সে অন্য প্রসঙ্গের অবতারণা করে। আমি বুঝলাম, এ বিষয়ে আলোচনা তার পছন্দ নয়। সে যা বুঝেছে, সেটাকেই সে চুরান্ত বলে বিশ্বাস করে নিয়েছে। বিশ্বাসটা যে সংশোধন করার প্রয়োজন এটা তিনি বুঝতে চাচ্ছেন না।
আসলে কি জিন আছে? জিন কী? ইসলাম কী বলে? জিনদের অস্তিত্বে বিশ্বাস না করা ইসলামে কতখানি গ্রহণযোগ্য? জিন কি মানুষকে আছর করে? এ সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কী? এ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করব এ প্রবন্ধে।
যে সকল বিষয় এখানে আলোচনা করব সেগুলো হল:
এক. জিনের পরিচয়
দুই. জিনের প্রকার
তিন. জিনের অস্তিত্বে বিশ্বাস ঈমানের দাবি
চার. জিন কি মানুষকে আছর করে?
পাঁচ. জিন ও ভূতের মধ্যে পার্থক্য
ছয়. মানসিক রোগী আর জিনে-ধরা রোগীর মধ্যে পার্থক্য
সাত. কি কারণে জিন চড়াও হয়?
আট. জিনের আছরের প্রকারভেদ
নয়. জিনের আছর থেকে বাঁচতে হলে যা করতে হবে
দশ. জিনের আছরের চিকিৎসা
এগার. জিনের অধিকার রক্ষায় আমাদের করণীয়
১) জিনের পরিচয়
জিন আল্লাহ তাআলার একটি সৃষ্টি। যেমন তিনি ফেরেশ্‌তা, মানুষ সৃষ্টি করেছেন তেমনি সৃষ্টি করেছেন জিন। তাদের বিবেক, বুদ্ধি, অনুভূতি শক্তি রয়েছে। তাদের আছে ভাল ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষমতা। তাদের মধ্যে আছে ভাল জিন ও মন্দ জিন। আল কুরআনে জিনদের বক্তব্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে:
আর নিশ্চয় আমাদের কতিপয় সৎকর্মশীল এবং কতিপয় এর ব্যতিক্রম। আমরা ছিলাম বিভিন্ন মত ও পথে বিভক্ত। (সূরা আল জিন : ১১)
এ গোষ্ঠির নাম জিন রাখা হয়েছে, কারণ জিন শব্দের অর্থ গোপন। আরবী জিন শব্দ থেকে ইজতিনান এর অর্থ হল ইসতেতার বা গোপন হওয়া। যেমন আল কুরআনে আল্লাহ বলেছেন :
فَلَمَّا جَنَّ عَلَيْهِ اللَّيْلُ
অতঃপর যখন রাত তার উপর আচ্ছন্ন হল … (সূরা আল আনআম : ৭৬)
এখানে জান্না অর্থ হল, আচ্ছন হওয়া, ঢেকে যাওয়া, গোপন হওয়া।
তারা মানুষের দৃষ্টি থেকে গোপন থাকে বলেই তাদের নাম রাখা হয়েছে জিন। যেমন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন:
নিশ্চয় সে ও তার দলবল তোমাদেরকে দেখে যেখানে তোমরা তাদেরকে দেখ না। (সূরা আল আরাফ : ২৭)
জিনদের সৃষ্টি করা হয়েছে আগুন দিয়ে। মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ বলেন:
আর ইতঃপূর্বে জিনকে সৃষ্টি করেছি উত্তপ্ত অগ্নিশিখা থেকে। (সূরা আল হিজর : ২৭)
এ আয়াত দ্বারা আমরা আরো জানতে পারলাম যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষ সৃষ্টি করার পূর্বে জিন সৃষ্টি করেছেন। ইরশাদ হয়েছে:
আর অবশ্যই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি শুকনো ঠনঠনে, কালচে কাদামাটি থেকে। আর এর পূর্বে জিনকে সৃষ্টি করেছি উত্তপ্ত অগ্নিশিখা থেকে। (সূরা আল হিজর : ২৬-২৭)
আল্লাহ তাআলা যে উদ্দেশ্যে মানুষ সৃষ্টি করেছেন সে-ই উদ্দেশ্যেই জিনকে সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি বলেন:
আর জিন ও মানুষকে কেবল এজন্যই সৃষ্টি করেছি যে, তারা আমার ইবাদাত করবে। (সূরা আয যারিয়াত : ৫৬)
জিনদের কাছেও তিনি নবী ও রাসূল প্রেরণ করেছিলেন। তিনি বলেন:
হে জিন ও মানুষের দল, তোমাদের মধ্য থেকে কি তোমাদের নিকট রাসূলগণ আসেনি, যারা তোমাদের নিকট আমার আয়াতসমূহ বর্ণনা করত এবং তোমাদের এই দিনের সাক্ষাতের ব্যাপারে তোমাদেরকে সতর্ক করত? তারা বলবে, আমরা আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলাম। আর দুনিয়ার জীবন তাদেরকে প্রতারিত করেছে এবং তারা নিজেদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে যে, তারা ছিল কাফির। (সূরা আল আনআম : ১৩০)
এ আয়াত দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়, বিচার দিবসে মানুষের যেমন বিচার হবে তেমনি জিন জাতিকেও বিচার ও জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে।
তারা বিবিধ রূপ ধারণ করতে পারে বলে হাদীসে এসেছে। এমনিভাবে দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে পারে বলে আল কুরআনের সূরা আন নামলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আসমানী কিতাবে যারা বিশ্বাসী-ইহুদী, খৃষ্টান ও মুসলমান- তারা সকলে জিনের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে। তারা কেউ জিনের অস্তিত্ব অস্বীকার করে না। পৌত্তলিক, কতিপয় দার্শনিক, বস্তুবাদী গবেষকরা জিনের অস্তিত্ব অস্বীকার করে না। দার্শনিকদের একটি দল বলে থাকে, ফেরেশ্‌তা ও জিন রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়। সুন্দর চরিত্রকে ফেরেশ্‌তা আর খারাপ চরিত্রকে জিন বা শয়তান শব্দ দিয়ে বুঝানো হয়। অবশ্য তাদের এ বক্তব্য কুরআন ও সুন্নাহর সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
২) জিনের প্রকার
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ সম্পর্কে বলেছেন :
জিন তিন প্রকার। এক. যারা শূন্যে উড়ে বেড়ায়। দুই. কিছু সাপ ও কুকুর। তিন. মানুষের কাছে আসে ও চলে যায়।
(সূত্র : তাবারানী। প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ শায়খ আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। দেখুন, সহীহ আল জামে আস সাগীর, হাদীস নং ৩১১৪, আবু সালাবা আল খাশানী রা. থেকে বর্ণিত।) (মুজামু আলফাজ আল-আকীদাহ)
জিন বিভিন্ন প্রাণীর রূপ ধারণ করতে পারে। কিন্তু তাদের একটি গ্রুপ সর্বদা সাপ ও কুকুরের বেশ ধারণ করে চলাফেরা করে মানব সমাজে। এটা তাদের স্থায়ী রূপ।
৩) জিনের অস্তিত্বে বিশ্বাস ঈমানের দাবী
একজন মুসলিমকে অবশ্যই জিনের অস্তিত্ব স্বীকার করতে হবে। যদি সে জিনের অস্তিত্ব অস্বীকার করে, তাহলে সে মুমিন থাকবে না। জিনের অস্তিত্ব স্বীকার ঈমান বিল গাইব বা অদৃশ্যের প্রতি ঈমান আনার অন্তর্ভূক্ত। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আল কুরআনের প্রায় পঞ্চাশ বার জিনের আলোচনা করেছেন। জিনজাতির সৃষ্টি, সৃষ্টির উদ্দেশ্য, তাদের ইসলাম গ্রহণ, মানুষের পূর্বে তাদের সৃষ্টি করা, ইবলীস জিনের অন্তর্ভূক্ত, সূরা আর রাহমানে জিন ও মানুষকে এক সাথে সম্বোধন, নবী সুলাইমান আলাহিসসালাম এর আমলে জিনদের কাজ-কর্ম করা, তাদের মধ্যে রাজমিস্ত্রী ও ডুবুরী থাকার কথা, তাদের রোজ হাশরে বিচার শাস্তি ও পুরস্কারের সম্মুখীন হওয়া ইত্যাদি বহু তথ্য আল কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন উল্লেখ করেছেন। তাদের সম্পর্কে বলতে যেয়ে সূরা আল-জিন নামে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা নাযিল করেছেন। তাই কোন মুসলমান জিনের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে আল্লাহর কালামকে অস্বীকার করার মত কাজ করতে পারে না। তেমনি জিনকে রূপক অর্থে ব্যবহার করার কথাও ভাবতে পারে না। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকীদা এটাই। বিভ্রান্ত ও বিলুপ্ত মুতাযিলা ও জাহমিয়্যা সমপ্রদায় জিনের অস্তিত্ব স্বীকার করে না।
৪) জিন কি মানুষকে আছর করে?
এর উত্তর হল, অবশ্যই জিন মানুষকে আছর করতে পারে। স্পর্শ দ্বারা পাগল করতে পারে। মানুষের উপর ভর করতে পারে। তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তার জীবনের স্বাভাবিক কাজ-কর্ম ব্যাহত করতে পারে। এটা বিশ্বাস করতে হয়। তবে এ বিষয়টি কেহ অবিশ্বাস করলে তাকে কাফের বলা যাবে না। সে ভুল করেছে, এটা বলা হবে।জিন যে মানুষকে আছর করে তার কিছু প্রমাণ: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبَا لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُومُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطَانُ مِنَ الْمَسِّ
যারা সুদ খায়, তারা তার ন্যায় দাড়াবে, যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল বানিয়ে দেয়। (সূরা আল বাকারা : ২৭৫)
এ আয়াত দ্বারা যে সকল বিষয় স্পষ্টভাবে বুঝা যায়:
এক. যারা সূদ খায় তাদের শাস্তির ধরণ সম্পর্কে ধারণা।
দুই. শয়তান বা জিন মানুষকে স্পর্শ দ্বারা পাগলের মত করতে পারে।
তিন. মানুষের উপর শয়তান বা জিনের স্পর্শ একটি সত্য বিষয়। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।
চার. জিন-শয়তানের এ স্পর্শ দ্বারা মানুষ যেমন আধ্যাত্নিক দিক দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তেমনি শারীরিক দিক দিয়েও অস্বাভাবিক হয়ে যায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
আর যে পরম করুণাময়ের জিকির থেকে বিমুখ থাকে আমি তার জন্য এক শয়তানকে নিয়োজিত করি, ফলে সে হয়ে যায় তার সঙ্গী। (সূরা যুখরুফ : ৩৬)
এ আয়াত দ্বারা যা স্পষ্ট হল : মহান রাহমান ও রহীম আল্লাহ তাআলার জিকির থেকে বিরত থাকা জিন শয়তানের স্পর্শ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার একটি কারণ।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
আর স্মরণ কর আমার বান্দা আইউবকে, যখন সে তার রবকে ডেকে বলেছিল, শয়তান তো আমাকে কষ্ট ও আযাবের ছোঁয়া দিয়েছে। (সূরা সাদ : ৪১)
এ আয়াত দ্বারা আমরা স্পষ্টভাবে বুঝলাম:
এক. শয়তান নবী আইউব আলাহিস সালামকে স্পর্শ করে শারীরিক রোগ-কষ্ট বাড়িয়ে দিয়েছিল।
দুই. তিনি শয়তানের স্পর্শ থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহ তাআলার কাছেই প্রার্থনা করেছিলেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। (সূরা আল আরাফ : ২০১)
এ আয়াত থেকে যা বুঝে আসে তা হল:
এক. যারা মুত্তাকী বা আল্লাহ ভীরু তাদেরকেও জিন বা শয়তান স্পর্শ করতে পারে। তারা মুত্তাকী হয়েও জিন বা শয়তানের আছরে নিপতিত হতে পারে।
দুই. যারা মুত্তাকী তাদের শয়তান বা জিন স্পর্শ করলে তারা আল্লাহ-কেই স্মরণ করে। অন্য কোন কিছুর দ্বারস্থ হয় না।
তিন. মুত্তাকীগণ জিন বা শয়তান দ্বারা স্পর্শ হয়ে আল্লাহকে স্মরণ করলে তাদের সত্যিকার দৃষ্টি খুলে যায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
আর যদি শয়তানের পক্ষ হতে কোন প্ররোচনা তোমাকে প্ররোচিত করে, তবে তুমি আল্লাহর আশ্রয় চাও। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। (সূরা আল আরাফ : ২০০)
এ আয়াতে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হল:
এক. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামকেও জিন-শয়তান আছর করতে পারে।
দুই. জিন আছর করলে বা শয়তানের কুমন্ত্রণা অনুভব করলে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
তিন. সূরা আল ফালাক ও সূরা আন-নাছ হল জিন শয়তানের আছর থেকে আশ্রয় প্রার্থনার অতি মুল্যবান বাক্য। এ আয়াতের তাফসীর দ্বারা এটা প্রমাণিত।
হাদীসে এসেছে – আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, অবশ্যই শয়তান মানুষের রক্তের শিরা উপশিরায় চলতে সক্ষম। ( বুখারী ও মুসলিম)
হাদীসে আরো এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন বললেন, গত রাতে একটি শক্তিশালী জিন আমার উপর চড়াও হতে চেয়েছিল। তার উদ্দেশ্য ছিল আমার নামাজ নষ্ট করা। আল্লাহ তার বিরুদ্ধে আমাকে শক্তি দিলেন। ( বুখারী, সালাত অধ্যায়)
ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী রহ. এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত নাসায়ীর বর্ণনায় আরো এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি তাকে ধরে ফেললাম। আছার দিলাম ও গলা চেপে ধরলাম। এমনকি তার মুখের আদ্রতা আমার হাতে অনুভব করলাম।
এ হাদীস থেকে আমরা যা জানতে পারলাম :
এক. জিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামকেও আছর করতে চেয়েছিল।
দুই. জিনটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নামাজ নষ্ট করার জন্য তাঁর কাছে এসেছিল।
তিন. ইফরীত শব্দের বাংলা অর্থ হল ভূত। জিনদের মধ্যে যারা দুষ্ট ও মাস্তান প্রকৃতির তাদের ইফরীত বলা হয়।
চার. জিন দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন ভয় পাননি। তিনি তার সাথে লড়াই করে পরাস্ত করেছেন।
পাঁচ. জিনদের শরীর বা কাঠামো আছে যদিও তা সাধারণত আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় না।

মানুষের উপর জিনের আছর : কারণ, প্রতিকার ও সুরক্ষার উপায়-২
Posted by QuranerAlo.com Editor • নভেম্বর 26, 2012 • Printer-friendly
Download article as PDF

প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না
পর্ব ১ | পর্ব ৩
লেখক : আব্দুল্লাহ শহীদ আব্দুর রহমান | সম্পাদনা : আবু শুআইব মুহাম্মদ সিদ্দিক

প্রথম পর্বে আমরা জেনেছি- জিনের পরিচয়, জিনের প্রকার, জিনের অস্তিত্বে বিশ্বাস ঈমানের দাবি এবং জিন কি মানুষকে আছর করে কিনা এই সব সম্পর্কে।
৫) জিন ও ভূতের মধ্যে পার্থক্য
জিন আরবী শব্দ। বাংলাতেও জিন শব্দটি ব্যবহৃত হয়। কিন্তু ভূত বাংলা শব্দ। এর আরবী হল ইফরীত, বহুবচনে আফারীত। আল কুরআনে ইফরীত কথাটি এসেছে এভাবে :
قَالَ عِفْريتٌ مِنَ الْجِنِّ أَنَا آَتِيكَ بِهِ قَبْلَ أَنْ تَقُومَ مِنْ مَقَامِكَ وَإِنِّي عَلَيْهِ لَقَوِيٌّ أَمِينٌ
এক শক্তিশালী জিন বলল, আপনি আপনার স্থান থেকে উঠার পূর্বেই আমি তা এনে দেব। আমি নিশ্চয়ই এই ব্যাপারে শক্তিমান, বিশ্বস্ত।(সূরা আন-নামলঃ ৩৯ )
এ আয়াতে ইফরীতুম মিনাল জিন অর্থ্যাৎ জিনদের মধ্যে থেকে এক ইফরীত বা ভূত .. কথাটি এসেছে। এমনিভাবে উপরে বর্ণিত হাদীসেও ইফরীতুম মিনাল জিন কথাটি এসেছে। তাফসীরবিদগণ বলেছেন, জিনদের মধ্যে যারা অবাধ্য, বেয়ারা, মাস্তান, দুষ্ট প্রকৃতির ও শক্তিশালী হয়ে থাকে তাদের ইফরীত বলা হয়। (আল মুফরাদাত ফী গারিবিল কুরআন)
ইফরীত শব্দের অর্থ বাংলাতে ভূত।
অতএব দেখা গেল ইফরীত বা ভূত, জিন ছাড়া আর কিছু নয়। সব ভূতই জিন তবে সব জিন কিন্তু ভূত নয়।
৬) মানসিক রোগী আর জিনে ধরা রোগীর মধ্যে পার্থক্য
অনেক সময় আমরা এ সমস্যায় পড়ে যাই। ঠিক করতে পারি না রোগটা কি মানসিক না-কি পাগল, না কি জনিরে আছর থেকে রোগ দেখা দিয়েছে। অনেক সময় তাই আমরা মানসিক-রোগীকে জিনে-ধরা রোগী বলে থাকি। তেমনি জিনে-ধরা রোগীকে মানসিক রোগী বলে চালাতে চেষ্টা করি। বিশেষ করে ডাক্তার ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা কোনভাবেই জিনের আছরকে স্বীকার করতে চান না। তারা এ জাতীয় সকল রোগীকে মানসিক রোগী বলে সনাক্ত করে থাকেন।
পাগলামী-কে আরবীতে বলা হয় জুনুন। আর পাগল-কে বলা হয় মাজনূন। আরবীতে এ জুনুন ও মাজনূন শব্দ দুটো কিন্তু জিন শব্দ থেকেই এসেছে। যেমন আল কুরআনে এসেছে :
إِنْ هُوَ إِلَّا رَجُلٌ بِهِ جِنَّةٌ فَتَرَبَّصُوا بِهِ حَتَّى حِينٍ
সে কেবল এমন এক লোক, যার মধ্যে পাগলামী রয়েছে। অতএব তোমরা তার সম্পর্কে কিছুকাল অপেক্ষা কর।
এ কথাটি নূহ আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়ের লোকেরা তার সম্পর্কে বলেছিল। এ আয়াতে জিন্নাতুন শব্দের অর্থ হল পাগলামী।
কাজেই কাউকে পাগলামীর মত অস্বাভাবিক আচরণ করতে দেখলে সেটা যেমন জিনের আছরের কারণে হতে পারে, আবার তা মানসিক রোগের কারণেও হতে পারে। তবে এ বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু বিষয় নির্ধারণ করেছেন, যার মাধ্যমে মানসিক রোগী আর জিনে-ধরা রোগীর মধ্যে পার্থক্য করা যায়।
এগুলো হল:
এক. জিনে-ধরা রোগী কিছুক্ষণের জন্য বেহুশ হয়ে যায়। মানসিক রোগী বেহুশ হয়ে পড়ে না।
দুই. কখনো কখনো জিনে-ধরা রোগীর মুখ থেকে ফেনা বের হয়। দাতে খিল লেগে যায়। মানসিক রোগীর মুখ থেকে ফেনা বের হয় না।
তিন. জিনে ধরা রোগী প্রায়ই সপ্নে সাপ, কুকুর, বিচ্ছু, বানর, শিয়াল, ইঁদুর ইত্যাদি দেখে থাকে। কখনো কখনো সপ্নে দেখে সে অনেক উচু স্থান থেকে পড়ে যাচ্ছে।
চার. জিনে ধরা রোগীর সর্বদা ভীতু ভাব থাকে। সর্বদা তার ভয় লাগে। মানসিক রোগীর তেমন ভয় থাকে না।
পাঁচ. জিনে ধরা রোগী নামাজ পড়া, কুরআন তেলাওয়াত, আল্লাহর যিকির ইত্যাদি পছন্দ করে না। বরং এগুলো তার অস্থিরতা বাড়িয়ে দেয়।
ছয়. জিনে ধরা রোগী কখনো কখনো ভিন্ন ভাষা ও ভিন্ন ভঙ্গিতে কথা বলে।
সাত. জিনে ধরা রোগী অধিকাংশ সময় স্বাভাবিক থাকে। মাঝে মধ্যে অস্বাভাবিক আচরণ করে।
আট. জিনে-ধরা রোগী থেকে অনেক সময় আশ্চর্যজনক বিষয় প্রকাশ হয়ে থাকে। যেমন অল্প সময়ে সে বহু দূরে চলে যায়। গাছে উঠে সরু ডালে বসে থাকে ইত্যাদি।
নয়. জিনে ধরা রোগীর কাছে স্বামী, ঘর-সংসার, স্ত্রী-সন্তানদের ভাল লাগে না।
দশ. জিনে ধরা রোগীর উপর যখন জিন চড়াও হয় তখন ক্যামেরা দিয়ে তার ছবি তুললে ছবি ধোঁয়ার মত অস্পষ্ট হয়। স্পষ্ট হয় না। দেখা গেছে আশে পাশের সকলের ছবি স্পষ্টভাবে উঠেছে কিন্তু রোগীর ছবিটি ধোয়াচ্ছন্ন। এটা কারো কারো নিজস্ব অভিজ্ঞতা। মনে রাখতে হবে অভিজ্ঞতা সর্বদা এক রকম ফলাফল নাও দিতে পারে।
কিন্তু বড় সমস্যা হবে তখন, যখন রোগীটি নিজেকে জিনে ধরা বলে অভিনয় করে কিন্তু তাকে জিনেও আছর করেনি আর সে মানসিক রোগীও নয়। সে তার নিজস্ব একটি লক্ষ্য পূরণের জন্য জিনে ধরার অভিনয় করছে।
এ অবস্থায় অভিভাবকের করণীয় হল, তারা তাকে তার দাবী পুরণের আশ্বাস দেবে। তাহলে তার জিন ছেড়ে যাবে। পরে তার দাবীটি যৌক্তিক হলে পূরণ করা হবে আর অযৌক্তিক হলে পূরণ করা হবে না। এরপর যদি সে আবার জিনে ধরার অভিনয় করে তাহলে তাকে জিনে ধরা রোগী বলে আর বিশ্বাস করার দরকার নেই। অনেক সময় শারিরিক শাস্তির ভয় দেখালে এ ধরনের বাতিল জিন চলে যায়।
৭) কি কারণে জিন চড়াও হয়
কিছু বিষয় রয়েছে যার উপস্থিতির কারণে মানুষকে জিনে আছর করে।
এক. প্রেম। কোন পুরুষ জিন কোন নারীর প্রেমে পড়ে যায়, অথবা কোন নারী জিন যদি কোন পুরুষের প্রেমে পড়ে তাহলে জিন তার ঐ প্রিয় মানুষটির উপর আছর করে।
দুই. কোন মানুষ যদি কোন জিনের প্রতি জুলুম-অত্যাচার করে বা কষ্ট দেয় তাহলে অত্যাচারিত জিনটি সেই মানুষের উপর চড়াও হয়। যেমন জিনের গায়ে আঘাত করলে, তার গায়ে গরম পানি নিক্ষেপ করলে, কিংবা তার খাদ্য-খাবার নষ্ট করে দিলে জিন সেই মানুষটির উপর চড়াও হয়।
তিন. জিন খামোখা জুলুম-অত্যাচার করার জন্য মানুষের উপর চড়াও হয়। তবে এটি পাঁচটি কারণে হতে পারে : (ক) অতিরিক্ত রাগ (খ) অতিরিক্ত ভয় (গ) যৌন চাহিদা লোপ পাওয়া (ঘ) মাত্রাতিরিক্ত উদাসীনতা। (ঙ) নোংড়া ও অপবিত্র থাকা।
কারো মধ্যে এ স্বভাবগুলো থাকলে জিন তাকে আছর করে অত্যাচার করার সুযোগ পেয়ে যায়।
৮) জিনের আছরের প্রকারভেদ
মানুষের উপর জিন চড়াও হওয়ার ধরনটি চার প্রকারের হতে পারে।
এক. জিন মানুষের পুরো শরীরে প্রভাব বিস্তার করে কিছু সময়ের জন্য।
দুই. আংশিকভাবে শরীরের এক বা একাধিক অংশে সে প্রভাব বিস্তার করে কিছু সময়ের জন্য। যেমন হাতে অথবা পায়ে কিংবা মুখে।
তিন. স্থায়ীভাবে জিন মানুষের শরীরে চড়াও হতে পারে। এর মেয়াদ হতে পারে অনেক দীর্ঘ।
চার. মানুষের মনের উপর কিছু সময়ের জন্য প্রভাব বিস্তার করে। মানুষ যখন আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা শুরু করে তখন চলে যায়।
৯) জিনের আছর থেকে বাঁচতে হলে যা করতে হবে
এক. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে হবে ও ইসলামী শরিয়তের অনুসরণ করতে হবে।

কারণ আল্লাহ তাআলা বলেছেন :
وَمَنْ يَعْشُ عَنْ ذِكْرِ الرَّحْمَنِ نُقَيِّضْ لَهُ شَيْطَانًا فَهُوَ لَهُ قَرِينٌ
আর যে পরম করুণাময়ের জিকির থেকে বিমুখ থাকে আমি তার জন্য এক শয়তানকে নিয়োজিত করি, ফলে সে হয়ে যায় তার সঙ্গী। (সূরা যুখরুফ : ৩৬)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের কেহ যখন ঘুমিয়ে যায় শয়তান তখন তার মাথার কাছে বসে তিনটি গিরা লাগায়। প্রতিটি গিরা দেয়ার সময় একটি কথা বলে: তোমার সামনে আছে দীর্ঘ রাত, তুমি ঘুমাও। যখন সে নিদ্রা থেকে উঠে আল্লাহর জিকির করে তখন একটি গিরা খুলে যায়। এরপর যখন সে অজু করে তখন আরেকটি গিরা খুলে যায়। এরপর যখন নামাজ পড়ে তখন শেষ গিরাটি খুলে যায়। ফলে সে সারাদিন কর্মতৎপর ও সুন্দর মন নিয়ে দিন কাটায়। আর যদি এমন না করে, তাহলে সারাদিন তার কাটে খারাপ মন ও অলসভাব নিয়ে।” (বর্ণনায় : বুখারী ও মুসলিম)
এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হল:
(১) ঠিকমত অজু করলে, নামাজ আদায় করলে শয়তানের চড়াও থেকে মুক্ত থাকা যায়।
(২) খারাপ মন নিয়ে থাকা ও অলসতা শয়তানের কুমন্ত্রণার ফল।
(৩) রীতিমত নামাজ আদায় করলে শরীর ও মন প্রফুল্ল থাকে। কর্মতৎপরতা বৃদ্ধি পায়। অলসতা দূর হয়ে যায়।
(৪) ঘুম থেকে উঠার সাথে সাথে অজু গোসল করার আগেই আল্লাহর জিকির করা উচিত। ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার নির্দিষ্ট দুআ আছে। এটি পাঠ করা সুন্নত। এতে শয়তানের কুপ্রভাব দূর হয়ে যায়।
দুই. ঘর থেকে বের হওয়ার সময় দুআ পাঠ করা
হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : যে ব্যক্তি ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বলবে, বিছমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহি অলা হাওলা অলা কুওআতা ইল্লা বিল্লাহি (আল্লাহরই নামে আল্লাহর উপর নির্ভর করে বের হলাম। আর তার সামর্থ ব্যতীত পাপ থেকে বাচাঁর উপায় নেই এবং তার শক্তি ব্যতীত ভাল কাজ করা যায় না) তখন তাকে বলা হয়, তোমার জন্য এটা যথেষ্ট, তোমাকে সুরক্ষা দেয়া হল এবং তোমাকে পথের দিশা দেয়া হল। আর শয়তান তার থেকে দূরে চলে যায়। (বর্ণনায়: আবু দাউদ ও তিরমিজী)
তিন. পেশাব পায়খানাতে যাওয়ার সময় দুআ পাঠ করা:
হাদীসে এসেছে- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন পেশাব পায়খানায় প্রবেশ করতেন, তখন বলতেন আল্লাহুম্মা ইন্নী আউজুবিকা মিনাল খুবুছি ওয়াল খাবায়িছ (হে আল্লাহ আমি আপনার কাছে জিন নর ও জিন নারী থেকে আশ্রয় নিচ্ছি) (বর্ণনায় : বুখারী ও মুসলিম)
অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : এ সকল পেশাব পায়খানার স্থানে জিন শয়তান থাকে। অতএব তোমাদের কেহ যখন এখানে আসে সে যেন বলে, আল্লাহুম্মা ইন্নী আউজু বিকা মিনাল খুবুছি ওয়াল খাবায়িছ। (বর্ণনায় : ইবনে হিব্বান)
চার. প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় এ দুআটি তিনবার পাঠ করা
أعُوْذُ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ
(আউজু বিকালি মাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন শাররি মা খালাকা) অর্থ: আমি আল্লাহ তাআলার পরিপূর্ণ বাক্যাবলীর মাধ্যমে তাঁর সৃষ্টির সকল অনিষ্টতা থেকে আশ্রয় নিচ্ছি। (বর্ণনায় : মুসলিম, তিরমিজী, আহমাদ)
অন্য বর্ণনায় এসেছে, এক ব্যক্তি নবী কারীম সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে এসে বলল, গত রাতে আমাকে একটি বিচ্ছুতে দংশন করেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, আমি কি তোমাকে বলিনি যখন সন্ধ্যা হবে তখন তুমি বলবে, আউজু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন শাররি মা খালাকা। তাহলে তোমাকে কোন কিছু ক্ষতি করতে পারত না। (বর্ণনায় : মুসলিম, হাদীস নং ২৭০৯)
অন্য আরেকটি বর্ণনায় এসেছে- একটি জিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে আছর করতে চেয়েছিল। তার সাথে আরেকটি জিন ছিল। জিব্রাইল এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আপনি এ বাক্যটি বলুন তাহলে ওরা আপনাকে কিছু করতে পারবে না। (বর্ণনায় : ইবনে আবি হাতেম)
এমনিভাবে কেউ যখন কোন স্থানে যায় আর এ দুআটি পাঠ করে তাহলে তাকে কোন কিছু ক্ষতি করতে পারবে না।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: যে ব্যক্তি কোন স্থানে অবতরণ করল অতঃপর বলল: আউজু বিকালি মাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন শাররি মা খালাকা (আমি আল্লাহ তাআলার পরিপূর্ণ বাক্যাবলীর মাধ্যমে তাঁর সৃষ্টির সকল অনিষ্টতা থেকে আশ্রয় নিচ্ছি) তখন তাকে কোন কিছু ক্ষতি করতে পারবে না, যতক্ষণ সে ওখানে অবস্থান করবে। (বর্ণনায় : মুসলিম, খাওলা বিনতে হাকীম থেকে)
পাঁচ. প্রতিদিন নিদ্রা গমনকালে আয়াতুল কুরসী পাঠ করা
হাদীসে এসেছে – আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক রমজান মাসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে যাকাতের সম্পদ রক্ষা করার দায়িত্ব দিলেন। দেখলাম, কোন এক আগন্তুক এসে খাদ্যের মধ্যে হাত দিয়ে কিছু নিতে যাচ্ছে। আমি তাকে ধরে ফেললাম। আর বললাম, আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই তোমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে নিয়ে যাবো। সে বলল, আমি খূব দরিদ্র মানুষ। আমার পরিবার আছে। আমার অভাব মারাত্নক। আবু হুরাইরা বলেন, আমি তাকে ছেড়ে দিলাম। সকাল বেলা যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে আসলাম, তখন তিনি বললেন, কী আবু হুরাইরা! গত রাতের আসামীর খবর কি? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! সে তার প্রচন্ড অভাবের কথা আমার কাছে বলেছে। আমি তার উপর দয়া করে তাকে ছেড়ে দিয়েছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, অবশ্য সে তোমাকে মিথ্যা বলেছে। দেখবে সে আবার আসবে।
আমি এ কথায় বুঝে নিলাম সে আবার আসবেই। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, সে আবার আসবে। আমি অপেক্ষায় থাকলাম। সে পরের রাতে আবার এসে খাবারের মধ্যে হাত দিয়ে খুঁজতে লাগল। আমি তাকে ধরে ফেললাম। আর বললাম, আল্লাহর কসম আমি অবশ্যই তোমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে নিয়ে যাবো। সে বলল, আমাকে ছেড়ে দাও। আমি খুব অসহায়। আমার পরিবার আছে। আমি আর আসবো না। আমি এবারও তার উপর দয়া করে তাকে ছেড়ে দিলাম। সকাল বেলা যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে আসলাম, তিনি বললেন, কী আবু হুরাইরা! গত রাতে তোমার আসামী কী করেছে? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! সে তার চরম অভাবের কথা আমার কাছে বলেছে। তার পরিবার আছে। আমি তার উপর দয়া করে তাকে ছেড়ে দিয়েছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, অবশ্য সে তোমাকে মিথ্যা বলেছে। দেখো, সে আবার আসবে।
তৃতীয় দিন আমি অপেক্ষায় থাকলাম, সে আবার এসে খাবারের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে খুঁজতে লাগল। আমি তাকে ধরে ফেললাম। আর বললাম, আল্লাহর কসম আমি অবশ্যই তোমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে নিয়ে যাবো। তুমি তিন বারের শেষ বার এসেছ। বলেছ, আসবে না। আবার এসেছ। সে বলল, আমাকে ছেড়ে দাও। আমি তোমাকে কিছু বাক্য শিক্ষা দেবো যা তোমার খুব উপকারে আসবে। আমি বললাম কী সে বাক্যগুলো? সে বলল, যখন তুমি নিদ্রা যাবে তখন আয়াতুল কুরসী পাঠ করবে। তাহলে আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাকে একজন রক্ষক পাহাড়া দেবে আর সকাল পর্যন্ত শয়তান তোমার কাছে আসতে পারবে না। আমি তাকে ছেড়ে দিলাম। সকাল বেলা যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে আসলাম, তখন তিনি বললেন, কী আবু হুরাইরা! গত রাতে তোমার আসামী কী করেছে? আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সে আমাকে কিছু উপকারী বাক্য শিক্ষা দিয়েছে, তাই আমি তাকে ছেড়ে দিয়েছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, তোমাকে সে কী শিক্ষা দিয়েছে? আমি বললাম, সে বলেছে, যখন তুমি নিদ্রা যাবে, তখন আয়াতুল কুরসী পাঠ করবে। তাহলে আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাকে একজন রক্ষক পাহাড়া দেবে আর সকাল পর্যন্ত শয়তান তোমার কাছে আসতে পারবে না।
আর সাহাবায়ে কেরাম এ সকল শিক্ষণীয় বিষয়ে খুব আগ্রহী ছিলেন- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সে তোমাকে সত্য বলেছে যদিও সে মিথ্যাবাদী। হে আবু হুরাইরা! গত তিন রাত যার সাথে কথা বলেছো তুমি কি জানো সে কে?
আবু হুরাইরা বলল, না, আমি জানি না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সে হল শয়তান। (বর্ণনায় : বুখারী)
এ হাদীস থেকে আমরা যা শিখতে পেলাম তা হল:
(১) জনগণের সম্পদ পাহাড়া দেয়া ও তা রক্ষা করার জন্য আমানতদার দায়িত্বশীল নিয়োগ দেয়া কর্তব্য। আবু হুরাইরা রা. ছিলেন একজন বিশ্বস্ত আমানতদার সাহাবী।
(২) আবু হুরাইরা রা. দায়িত্ব পালনে একাগ্রতা ও আন্তরিকতার প্রমাণ দিলেন। তিনি রাতেও না ঘুমিয়ে যাকাতের সম্পদ পাহাড়া দিয়েছেন।
(৩) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এটি একটি মুজেযা যে, তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থেকেও আবু হুরাইরার কাছে বর্ণনা শুনেই বুঝতে পেরেছেন শয়তানের আগমনের বিষয়টি।
(৪) দরিদ্র অসহায় পরিবারের বোঝা বাহকদের প্রতি সাহাবায়ে কেরামের দয়া ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ দয়াকে স্বীকৃতি দিলেন। তিনি আবু হুরাইরা রা. কে বললেন না, তাকে কেন ছেড়ে দিলে? কেন দয়া দেখালে?
(৫) সাহাবায়ে কেরামের কাছে ইলম বা বিদ্যার মূল্য কতখানি ছিল যে, অপরাধী শয়তান যখন তাকে কিছু শিখাতে চাইল তখন তা শিখে নিলেন ও তার মূল্যায়নে তাকে ছেড়েও দিলেন।
(৬) খারাপ বা অসৎ মানুষ ও জিন শয়তান যদি ভাল কোন কিছু শিক্ষা দেয় তা শিখতে কোন দোষ নেই। তবে কথা হল তার ষড়যন্ত্র ও অপকারিতা সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সে তোমাকে সত্য বলেছে, তবে সে মিথ্যুক। এ বিষয়টিকে শিক্ষার একটি মূলনীতি হিসাবে গ্রহণ করা যায়।
(৭) জিন শয়তান মানুষের খাদ্য-খাবারে হাত দেয়। তা থেকে গ্রহণ করে ও নষ্ট করে।
(৮)আয়াতুল কুরসী একটি মস্তবড় সুরক্ষা। যারা আমল করতে পারে তাদের উচিত এ আমলটি ত্যাগ না করা। রাতে নিদ্রার পূর্বে এটি পাঠ করলে পাঠকারী সকল প্রকার অনিষ্টতা থেকে মুক্ত থাকবে ও জিন শয়তান কোন কিছু তার উপর চড়াও হতে পারবে না।
(৯) আয়াতুল কুরসী হল সূরা আল বাকারার ২৫৫ নং এই আয়াত :
اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْحَيُّ الْقَيُّومُ لَا تَأْخُذُهُ سِنَةٌ وَلَا نَوْمٌ لَهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ مَنْ ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلَا يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِنْ عِلْمِهِ إِلَّا بِمَا شَاءَ وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَلَا يَئُودُهُ حِفْظُهُمَا وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ
অর্থ: আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সুপ্রতিষ্ঠিত ধারক। তাঁকে তন্দ্রা ও নিদ্রা স্পর্শ করে না। তাঁর জন্যই আসমানসমূহে যা রয়েছে তা এবং যমীনে যা আছে তা। কে সে, যে তাঁর নিকট সুপারিশ করবে তাঁর অনুমতি ছাড়া? তিনি জানেন যা আছে তাদের সামনে এবং যা আছে তাদের পেছনে। আর তারা তাঁর জ্ঞানের সামান্য পরিমাণও আয়ত্ব করতে পারে না, তবে তিনি যা চান তা ছাড়া। তাঁর কুরসী আসমানসমূহ ও যমীন পরিব্যাপ্ত করে আছে এবং এ দুটোর সংরক্ষণ তাঁর জন্য বোঝা হয় না। আর তিনি সুউচ্চ, মহান।
ছয়. খাবার সময় বিসমিল্লাহ বলা ও ঘরে প্রবেশের সময় দুআ পাঠ করা :
হাদীসে এসেছে, যখন কোন ব্যক্তি ঘরে প্রবেশ করার সময় ও খাবার গ্রহণের সময় আল্লাহর জিকির করে তখন শয়তান বলে, তোমাদের সাথে আমার খাবার নেই ও রাত্রি যাপনও নেই। আর যখন ঘরে প্রবেশের সময় আল্লাহর জিকির করে না, তখন শয়তান বলে, তোমার সাথে আমার রাত যাপন হবে। আর যখন খাবার সময় আল্লাহর জিকির করে না, তখন শয়তান বলে, তোমাদের সাথে আমার রাত যাপন ও খাবার দুটোরই ব্যবস্থা হল। (বর্ণনায় : মুসলিম হাদীস নং ২০১৮)
ঘরে প্রবেশের সময় নির্দিষ্ট দুআ আছে সেটি পাঠ করবে। দুআ মুখস্থ না থাকলে কমপক্ষে বিছমিল্লাহ . . বলে ঘরে প্রবেশ করবে। এমনিভাবে খাবার সময় বিছমিল্লাহ . . বলে খাওয়া শুরু করবে।
সাত. হাই তোলার সময় মুখে হাত দেয়া :
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যখন তোমাদের কেউ হাই তোলে তখন সে যেন তার মুখে হাত দিয়ে বাধা দেয়। কারণ হাই তোলার সময় শয়তান প্রবেশ করে। (বর্ণনায় : মুসলিম ও আবু দাউদ)
আট. পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা অবলম্বন করা :
খারাপ জিন শয়তান অপবিত্র ও নাপাক স্থানে বিচরণ করে থাকে। জিনের আছর থেকে বাঁচতে সর্বদা অপবিত্র ময়লাযুক্ত স্থান থেকে দূরে থাকতে হবে। বাচ্চাদের ময়লা আবর্জনা ও নোংড়া অবস্থা থেকে সর্বদা পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
যেমন : যায়েদ ইবনে আরকাম থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, এ সকল প্রস্রাব পায়খানার নোংড়া স্থানগুলোতে শয়তানরা উপস্থিত থাকে। যখন তোমাদের কেহ এখানে আসবে তখন যেন সে বলে, আল্লাহুম্মা ইন্নী আউজুবিকা মিনাল খুবুছি ওয়াল খাবায়িছ (হে আল্লাহ আমি আপনার কাছে জিন নর ও জিন নারী থেকে আশ্রয় নিচ্ছি) বর্ণনায় : আবু দাউদ
অতএব আমরা এ হাদীস থেকে বুঝলাম জিন, ভূত, শয়তান নোংরা স্থানে অবস্থান করে। এ সকল নোংরা স্থান থেকে সকলের দূরে থাকা উচিত। ‏শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, সাধারণত জিনেরা ময়লা আবর্জনা, মল-মুত্র ত্যাগের স্থান ডাষ্টবিন ও কবর স্থানে অবস্থান করে। (মজমুআল ফাতাওয়া)
নয়. ঘরে আল কুরআন তেলাওয়াত করা বিশেষ করে সূরা আল বাকারা পাঠ করা :
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা ঘর-কে কবরে পরিণত করো না। যে ঘরে সূরা আল বাকারা তেলাওয়াত করা হয় শয়তান সে ঘর থেকে দূরে থাকে। (বর্ণনায়: মুসলিম, হাদীস নং ৭৮০)
এ হাদীস থেকে আমরা ঘরে আল কুরআন তেলাওয়াত করার নির্দেশ জানলাম। ঘরকে কবরে পরিণত করবে না, এর মানে হল ঘরে কুরআন তেলাওয়াত করবে। আর সূরা আল বাকারা ঘরে তেলাওয়াত করলে শয়তান ঘর থেকে পালিয়ে যায়। আমরা জানি সূরা আল বাকারাতেই রয়েছে আয়াতুল কুরসী।
দশ. কোন গর্তে পেশাব-পায়খানা না করা:
হাদীসে এসেছে – রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম গর্তে পেশাব করতে নিষেধ করেছেন। কাতাদাহ রা. কে জিজ্ঞস করা হল এ নিষেধের কারণ কি? তিনি বললেন, বলা হয়ে থাকে গর্ত হল জিনদের থাকার জায়গা। (বর্ণনায় : আবু দাউদ)
এগার. ঘরে কোন সাপ দেখলে তা মারতে তাড়াহুড়ো না করা :
যদি ঘরে কোন সাপ দেখা যায় তবে সাথে সাথে তাকে না মেরে সতর্কবাণী উচ্চারণ করা। তাকে ঘর ছেড়ে যেতে বলা। তারপর যদি না যায় তাহলে মেরে ফেলা।
হাদীসে এসেছে – হিশাম ইবনে যাহরার মুক্ত দাস আবু সায়েব থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবু সায়ীদ খুদরি রা. এর সাথে দেখা করার জন্য গেলাম। তাকে নামাজ পড়া অবস্থায় পেলাম। আমি তার নামাজ শেষ হওয়ার অপেক্ষায় বসে থাকলাম। এমন সময় তার ঘরের খাটের নীচে কিছু একটা নড়াচড়া করার শব্দ পেলাম। চেয়ে দেখি একটি সাপ। আমি সেটাকে মেরে ফেলতে উঠে দাঁড়ালাম। আবু সায়ীদ রা. আমাকে বসতে ইশারা দিলেন। যখন নামাজ শেষ করলেন তখন আমাকে বাড়ীর একটি ঘরের দিকে ইশারা করে বললেন, তুমি কি এ ঘরটি দেখছো? আমি বললাম হ্যাঁ, দেখছি। তিনি বললেন, এ ঘরে বসবাস করত একজন যুবক। সে নববিবাহিত ছিল। একদিন সে খন্দকের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে যোগ দিল। যেহেতু সে নব বিবাহিত যুবক, তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে অনুমতি চেয়ে বলল, হে রাসূল! আমি নববিবাহিত। আমাকে আমার স্ত্রীর কাছে যাওয়ার অনুমতি দিন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে অনুমতি দিলেন, আর বললেন, সাথে অস্ত্র নিয়ে যেও। আমি তোমার উপর বনু কুরাইযার হামলার আশঙ্কা করছি। যুবকটি তার স্ত্রীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হল। ঘরে পৌছে দেখল, তার স্ত্রী ঘরের বাহিরে দরজার দু পাটের মাঝে দাঁড়ানো। এ অবস্থা দেখে তার আত্নসম্মান বোধে আঘাত লাগল। সে বর্শা দিয়ে তাকে আঘাত করতে উদ্যত হল। স্ত্রী বলল, তাড়াহুড়ো করো না। আগে ঘরে প্রবেশ করে দেখ তোমার ঘরের মধ্যে কি? সে ঘরে ঢুকে দেখল, তার বিছানায় একটি সাপ গোল হয়ে শুয়ে আছে। যুবকটি বর্শা দিয়ে সাপের গায়ে আঘাত করল। এরপর এটাকে ঘরের বাহিরে নিয়ে আসল। সাপটি বর্শার মাথায় ছটফট করছিলো। আর যুবকটি তখন মরে পড়ে গেল। কেহ জানে না, কে আগে মরেছে, যুবকটি না সাপটি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে এ ঘটনা বর্ণনা করা হল। তিনি বললেন, মদীনাতে কিছু জিন আছে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে। যদি তোমাদের কেহ তাদের কাউকে দেখে তাহলে তাকে তিন দিনের সময় দেবে। তিন দিনের পরও যদি তাকে দেখা যায় তাহলে তাকে হত্যা করবে। কারণ, সে শয়তান। (বর্ণনায় : মুসলিম, সাপ হত্যা অধ্যায়।)
এ হাদীস থেকে আমরা যা শিখতে পেলাম তা হল:
১- সাহাবায়ে কেরাম অন্যকে ইসলামী বিধি-বিধান ও নবী কারীম সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাত শিক্ষা দিয়েছেন অত্যন্ত যত্ন সহকারে।
২- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সাহাবায়ে কেরাম ও উম্মতের প্রতি কত দয়াশীল ছিলেন যে, যুদ্ধকালীন সময়ে কেউ স্ত্রীর কাছে যাওয়ার অনুমতি চাইলে তা তিনি সাথে সাথে দিয়ে দিতেন। কখনো দেখা গেছে তিনি তার সাহাবীদের নিজের পক্ষ থেকেই জিজ্ঞেস করতেন, কত দিন হল তুমি বিবাহ করেছ? তোমার বাড়ীতে কে আছে? তোমাকে ছুটি দিলাম তুমি বাড়ীতে স্ত্রীর কাছে যাও।
৩- ঘরে কোন সাপ দেখলে সাথে সাথে হত্যা করতে নেই। হতে পারে সে জিন। তবে যদি সাপ দেখে বা এর আচার-আচরণ, আলামত দেখে বুঝে আসে এটা জিন নয়, সাপ। তখন হত্যা করা দোষণীয় নয়। আলোচ্য হাদীসে দেখুন, সাপটি বিছানার উপর শুয়ে ছিল। যদি সে সাপ হয়, তাহলে বিছানার উপর তার কী প্রয়োজন? সে ইঁদুর বা পোকা-মাকর খুঁজবে।
৪- ঘরে এ রকম সন্দেহ জনক সাপ দেখলে তাকে উচ্চস্বরে ঘর ছেড়ে যেতে বলবে। এভাবে তিন দিন বলার পরও সে না গেলে তাকে হত্যা করে ফেলবে।
৫- বনে জঙ্গলে, পাহাড়ে-পর্বতে, রাস্তায় কোন সাপ দেখলে জিন মনে করার কোন কারণ নেই। তাকে মেরে ফেলতে হবে। শুধু ঘরের সাপকে জিন বলে সন্দেহ করা যায়। একটি সহীহ হাদীসে এটি স্পষ্ট বলা আছে।
৬- সাপটি জিন ছিল বিধায় সে নিজেকে হত্যা করার অপরাধে হত্যাকারীকে আঘাত করে হত্যা করেছে। কিন্তু সাপটি কিভাবে যুবকটিকে আঘাত করল তা কেউ দেখেনি।
৭- সাপটি মুসলিম জিন ছিল বলে রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কথায় ইশারা পাওয়া যায়। সে শুরুতেই তাকে আঘাত করেনি। বা তার স্ত্রীর কোন ক্ষতি করেনি।
৮- রাসূলুল্লা সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন রহমাতুললিল আলামীন বা সৃষ্টিকুলের জন্য করুণা। তাই তিনি জিনের প্রতিও করুণা-রহমত দেখিয়েছেন। এ হাদীসটি ছাড়াও অন্যান্য অনেক হাদীস রয়েছে এ বিষয়ে।
৯- কারণ সে শয়তান রাসলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এ কথার অর্থ হল, সে জিন নয়, সে প্রাণীদের মধ্যে দুষ্ট ও ক্ষতিকর। তাকে হত্যা করো।
১০. জিনকে অযথা হত্যা করা অন্যায়।
বার. স্ত্রীর সাথে মিলনের সময় দুআ পাঠ করা :
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কেহ যখন নিজ স্ত্রীর সাথে মিলিত হতে ইচ্ছে করে তখন যদি বলে, বিছমিল্লাহ, আল্লাহুম্মা জান্নিবনাশ শাইতান, অজান্নিবিশ শাইতান মা রাযাকতানা (আল্লাহর নামে আমরা মিলিত হচ্ছি, হে আল্লাহ আমাদের শয়তান থেকে দূরে রাখুন আর আমাদের যে সন্তান দান করবেন তাকেও শয়তান থেকে দূরে রাখুন) তাহলে এ মিলনে সন্তান জন্ম নিলে সে সন্তানকে শয়তান কখনো ক্ষতি করতে পারবে না। (বর্ণনায় : বুখারী ও মুসলিম)
তের. সন্ধ্যার সময় বাচ্চাদেরকে বাহিরে বের হতে না দেয়া:
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যখন রাত্রি ডানা মেলে অথবা তোমরা সন্ধ্যায় উপনীত হও, তখন সন্তানদের প্রতি খেয়াল রাখবে। বাহিরে যাওয়া থেকে বিরত রাখবে। কারণ, তখন শয়তানেরা ছড়িয়ে পড়ে। যখন রাতের কিছু অংশ অতিবাহিত হয়ে যায় তখন তাদের ছেড়ে দিতে পারো। আর দরজা বন্ধ করে দেবে। আল্লাহর নাম স্মরণ করবে। জেনে রাখো, শয়তান বন্ধ দরজা খুলতে পারে না। (বর্ণনায় : বুখারী)
এ হাদীস থেকে আমরা নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলো জানতে পারলাম :
১- সন্ধ্যার সময় বাচ্চাদের প্রতি বিশেষ যত্ন নেয়ার নির্দেশ।
২- সন্ধ্যার আগে বাচ্চাদের ঘরে আসার জন্য বলতে হবে। তখন তাদের ঘর থেকে বের হতে বারণ করবে।
৩- সন্ধ্যার কিছু পরে এ আশঙ্কা থাকে না। তখন বাচ্চাদের বের হতে বারণ নেই।
৪- সন্ধ্যার সময় ঘরের দরজা বন্ধ করার নির্দেশ।
৫- আর একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এ হাদীস থেকে জানা গেল যে, জিন বা শয়তান ঘরের বন্ধ দরজা খুলতে পারে না।
৬- দরজা খোলা ও বন্ধের সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
চৌদ্দ. জিনদের কাছে আশ্রয় চাওয়া বা তাদের সাহায্য না নেয়া:
মানুষ যদি জিনদের কাছে কোন কিছু চায় বা তাদের সাহায্য গ্রহণ করে তাহলে তাদের ঔদ্ধত্য বেড়ে যায়। তারা মানুষের উপর চড়াও হতে উৎসাহ পায়। যেমন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
وَأَنَّهُ كَانَ رِجَالٌ مِنَ الْإِنْسِ يَعُوذُونَ بِرِجَالٍ مِنَ الْجِنِّ فَزَادُوهُمْ رَهَقًا
আর নিশ্চয় কতিপয় মানুষ কতিপয় জিনের আশ্রয় নিত, ফলে তারা তাদের অহংকার বাড়িয়ে দিয়েছিল। (সূরা আল জিন : ৬)
অনেক ওঝা ফকীর-কে দেখা যায় তারা তাবীজ-তদবীরের ক্ষেত্রে জিনের সাহায্য নেয়। এটা অন্যায়।
চলবে…।
প্রবন্ধদের পরবর্তী পর্বে জ্বিনের আছরের চিকিৎসা, জ্বিনের অধিকার রক্ষায় আমাদের করনীয় সম্পর্কে আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ। আমাদের সাথে থাকুন।

শবে বরাত ও প্রাসংগিক কিছু কথা
Posted by QuranerAlo Editor • জুলাই 4, 2012 • Printer-friendly
Download article as PDF

প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না

লেখক : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া
শবে বরাত আভিধানিক অর্থ অনুসন্ধান
‘শব’ ফারসি শব্দ। অর্থ রাত বা রজনী। বরাত শব্দটিও মূলে ফারসি। অর্থ ভাগ্য। দু’শব্দের একত্রে অর্থ হবে, ভাগ্য-রজনী। বরাত শব্দটি আরবি ভেবে অনেকেই ভুল করে থাকেন। কারণ ‘বরাত’ বলতে আরবি ভাষায় কোন শব্দ নেই।
যদি বরাত শব্দটি আরবি বারা’আত শব্দের অপভ্রংশ ধরা হয় তবে তার অর্থ হবে— সম্পর্কচ্ছেদ বা বিমুক্তিকরণ। কিন্তু কয়েকটি কারণে এ অর্থটি এখানে অগ্রাহ্য, মেনে নেয়া যায় না-
• ১. আগের শব্দটি ফারসি হওয়ায় ‘বরাত’ শব্দটিও ফারসি হবে, এটাই স্বাভাবিক
• ২. শা’বানের মধ্যরজনীকে আরবি ভাষার দীর্ঘ পরম্পরায় কেউই বারা’আতের রাত্রি হিসাবে আখ্যা দেননি।
• ৩. রমযান মাসের লাইলাতুল ক্বাদরকে কেউ-কেউ লাইলাতুল বারা’আত হিসাবে নামকরণ করেছেন, শা‘বানের মধ্য রাত্রিকে নয়।
আরবি ভাষায় এ রাতটিকে কি বলা হয়?
আরবি ভাষায় এ রাতটিকে ‘লাইলাতুন নিছফি মিন শা‘বান’ — শাবান মাসের মধ্য রজনী — হিসাবে অভিহিত করা হয়।
শাবানের মধ্যরাত্রির কি কোন ফযীলত বর্ণিত হয়েছে?
শাবান মাসের মধ্য রাত্রির ফযীলত সম্পর্কে কিছু হাদীস বর্ণিত হয়েছে:
১. আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন: এক রাতে আমি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে খুঁজে না পেয়ে তাঁকে খুঁজতে বের হলাম, আমি তাকে বাকী গোরস্তানে পেলাম। তখন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে বললেন: ‘তুমি কি মনে কর, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তোমার উপর জুলুম করবেন?’ আমি বললাম: ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমি ধারণা করেছিলাম যে আপনি আপনার অপর কোন স্ত্রীর নিকট চলে গিয়েছেন। তখন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: ‘মহান আল্লাহ তা’লা শা‘বানের মধ্যরাত্রিতে নিকটবর্তী আসমানে অবতীর্ণ হন এবং কালব গোত্রের ছাগলের পালের পশমের চেয়ে বেশী লোকদের ক্ষমা করেন।
হাদীসটি ইমাম আহমাদ তার মুসনাদে বর্ণনা করেন (৬/২৩৮), তিরমিযি তার সুনানে (২/১২১,১২২) বর্ণনা করে বলেন, এ হাদীসটিকে ইমাম বুখারী দুর্বল বলতে শুনেছি। অনুরূপভাবে হাদীসটি ইমাম ইবনে মাজাহ তার সুনানে (১/৪৪৪, হাদীস নং ১৩৮৯) বর্ণনা করেছেন। হাদীসটির সনদ দুর্বল বলে সমস্ত মুহাদ্দিসগণ একমত।
২. আবু মূসা আল আশ’আরী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ ‘আল্লাহ তা‘আলা শাবানের মধ্যরাত্রিতে আগমণ করে, মুশরিক ও ঝগড়ায় লিপ্ত ব্যক্তিদের ব্যতীত, তাঁর সমস্ত সৃষ্টিজগতকে ক্ষমা করে দেন। হাদীসটি ইমাম ইবনে মাজাহ তার সুনানে (১/৪৫৫, হাদীস নং ১৩৯০),এবং তাবরানী তার মু’জামুল কাবীর (২০/১০৭,১০৮) গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।
আল্লামা বূছীরি বলেন: ইবনে মাজাহ বর্ণিত হাদীসটির সনদ দুর্বল। তাবরানী বর্ণিত হাদীস সম্পর্কে আল্লামা হাইসামী (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) মাজমা‘ আয যাওয়ায়েদ (৮/৬৫) গ্রন্থে বলেনঃ ত্বাবরানী বর্ণিত হাদীসটির সনদের সমস্ত বর্ণনাকারী শক্তিশালী। হাদীসটি ইবনে হিব্বানও তার সহীহতে বর্ণনা করেছেন। এ ব্যাপারে দেখুন, মাওয়ারেদুজ জাম‘আন, হাদীস নং (১৯৮০), পৃঃ (৪৮৬)।
৩. আলী ইবনে আবী তালিব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ “যখন শা‘বানের মধ্যরাত্রি আসবে তখন তোমরা সে রাতের কিয়াম তথা রাতভর নামায পড়বে, আর সে দিনের রোযা রাখবে; কেননা সে দিন সুর্যাস্তের সাথে সাথে আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং বলেন: ক্ষমা চাওয়ার কেউ কি আছে যাকে আমি ক্ষমা করব। রিযিক চাওয়ার কেউ কি আছে যাকে আমি রিযিক দেব। সমস্যাগ্রস্ত কেউ কি আছে যে আমার কাছে পরিত্রাণ কামনা করবে আর আমি তাকে উদ্ধার করব। এমন এমন কেউ কি আছে? এমন এমন কেউ কি আছে? ফজর পর্যন্ত তিনি এভাবে বলতে থাকেন”।
হাদীসটি ইমাম ইবনে মাজাহ তার সুনানে (১/৪৪৪, হাদীস নং ১৩৮৮) বর্ণনা করেছেন। আল্লামা বূছীরি (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) তার যাওয়ায়েদে ইবনে মাজাহ (২/১০) গ্রন্থে বলেন, হাদীসটির বর্ণনাকারীদের মধ্যে ইবনে আবি সুবরাহ রয়েছেন যিনি হাদীস বানাতেন। তাই হাদীসটি বানোয়াট।
উল্লিখিত আলোচনায় এটা স্পষ্ট যে, শা‘বানের মধ্যরাত্রির ফযীলত বিষয়ে যে সব হাদীস বর্ণিত হয়েছে তার সবগুলোই দুর্বল অথবা বানোয়াট, আর তাই গ্রাহ্যতারহিত।
প্রাজ্ঞ আলেমগণ এ ব্যাপারে একমত যে, দুর্বল হাদীস দ্বারা কোন আহকাম- বিধান প্রমাণ করা যায় না। দুর্বল হাদীসের উপর আমল করার জন্য কয়েকটি শর্ত লাগিয়েছেন তারা। শর্তগুলো নিম্নরূপ –
• ১. হাদীসটির মূল বক্তব্য অন্য কোন সহীহ হাদীসের বিরোধীতা করবেনা, বরং কোন শুদ্ধ ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।
• ২. হাদীসটি একেবারেই দুর্বল অথবা বানোয়াট হলে চলবে না।
• ৩. হাদীসটির উপর আমল করার সময় এটা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে প্রমাণিত বলে বিশ্বাস করা যাবে না। কারণ রাসূল থেকে প্রমাণিত বলে বিশ্বাস করলে রাসূলের উপর মিথ্যাচারিতার পাপ হবে, ফলে জাহান্নাম অবধারিত হয়ে পড়বে।
• ৪. হাদীসটি ফাদায়িল তথা কোন আমলের ফযীলত বর্ণনা সংক্রান্ত হতে হবে। আহকাম (ওয়াজিব, মুস্তাহাব, হারাম, মাকরূহ) ইত্যাদি সাব্যস্তকারী না হতে হবে।
• ৫. বান্দা ও তার প্রভুর মাঝে একান্ত ব্যক্তিগত কোন আমলের ক্ষেত্রে হাদীসটির নির্ভরতা নেয়া যাবে। তবে এ হাদীসের উপর আমল করার জন্য একে অপরকে আহবান করতে পারবে না।
এই শর্তাবলীর আলোকে যদি উপরোক্ত হাদীসগুলো পরীক্ষা করে দেখি তাহলে দেখতে পাই যে, উপরোক্ত হাদীসসমূহের মধ্যে শেষোক্ত _ আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহু)বর্ণিত — হাদীসটি বানোয়াট। সুতরাং তার উপর আমল করা উম্মাতের আলেমদের ঐক্যমতে জায়েয হবে না।
প্রথম হাদীসটি দুর্বল, দ্বিতীয় হাদীসটিও অধিকাংশ আলেমের মতে দুর্বল, যদিও কোন-কোন আলেম এর বর্ণনাকারীগণকে শক্তিশালী বলে মত প্রকাশ করেছেন। কিন্তু কেবলমাত্র বর্ণনাকারী শক্তিশালী হলেই হাদীস বিশুদ্ধ হওয়া সাব্যস্ত হয়না।
মোট কথাঃ প্রথম ও দ্বিতীয়, এ হাদীস দুটি দুর্বল। খুব দুর্বল বা বানোয়াট নয়। সে হিসেবে যৎকিঞ্চিৎ প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে যে এ রাত্রির ফযীলত রয়েছে।
এই সূত্রেই অনেক হাদীসবিদ শাবানের মধ্যরাতের ফযীলত রয়েছে বলে মত প্রকাশ করেছেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেনঃ
• ইমাম আহমাদ (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি)। [ইবনে তাইমিয়া তার ইকতিদায়ে ছিরাতে মুস্তাকীমে (২/৬২৬) তা উল্লেখ করেছেন]
• ইমাম আওযায়ী (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি)। [ইমাম ইবনে রাজাব তার ‘লাতায়েফুল মা‘আরিফ’ গ্রন্থে (পৃঃ১৪৪) তার থেকে তা বর্ণনা করেছেন]
• শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি)। [ইকতিদায়ে ছিরাতে মুস্তাকীম ২/৬২৬,৬২৭, মাজমু‘ ফাতাওয়া ২৩/১২৩, ১৩১,১৩৩,১৩৪]।
• ইমাম ইবনে রাজাব আল হাম্বলী (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি)। [তার লাতায়েফুল মা‘আরিফ পৃঃ১৪৪ দ্রষ্টব্য]।
• প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস আল্লামা নাসিরুদ্দিন আল-আলবানী (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) [ছিলছিলাতুল আহাদীস আস্‌সাহীহা ৩/১৩৫-১৩৯]
উপরোক্ত মুহাদ্দিসগনসহ আরো অনেকে এ রাত্রিকে ফযীলতের রাত বলে মত প্রকাশ করেছেন।
কিন্তু আমরা যদি উপরে উল্লিখিত প্রথম ও দ্বিতীয় হাদীসটি পাঠ করে দেখি তাহলে দেখতে পাব —আল্লাহ তা‘আলা নিকটবর্তী আসমানে অবতীর্ণ হয়ে তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার আহবান জানাতে থাকেন — হাদীসদ্বয়ে এ বক্তব্যই উপস্থাপিত হয়েছে। মুলত সহীহ হাদীসে সুস্পষ্ট এসেছে যে, “আল্লাহ তা‘আলা প্রতি রাতের শেষাংশে – শেষ তৃতীয়াংশে- নিকটবর্তী আসমানে অবতীর্ণ হয়ে আহবান জানাতে থাকেন ‘এমন কেউ কি আছে যে আমাকে ডাকবে আর আমি তার ডাকে সাড়া দেব? এমন কেউ কি আছে যে আমার কাছে কিছু চাইবে আর আমি তাকে দেব? আমার কাছে ক্ষমা চাইবে আর আমি তাকে ক্ষমা করে দেব?” [বুখারী, হাদীস নং ১১৪৫, মুসলিম হাদীস নং ৭৫৮]
সুতরাং আমরা এ হাদীসদ্বয়ে অতিরিক্ত কোন কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। সুতরাং এ রাত্রির বিশেষ কোন বিশেষত্ব আমাদের নজরে পড়ছে না। এজন্যই শাইখ আব্দুল আজীজ ইবনে বায (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) সহ আরো অনেকে এ রাত্রির অতিরিক্ত ফযীলত অস্বীকার করেছেন।
এ রাত্রি উদযাপন ও এতদসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর
প্রথম প্রশ্নঃ এ রাত্রি কি ভাগ্য রজনী?
উত্তরঃ না, এ রাত্রি ভাগ্য রজনী নয়, মূলতঃ এ রাত্রিকে ভাগ্য রজনী বলার পেছনে কাজ করছে সূরা আদ-দুখানের ৩ ও ৪ আয়াত দু’টির ভূল ব্যাখ্যা। তা হলোঃ
إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُبَارَكَةٍ إِنَّا كُنَّا مُنْذِرِينَ* فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ – سورة الدخان:3ـ4
আয়াতদ্বয়ের অর্থ হলোঃ “অবশ্যই আমরা তা (কোরআন) এক মুবারক রাত্রিতে অবতীর্ণ করেছি, অবশ্যই আমরা সতর্ককারী, এ রাত্রিতে যাবতীয় প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়”।
এ আয়াতদ্বয়ের তাফসীরে অধিকাংশ মুফাসসির বলেনঃ এ আয়াত দ্বারা রমযানের লাইলাতুল ক্বাদরকেই বুঝানো হয়েছে। যে লাইলাতুল কাদরের চারটি নাম রয়েছে: ১. লাইলাতুল কাদর, ২. লাইলাতুল বারা’আত, ৩. লাইলাতুচ্ছফ, ৪.লাইলাতুল মুবারাকাহ। শুধুমাত্র ইকরিমা (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, এ আয়াত দ্বারা শা’বানের মধ্যরাত্রিকে বুঝানো হয়েছে। এটা একটি অগ্রহণযোগ্য বর্ণনা।
আল্লামা ইবনে কাসীর (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) বলেন, আলোচ্য আয়াতে ‘মুবারক রাত্রি’ বলতে ‘লাইলাতুল ক্বাদর বুঝানো হয়েছে, যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেনঃ
إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ – سورةالقدر:1
আমরা এ কোরআনকে ক্বাদরের রাত্রিতে অবতীর্ণ করেছি। (সূরা আল-কাদরঃ১)।
আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেনঃ
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ- سورة البقرة:185
রমযান এমন একটি মাস যাতে কোরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে। (সূরা আলবাকারাহঃ১৮৫)।
যিনি এ রাত্রিকে শা‘বানের মধ্যবর্তী রাত বলে মত প্রকাশ করেছেন, যেমনটি ইকরিমা থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি অনেক দূরবর্তী মত গ্রহণ করেছেন; কেননা কোরআনের সুস্পষ্ট বাণী তা রমযান মাসে বলে ঘোষণা দিয়েছে’। (তাফসীরে ইবনে কাসীর (৪/১৩৭)।
অনুরূপভাবে আল্লামা শাওকানীও এ মত প্রকাশ করেছেন। (তাফসীরে ফাতহুল ক্বাদীর (৪/৭০৯)।
সুতরাং ভাগ্য রজনী হলো লাইলাতুল ক্বাদর যা রমযানের শেষ দশদিনের বেজোড় রাত্রিগুলো।
আর এতে করে এও সাব্যস্ত হলো যে, এ আয়াতের তাফসীরে ইকরিমা (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) মতভেদ করলেও তিনি শা’বানের মধ্য তারিখের রাত্রিকে লাইলাতুল বারা’আত নামকরণ করেননি।
দ্বিতীয় প্রশ্নঃ শা’বানের মধ্যরাত্রি উদযাপন করা যাবে কিনা?
উত্তরঃ শা’বানের মধ্যরাত্রি পালন করার কি হুকুম এ নিয়ে আলেমদের মধ্যে তিনটি মত রয়েছে:
• এক. শা‘বানের মধ্য রাত্রিতে মাসজিদে জামাতের সাথে নামায ও অন্যান্য ইবাদত করা জায়েয । প্রসিদ্ধ তাবেয়ী খালেদ ইবনে মি‘দান, লুকমান ইবনে আমের সুন্দর পোশাক পরে, আতর খোশবু, শুরমা মেখে মাসজিদে গিয়ে মানুষদের নিয়ে এ রাত্রিতে নামায আদায় করতেন। এ মতটি ইমাম ইসহাক ইবনে রাহওয়ীয়াহ থেকেও বর্ণিত হয়েছে। (লাতায়েফুল মা‘আরেফ পৃঃ১৪৪)। তারা তাদের মতের পক্ষে কোন দলীল পেশ করেননি। আল্লামা ইবনে রাজাব (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) তাদের মতের পক্ষে দলীল হিসাবে বলেনঃ তাদের কাছে এ ব্যাপারে ইসরাইলি তথা পূর্ববর্তী উম্মাতদের থেকে বিভিন্ন বর্ণনা এসেছিল, সে অনুসারে তারা আমল করেছিলেন। তবে পূর্বে বর্ণিত বিভিন্ন দুর্বল হাদীস তাদের দলীল হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকবে।
• দুই. শা‘বানের মধ্যরাত্রিতে ব্যক্তিগতভাবে ইবাদত বন্দেগী করা জায়েয। ইমাম আওযা‘য়ী, শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া, এবং আল্লামা ইবনে রজব (রাহমাতুল্লাহি আলাইহিম) এ মত পোষণ করেন। তাদের মতের পক্ষে তারা যে সমস্ত হাদীস দ্বারা এ রাত্রির ফযীলত বর্ণিত হয়েছে সে সমস্ত সাধারণ হাদীসের উপর ভিত্তি করে ব্যক্তিগতভাবে ইবাদত করাকে জায়েয মনে করেন।
• তিন: এ ধরণের ইবাদত সম্পূর্ণরূপে বিদ’আত — চাই তা ব্যক্তিগতভাবে হোক বা সামষ্টিকভাবে। ইমাম ‘আতা ইবনে আবি রাবাহ, ইবনে আবি মুলাইকা, মদীনার ফুকাহাগণ, ইমাম মালেকের ছাত্রগণ, ও অন্যান্য আরো অনেকেই এ মত পোষণ করেছেন। এমনকি ইমাম আওযায়ী যিনি শাম তথা সিরিয়াবাসীদের ইমাম বলে প্রসিদ্ধ তিনিও এ ধরনের ঘটা করে মাসজিদে ইবাদত পালন করাকে বিদ‘আত বলে ঘোষণা করেছেন।
তাদের মতের পক্ষে যুক্তি হলো :
• ১.এ রাত্রির ফযীলত সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোন দলীল নেই। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ রাত্রিতে কোন সুনির্দিষ্ট ইবাদত করেছেন বলে সহীহ হাদীসে প্রমাণিত হয়নি। অনুরূপভাবে তার কোন সাহাবী থেকেও কিছু বর্ণিত হয়নি। তাবেয়ীনদের মধ্যে তিনজন ব্যতীত আর কারো থেকে বর্ণিত হয়নি। আল্লামা ইবনে রজব (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) বলেনঃ শা‘বানের রাত্রিতে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অথবা তার সাহাবাদের থেকে কোন নামায পড়া প্রমাণিত হয়নি। যদিও শামদেশীয় সুনির্দিষ্ট কোন কোন তাবেয়ীন থেকে তা বর্ণিত হয়েছে। (লাতায়েফুল মা‘আরিফঃ১৪৫)। শাইখ আব্দুল আযীয ইবনে বায (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) বলেনঃ ‘এ রাত্রির ফযীলত বর্ণনায় কিছু দুর্বল হাদীস এসেছে যার উপর ভিত্তি করা জায়েয নেই, আর এ রাত্রিতে নামায আদায়ে বর্ণিত যাবতীয় হাদীসই বানোয়াট, আলেমগণ এ ব্যাপারে সতর্ক করে গেছেন’।
• ২. হাফেজ ইবনে রজব (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) যিনি কোন কোন তাবেয়ীনদের থেকে এ রাত্রির ফযীলত রয়েছে বলে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেনঃ ঐ সমস্ত তাবেয়ীনদের কাছে দলীল হলো যে তাদের কাছে এ ব্যাপারে ইসরাইলি কিছু বর্ণনা এসেছে। তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, যারা এ রাত পালন করেছেন তাদের দলীল হলো, যে তাদের কাছে ইসরাইলি বর্ণনা এসেছে, আমাদের প্রশ্নঃ ইসরাইলি বর্ণনা এ উম্মাতের জন্য কিভাবে দলীল হতে পারে?
• ৩. যে সমস্ত তাবেয়ীনগণ থেকে এ রাত উদযাপনের সংবাদ এসেছে তাদের সমসাময়িক প্রখ্যাত ফুকাহা ও মুহাদ্দিসীনগণ তাদের এ সব কর্মকান্ডের নিন্দা করেছেন। যারা তাদের নিন্দা করেছেন তাদের মধ্যে প্রখ্যাত হলেনঃ ইমাম আতা ইবনে আবি রাবাহ, যিনি তার যুগের সর্বশ্রেষ্ট মুফতি ছিলেন, আর যার সম্পর্কে সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেছিলেনঃ তোমরা আমার কাছে প্রশ্নের জন্য একত্রিত হও, অথচ তোমাদের কাছে ইবনে আবি রাবাহ রয়েছে। সুতরাং যদি ঐ রাত্রি উদযাপনকারীদের পক্ষে কোন দলীল থাকত, তাহলে তারা ‘আতা ইবনে আবি রাবাহর বিপক্ষে তা অবশ্যই পেশ করে তাদের কর্মকাণ্ডের যথার্থতা প্রমাণ করার চেষ্টা করতেন, অথচ এরকম করেছেন বলে প্রমাণিত হয়নি।
• ৪. পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে যে, যে সমস্ত দুর্বল হাদীসে ঐ রাত্রির ফযীলত বর্ণিত হয়েছে, তাতে শুধুমাত্র সে রাত্রিতে আল্লাহর অবতীর্ণ হওয়া এবং ক্ষমা করা প্রমাণিত হয়েছে, এর বাইরে কিছুই বর্ণিত হয়নি। মুলতঃ এ অবতীর্ণ হওয়া ও ক্ষমা চাওয়ার আহবান প্রতি রাতেই আল্লাহ তা’আলা করে থাকেন। যা সুনির্দিষ্ট কোন রাত বা রাতসমূহের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়। এর বাইরে দুর্বল হাদীসেও অতিরিক্ত কোন ইবাদত করার নির্দেশ নেই।
• ৫. আর যারা এ রাত্রিতে ব্যক্তিগতভাবে আমল করা জায়েয বলে মন্তব্য করেছেন তাদের মতের পক্ষে কোন দলীল নেই, কেননা এ রাত্রিতে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বা তার সাহাবা কারো থেকেই ব্যক্তিগত কিংবা সামষ্টিক কোন ভাবেই কোন প্রকার ইবাদত করেছেন বলে বর্ণিত হয়নি। এর বিপরীতে শরীয়তের সাধারণ অনেক দলীল এ রাত্রিকে ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট করাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করছে, তম্মধ্যে রয়েছেঃআল্লাহ বলেনঃ“আজকের দিনে আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম”। (সূরা আল-মায়েদাহঃ ৩)।রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ (যে ব্যক্তি আমাদের দ্বীনের মধ্যে এমন নতুন কিছুর উদ্ভব ঘটাবে যা এর মধ্যে নেই, তা তার উপর নিক্ষিপ্ত হবে)। (বুখারী, হাদীস নং ২৬৯৭)।তিনি আরো বলেছেনঃ (যে ব্যক্তি এমন কোন কাজ করবে যার উপর আমাদের দ্বীনের মধ্যে কোন নির্দেশ নেই তা অগ্রহণযোগ্য)। (মুসলিম, হাদীস নং ১৭১৮)।শাইখ আব্দুল আজীজ ইবনে বায (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) বলেনঃ আর ইমাম আওযা‘য়ী (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) যে, এ রাতে ব্যক্তিগত ইবাদত করা ভাল মনে করেছেন, আর যা হাফেয ইবনে রাজাব পছন্দ করেছেন, তাদের এ মত অত্যন্ত আশ্চার্যজনক বরং দুর্বল; কেননা কোন কিছু যতক্ষন পর্যন্ত না শরীয়তের দলীলের মাধ্যমে জায়েয বলে সাব্যস্ত হবে ততক্ষন পর্যন্ত কোন মুসলিমের পক্ষেই দ্বীনের মধ্যে তার অনুপ্রবেশ ঘটাতে বৈধ হবে না। চাই তা ব্যক্তিগতভাবে করুক বা সামষ্টিক- দলবদ্ধভাবে। চাই গোপনে করুক বা প্রকাশ্য। কারণ বিদ‘আতকর্ম অস্বীকার করে এবং তা থেকে সাবধান করে যে সমস্ত প্রমাণাদি এসেছে সেগুলো সাধারণভাবে তার বিপক্ষে অবস্থান নিচ্ছে। (আত্‌তাহযীর মিনাল বিদ‘আঃ১৩)।
• ৬. শাইখ আব্দুল আযীয ইবনে বায (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) আরো বলেনঃ সহীহ মুসলিমে আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ “তোমরা জুম‘আর রাত্রিকে অন্যান্য রাত থেকে ক্বিয়াম/ নামাযের জন্য সুনির্দিষ্ট করে নিও না, আর জুম‘আর দিনকেও অন্যান্য দিনের থেকে আলাদা করে রোযার জন্য সুনির্দিষ্ট করে নিও না, তবে যদি কারো রোযার দিনে সে দিন ঘটনাচক্রে এসে যায় সেটা ভিন্ন কথা”। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১১৪৪, ১৪৮)।যদি কোন রাতকে ইবাদতের জন্য সুনির্দিষ্ট করা জায়েয হতো তবে অবশ্যই জুম‘আর রাতকে ইবাদতের জন্য বিশেষভাবে সুনির্দিষ্ট করা জায়েয হতো; কেননা জুম‘আর দিনের ফযীলত সম্পর্কে হাদীসে এসেছে যে, “সুর্য যে দিনগুলোতে উদিত হয় তম্মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ট দিন, জুম‘আর দিন”। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৫৮৪)।সুতরাং যেহেতু রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জুম‘আর দিনকে বিশেষভাবে ক্বিয়াম/নামাযের জন্য সুনির্দিষ্ট করা থেকে নিষেধ করেছেন সেহেতু অন্যান্য রাতগুলোতে অবশ্যই ইবাদতের জন্য সুনির্দিষ্ট করে নেয়া জায়েয হবে না। তবে যদি কোন রাত্রের ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোন দলীল এসে যায় তবে সেটা ভিন্ন কথা। আর যেহেতু লাইলাতুল ক্বাদর এবং রমযানের রাতের ক্বিয়াম/নামায পড়া জায়েয সেহেতু রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে এ রাতগুলোর ব্যাপারে স্পষ্ট হাদীস এসেছে।
তৃতীয় প্রশ্নঃ শা‘বানের মধ্যরাত্রিতে হাজারী নামায পড়ার কী হুকুম?
উত্তরঃ শা‘বানের মধ্যরাত্রিতে একশত রাকাত নামাযের প্রতি রাকাতে দশবার সূরা কুল হুওয়াল্লাহ (সূরা ইখলাস) দিয়ে নামাজ পড়ার যে নিয়ম প্রচলিত হয়েছে তা সম্পূর্ণরূপে বিদ‘আত।
এ নামাযের প্রথম প্রচলন
এ নামাযের প্রথম প্রচলন হয় হিজরী ৪৪৮ সনে। ফিলিস্তিনের নাবলুস শহরের ইবনে আবিল হামরা নামীয় একলোক বায়তুল মুকাদ্দাস আসেন। তার তিলাওয়াত ছিল সুমধুর। তিনি শা‘বানের মধ্যরাত্রিতে নামাযে দাঁড়ালে তার পিছনে এক লোক এসে দাঁড়ায়, তারপর তার সাথে তৃতীয় জন এসে যোগ দেয়, তারপর চতুর্থ জন। তিনি নামায শেষ করার আগেই বিরাট একদল লোক এসে তার সাথে যুক্ত হয়ে পড়ে।
পরবর্তী বছর এলে, তার সাথে অনেকেই যোগ দেয় ও নামায আদায় করে। এতে করে মাসজিদুল আক্‌সাতে এ নামাযের প্রথা চালু হয়। কালক্রমে এ নামায এমনভাবে আদায় হতে লাগে যে অনেকেই তা সুন্নাত মনে করতে শুরু করে। (ত্বারতুসীঃ হাওয়াদেস ও বিদ‘আ পৃঃ১২১, ১২২, ইবনে কাসীরঃ বিদায়া ওয়ান নিহায়া ১৪/২৪৭, ইবনুল কাইয়েমঃ আল-মানারুল মুনিফ পৃঃ৯৯)।
এ নামাযের পদ্ধতি
প্রথা অনুযায়ী এ নামাযের পদ্ধতি হলো, প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহার পর সূরা ইখলাস দশবার করে পড়ে মোট একশত রাকাত নামায পড়া। যাতে করে সূরা ইখলাস ১০০০ বার পড়া হয়। (এহইয়ায়ে উলুমুদ্দীন (১/২০৩)।
এ ধরণের নামায সম্পূর্ণ বিদ‘আত। কারণ এ ধরণের নামাযের বর্ণনা কোন হাদীসের কিতাবে আসেনি। কোন কোন বইয়ে এ সম্পর্কে যে সকল হাদীস উল্লেখ করা হয় সেগুলো কোন হাদীসের কিতাবে আসেনি। আর তাই আল্লামা ইবনুল জাওযী (মাওদু‘আত ১/১২৭-১৩০), হাফেয ইরাকী (তাখরীজুল এহইয়া), ইমাম নববী (আল-মাজমু‘ ৪/৫৬), আল্লামা আবু শামাহ (আল-বা‘েয়স পৃঃ৩২-৩৬), শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা, (ইকতিদায়ে ছিরাতুল মুস্তাকীম ২/৬২৮), আল্লামা ইবনে ‘আররাক (তানযীহুশ শরীয়াহ ২/৯২), ইবনে হাজার আল-আসকালানী, আল্লামা সূয়ূতী (আল-আমর বিল ইত্তেবা পৃঃ৮১, আল-লাআলিল মাসনূ‘আ ২/৫৭), আল্লামা শাওকানী (ফাওয়ায়েদুল মাজমু‘আ পৃঃ৫১) সহ আরো অনেকেই এ গুলোকে “বানোয়াট হাদীস” বলে সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন।
এ ধরণের নামাযের হুকুম
সঠিক জ্ঞানের অধিকারী আলেমগণের মতে এ ধরণের নামায বিদ‘আত; কেননা এ ধরনের নামায আল্লাহর রাসূলও পড়েননি। তার কোন খলীফাও পড়েননি। সাহাবাগণও পড়েননি। হেদায়াতের ইমাম তথা আবু হানিফা, মালেক, শাফেয়ী, আহমাদ, সাওরী, আওযায়ী, লাইস’সহ অন্যান্যগণ কেউই এ ধরণের নামায পড়েননি বা পড়তে বলেননি।
আর এ ধরণের নামাযের বর্ণনায় যে হাদীসসমূহ কেউ কেউ উল্লেখ করে থাকেন তা উম্মাতের আলেমদের ইজমা অনুযায়ী বানোয়াট। (এর জন্য দেখুনঃ ইবনে তাইমিয়ার মাজমুল‘ ফাতাওয়া ২৩/১৩১,১৩৩,১৩৪, ইকতিদায়ে ছিরাতে মুস্তাকীম ২/৬২৮, আবু শামাহঃ আল-বা‘য়েছ পৃঃ ৩২-৩৬, রশীদ রিদাঃ ফাতাওয়া ১/২৮, আলী মাহফুজ, ইবদা‘ পৃঃ২৮৬,২৮৮, ইবনে বাযঃ আত্‌তাহযীর মিনাল বিদ‘আ পৃঃ১১-১৬)।
চতুর্থ প্রশ্নঃ শা‘বানের মধ্যরাত্রির পরদিন কি রোযা রাখা যাবে?
উত্তরঃ রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বহু সহীহ হাদীসে প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি শা‘বান মাসে সবচেয়ে বেশী রোযা রাখতেন। (এর জন্য দেখুনঃ বুখারী, হাদীস নং ১৯৬৯, ১৯৭০, মুসলিম, হাদীস নং ১১৫৬, ১১৬১, মুসনাদে আহমাদ ৬/১৮৮, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ২৪৩১, সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস নং ২০৭৭, সুনানে তিরমিঝি, হাদীস নং ৬৫৭)।
সে হিসাবে যদি কেউ শা‘বান মাসে রোযা রাখেন তবে তা হবে সুন্নাত। শাবান মাসের শেষ দিন ছাড়া বাকী যে কোন দিন রোযা রাখা জায়েয বা সওয়াবের কাজ। তবে রোজা রাখার সময় মনে করতে হবে যে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যেহেতু শা‘বান মাসে রোজা রেখেছিলেন তাকে অনুসরন করে রোযা রাখা হচ্ছে।
অথবা যদি কারও আইয়ামে বিদের নফল রোযা তথা মাসের ১৩,১৪,১৫ এ তিনদিন রোযা রাখার নিয়ম থাকে তিনিও রোযা রাখতে পারেন। কিন্তু শুধুমাত্র শা‘বানের পনের তারিখ রোযা রাখা বিদ‘আত হবে। কারণ শরীয়তে এ রোযার কোন ভিত্তি নেই।
আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর রাসূলের পরিপূর্ণ পদাঙ্ক অনুসরন করে চলার তৌফিক দিন। আমীন।
টীকা: 7. যদি শা‘বানের মধ্যরাত্রিকে উদযাপন করা বা ঘটা করে পালন করা জায়েয হতো তাহলে অবশ্যই রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ ব্যাপারে আমাদের জানাতেন। বা তিনি নিজেই তা করতেন। আর এমন কিছু তিনি করে থাকতেন তাহলে সাহাবাগণ অবশ্যই তা উম্মাতের কাছে বর্ণনা করতেন। তারা নবীদের পরে জগতের শ্রেষ্টতম মানুষ, সবচেয়ে বেশী নসীহতকারী, কোন কিছুই তারা গোপন করেননি’। (আত্‌তহযীর মিনাল বিদা‘১৫,১৬)।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমাদের কাছে স্পষ্ট হলো যে, কুরআন, হাদীস ও গ্রহণযোগ্য আলেমদের বাণী থেকে আমরা জানতে পারলাম শা‘বানের মধ্য রাত্রিকে ঘটা করে উদযাপন করা— চাই তা নামাযের মাধ্যমে হোক অথবা অন্য কোন ইবাদতের মাধ্যেমে— অধিকাংশ আলেমদের মতে জগন্যতম বিদ‘আত। শরীয়তে যার কোন ভিত্তি নেই। বরং তা’ সাহাবাদের যুগের পরে প্রথম শুরু হয়েছিল। যারা সত্যের অনুসরণ করতে চায় তাদের জন্য দ্বীনের মধ্যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা করতে বলেছেন তাই যথেষ্ট।

এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে এই লেকচার শুনতে পারেনঃ

পর্ব ১ – http://youtu.be/jU9NLXcnJH0
পর্ব ২ – http://youtu.be/AVrZez4snuQ
mp3 – Part 1 – http://i.iloveAllaah.com/flpdx

‘আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক’। প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। “কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা” [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

ইসলাম সম্পর্কে অমুসলিমদের ২০টি বিভ্রান্তিকর প্রশ্নের জবাব – পর্ব ১
Posted by shabab • জুন 29, 2012 • Printer-friendly
Download article as PDF

প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না
লেখকঃ ডঃ জাকির নায়েক

পর্ব ১ | পর্ব ২
.
ভূমিকা
মানুষকে আল্লাহর পথে আহবান একটি অর্পিত দায়িত্ব।
মুসলিম জাতির সচেতন অংশ খুব ভালো করেই জানেন যে, ইসলাম একটি বিশ্বজনীন জীবন ব্যবস্থা, যা গোটা মানব জাতির জন্য দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তা’য়ালা সমগ্র সৃষ্টিজগতের সৃষ্টিকর্তা বিধাতা প্রতিপালক এবং তাঁর প্রতি সম্পূর্ণ সমর্পিত মানুষ, অর্থাৎ‘মুসলিম’-তাদেরকে বাছাই করে নির্বাচন করা হয়েছে, মানব জাতির প্রতিটি সদস্যের কাছে তাঁর বাণী যথাযথভাবে পৌঁছে দেবার দায়িত্বশীল করে।
কিন্তু হায়! অধিকাংশ মুসলিম তার সে দায়িত্বের ব্যাপারে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত। যেখানে আমাদের নিজেদের স্বার্থে জীবন যাপনের শ্রেষ্ঠতম পদ্ধতি হিসেবে পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করাই ছিল একমাত্র কাজ। সেখানে আমাদের বাস্তবতা আজ এই যে, এতটুকু ইচ্ছাও কারো মধ্যে অনুভুত হয়না যে, যাদের কাছে এখন পর্যন্ত এ বাণী পৌঁছেনি তাদেরকে এই পরম সত্যের অংশীদার করে নেই।
আরবী শব্দ ‘দা’ওয়াহর’ অর্থ আহবান বা আমন্ত্রণ। ইসলামী পরিভাষায় এর তাৎপর্য-ইসলামের প্রচার ও প্রসারের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালানো। জ্যোতীর্ময় কুরআন বলছেঃ
তার চেয়ে বড় জালিম আর কে হতে পারে, যে প্রকাশ করেনা (এমন) ‘উদ্ভাসিত সত্যকে’, আল্লাহর তরফ থেকে যা তাদের কাছে দেয়া আছে? এই যা কিছু তারা করছে এ ব্যাপারে আল্লাহ আদৌ উদাসীন নন। (২‍:১৪০)
অত্যন্ত পরিচিত বিশটি সাধারণ প্রশ্ন
মানুষের কাছে ইসলামের বাণী পৌঁছাবার প্রয়োজনে আলাপ আলোচনা ও মৃদু তর্কানুষ্ঠান কাঙ্খিত পদ্ধতি হিসেবে অনুমোদিত। জ্যোতীর্ময় কুরআন বলছেঃ
আহবান করো (সবাইকে) তোমার প্রভূ-প্রতিপালকের পথে পান্ডিত্যপূর্ণ ও সৌন্দর্যমন্ডিত বাগ্মীতার সাথে এবং বিতর্ক করো তাদের সাথে এমনভাবে যা হৃদ্যতাপূর্ণ ও আকর্ষণীয়। (১৬:১২৫)

‘একজন অমুসলিমের কাছে ইসলামের বাণী পৌঁছানো’- সাধারণত এটাই যথেষ্ট বলে প্রতিয়মান হয় যে, শুধু তার ইতিবাচক দিকগুলোকে সামনে তুলে ধরা। কেননা অধিকাংশ অমুসলিম যুক্তিসংগত ও চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত ইসলামের মহাসত্যের সাথে একাত্ম হয়ে উঠতে পারেনা শুধু এই কারণে যে, এমন কিছু নেতীবাচক প্রশ্ন তাদের মনের গভীরে গেঁথে আছে যা উত্তরহীন হয়েই থেকে যায়। ফলে তাদের বিবেক-বুদ্ধি ইসলামের ‘মানব প্রকৃতি’ সম্মত ইতিবাচক বিষয়গুলোর দিকে প্রচন্ড আকর্ষণ সৃষ্টি করতে পারলেও সেই উত্তরহীন প্রশ্নগুলো পেছনে টেনে ধরে রাখে।
বিতর্কে বসলে ইসলামের জীবনমুখী, মানবতাবাদী, ইতিবাচক প্রকৃতির প্রতি একমত বলে জানিয়ে দেবার সাথে সাথে সেই একই নিঃশ্বাসে বলে ফেলবেঃ কিন্তু “তোমরা তো সেই মুসলমান যারা দুই-তিনটা বিয়ে করো”। “তোমরা তো সেই লোক যারা নারীকে অবরুদ্ধ করে পর্দার নামে ঘরে বন্দী করে রাখো” তোমরা হচ্ছ মৌলবাদী ইত্যাদি।
আমি ব্যক্তিগতভাবে অমুসলিম ভাইদেরকে উদাত্তকণ্ঠে বলতে চাই (ইসলাম সম্পর্কে তাদের ধারণা অত্যন্ত সীমিত তা ভুল হোক বা শুদ্ধ,যেখান থেকেই তারা পেয়ে থাক) তাদের এই অনুভূতি ভুল বা ভ্রান্ত। আমি তাদেরকে উৎসাহিত করি খোলা মন নিয়ে সুস্পষ্ট ভাষায় কথা বলতে। এবং আশ্বস্ত করি তাদেরকে যে, ইসলাম সম্পর্কে যে কোনো কটাক্ষ আমি খোলা মনে গ্রহণ করতে প্রস্তুত।
দা’ওয়াহর ক্ষেত্রে বিগত কয়েকটি বছরে আমার যে অভিজ্ঞাতা তাতে আমার উপলদ্ধি এখানে এসে দাঁড়িয়েছে যে, সাধারণ একজন অমুসলিম ইসলাম সম্পর্কে খুব বেশি হলে গোটা বিশেক প্রশ্ন করতে পারে। যখনই আপনি কোনো অমুসলিমকে প্রশ্ন করবেন, ইসলামের মধ্যে কি এমন ভুল আছে যা আপনি বোধ করেন? উত্তরে সে গড়গড় করে পাঁচ ছয়টা প্রশ্ন করে ফেলবে। যেকোনো ভাবে এগুলো ঐ কুড়িটা প্রশ্নের মধ্যেই গিয়ে পড়বে।
যুক্তিমসঙ্গত উত্তর অধিকাংশকে আশ্বস্ত করে
সাধারণভাবে ইসলাম সম্পর্কে প্রচলিত কুড়িটি প্রশ্নের জবাব অত্যন্ত শক্তিশালী যুক্তি সহকারে বিবেক সম্মতভাবে দেয়া যেতে পারে এবং অধিকাংশ অমুসলিম এই সঙ্গত উত্তরের মাধ্যমে আশ্বস্ত হয়ে উঠতে পারেন। একজন মুসলমান যদি এই উত্তরগুলো মুখস্ত করেন অথবা অন্তত মনে রাখার চেষ্টা করেন-ইনশাআল্লাহ যে কোনো বিতর্কে তিনিই সফল হবেন। ইসলামের পূর্ণাঙ্গ সত্যকে কোনো প্রতিপক্ষ সহসা মেনে না নিলেও অন্তত ইসলাম সম্পর্কে তার ভুল ধারণাসমূহ দূর করে ইসলাম ও মুসলমানদের সম্পর্কে নেতিবাচক উর্ধ্বমুখী চিন্তাধারাকে নিষ্ক্রীয় করে দেয়া যেতে পারে। অত্যন্ত ব্যতিক্রম কিছু অমুসলিম এসব প্রশ্নের জবাবে পাল্টা প্রশ্ন রাখতে পারে। যার জবাবে হয়তো আরো কিছু তত্ত্ব ও তথ্যের প্রয়োজন পড়তে পারে।
প্রচার মাধ্যম যেসব ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি করেছে
অধিকাংশ অমুসলিমদের মনে ইসলাম সম্পর্কে সাধারণ যে ভ্রান্ত ধারণাগুলো বদ্ধমূল হয়েছে তার কারণ ইসলামের বিরুদ্ধে ওদের ভূল ও মিথ্যা ইতিহাস এবং তথ্যের নিরবচ্ছিন্ন ভাবে ‘তথ্য-বোমা’ বিস্ফোরণ। আন্তর্জাতিক প্রচার মাধ্যম প্রধানত ক্ষমতার মদো-মত্ত পশ্চিমা বিশ্বের নিয়ন্ত্রণে। হোক তা আন্তর্জাতিক উপগ্রহ চ্যানেল, বেতার কেন্দ্র, সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন অথবা বই-পুস্তক । সাম্প্রতিক কালে ইন্টারনেট অত্যন্ত শক্তিশালী তথ্য-মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এ মাধ্যমটি যদিও বিশেষ কারো নিয়ন্ত্রনে নয়। কিন্তু তবু, যে কেউ এর মধ্যে ইসলামের জঘন্য প্রচারণার পর্বত সমান আয়োজন দেখতে পাবে।
নিঃসন্দেহে অনেক সচেতন মুসলমান এ হাতিয়ারটি ইসলামের আসল চেহারা তুলে ধরার নিরন্তর চেষ্টায় লিপ্ত। কিন্তু বিরোধী প্রচারণার তুলনায় তা জোযন জোযন মাইল পেছনে পড়ে আছে। আমার বুক ভরা আশা যে, মুসলমানদের এই চেষ্টা দিন দিন আরো ব্যাপক আকার ধারণ করবে এবং তার ধারাবাহিকতা একদিন এমন অবস্থানে পৌঁছাবে যেখানে ওরা আজ অবস্থান করছে।
ভ্রান্ত ধারণাগুলো সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়
ইসলাম সম্পর্কে সাধারন প্রশ্নগুলো বিভিন্ন সময় ও যুগের প্রেক্ষিতে ভিন্ন। আমাদের নির্ধারিত কুড়িটি প্রশ্ন বর্তমান যুগ ও প্রেক্ষিতের ওপর। এক দশক আগে এই প্রশ্নমালা ছিল এর রকম এবং একদশক পরেই এই প্রশ্ন-মালা হয়তো পরিবর্তিত হয়ে যাবে। এটা নির্ভর করে শুধুমাত্র প্রচার মাধ্যমের ওপর-কিভাবে সে তা প্রকাশ করছে।
ভুল ধারণাগুলো সারা বিশ্বে প্রায় একই রকম
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন মানুষের সাথে মতবিনিময় করে দেখেছে-ইসলাম সম্পর্কে সাধারনভাবে এই কুড়িটি প্রশ্নই সব পায়গায় একই রকম। সমাজ সভ্যতা ও সংস্কৃতি ভেদে হয়ত দু’-একটি প্রশ্ন এর সাথে যুক্ত হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে আমেরিকায় এর সাথে যুক্ত হবে ‘সুদের লেনদেনকে ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে কেন’?
এভাবে ভারতীয় সামাজিকতার প্রেক্ষিতে আমি এই কুড়িটির সাথে আরো একটি যোগ করেছি। যেমন ভারতীয় অমুসলিমদের প্রশ্ন-মুসলমানরা কেন এত আমিষ খাদ্য খায় বা তারা নিরামিষভোজী নয় কেন? এ প্রশ্নটি অন্তর্ভুক্তির বিশেষ কারণ হলো, বিশ্ব জনসংখ্যার এক পঞ্চমাংশ ভারতীয়। অন্যকথায় পৃথিবীর শতকরা ২০% ভাগ মানুষ ভারতীয় বংশদ্ভুত এবং পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই তারা বসবাস করছে। তাই তাদের প্রশ্নগুলো বিশ্বব্যাপী অমুসলিদের প্রশ্নগুলোর মতোই সাধারণ পর্যায়ে উঠে এসেছে।
অসংখ্য অমুসলিম রয়েছে যারা ইসলামকে জানার জন্য অধ্যয়ন করছে
অসংখ্য অমুসলিম রয়েছে যারা ইসলামকে জানার জন্য অধ্যয়ন করে- এবং যারা করছে তাদের অধিকাংশই যেসব বই-পুস্তক পড়ছে তার লেখক পক্ষপাতদুষ্ট-ইসলামের সমালোচক। এদের বাড়তি সংজোযন হলো কুরআনে তারা পরস্পর বিরোধী কথা-বার্তা দেখতে পেয়েছে এবং কুরআন অবৈজ্ঞানিক ইত্যাদি।
ইসলাম সম্পর্কে কিছু ধারনা রাখেন এমন অমুসলিমদের সাধারণ কিছু প্রশ্নের জবাব এই শিরোনামে আমার ভাষণ, বই, ক্যাসেট ও সিডি আকারে সুরক্ষিত আছে। আগ্রহী ব্যক্তি তার যেকোন একটি সংগ্রহ করে, পড়ে বা শুনে নিতে পারেন।
১.বহু-বিবাহ
প্রশ্নঃ ইসলাম একজন পুরুষকে একাধিক স্ত্রী রাখার অনুমতি দেয় কেন? অথবা ইসলামে বহু-বিবাহ অনুমোদিত কেন?
জবাব
ক. বহু-বিবাহের সংজ্ঞা
‘বহু-বিবাহ’ মানে এমন একটি বিবাহ পদ্ধতি যেখানে এক ব্যক্তির একাধিক স্ত্রী থাকে। বহু-বিবাহ দুই ধরনের- একজন পুরুষ একাধিক নারীকে বিবাহ করে। আর একটি বহু স্বামী বরণ। অর্থাৎ একজন স্ত্রীলোক একাধিক পুরুষ বিবাহ করে। ইসলামে পুরুষের জন্য সীমিত সংখ্যক ‘বহু-বিবাহ’ অনুমোদিত। অপর দিকে নারীর জন্য একাধিক পুরুষ বিবাহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ‘হারাম’।
এবার মূল প্রশ্নে আসা যাক। কেন একজন পুরুষ একাধিক স্ত্রী রাখার অনুমতি পায়?
খ. পৃথিবীতে কুরআ’নই একমাত্র ধর্ম-গ্রন্থ, যে বলে “বিবাহ করো মাত্র একজনকে”
ভূ-পৃষ্টের ওপরে কুরআনই একমাত্র ধর্ম-গ্রন্থ যা এই বাক্যাংশ ধারণ করে আছে-“বিবাহ করো মাত্র একজনকে” আর কোনো ধর্ম-গ্রন্থ নেই, যা পুরুষকে নির্দেশ একজন স্ত্রীতে সন্তুষ্ট থাকতে। অন্য কোনো ধর্ম-গ্রন্থ -হোক তা বেদ, রামায়ন, মহাভারত, গীতা, অন্যদিকে তালমুদ অথবা বাইবেল। এ সবের মধ্যে স্ত্রীদের সংখ্যার ওপর কোনো বিধিনিষেধ বের করতে পারবে কি কেউ? বরং এসব ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী একজন পুরুষ বিবাহ করতে পারে যতজন তার ইচ্ছা। এটা অনেক পরের কথা যে, হিন্দু ধর্ম গুরু এবং খ্রীস্টান চার্চ স্ত্রীর সংখ্যা‘এক’ এ নিয়ন্ত্রিত করে দিয়েছে।
অসংখ্য ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব তাদের ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী একাধিক স্ত্রী রেখেছে। যেমন রামের পিতা রাজা দশরথ। ভগবান শ্রী কৃষ্ণের তো অনেক স্ত্রী ছিল!
বাইবেল যেহেতু স্ত্রীদের সংখ্যার ওপর কোনো বিধিনিষেধই নেই। সেহেতু আগের কালের খ্রীস্টান পুরুষরা যে-ক’জন খুশি স্ত্রী রাখতে পারত। মাত্র কয়েক শতাব্দী আগে তাহাদের চার্চ্চ স্ত্রীর সংখ্যা ‘এক’ এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছে। ইহুদীবাদে বহু বিবাহ অনুমোদিত। তাদের তালমুদিয় বিধান অনুযায়ী আব্রাহামের [ইব্রাহীম (আ)] তিনজন স্ত্রী ছিল এবং সলোমনের [সুলাইমান (আ)]-এর ছিল শতাধিক স্ত্রী। বহু-বিবাহের এই প্রথা চলে আসছিল তাদের “রাব্বাঈ” জারসম বিন ইয়াহুদাহ্‌ পর্যন্ত। (৯৬০ সি.ই থেকে ১০৩০ সি.ই) তিনিই এর বিরুদ্ধে একটি অনুশাসন জারি করেন। ইহুদীদের ‘সেফারডিক’ সমাজ যারা প্রধানত মুসলমানদের দেশগুলোতে বসবাস করে তারা এই প্রথাকে নিকট অতীতের ১৯৫০ সাল পর্যন্ত ধরে রাখে। অতঃপর ইসরাঈলের প্রধান রাব্বাঈ একাধিক স্ত্রী রাখার ওপর বিধিনিষেধ জারি করে দেয়।
একটি লক্ষণীয় বিষয়ঃ ১৯৭৫ সালের আদম-শুমারী অনুযায়ী ভারতীয় হিন্দুরা বহু বিবাহের ক্ষেত্রে মুসলমানদের চাইতে অগ্রগামী। কমিটি অফ দি স্টাটাস অফ ওমেন ইন ইসলাম (ইসলামে নারীর মর্যাদা কমিটি) নামে এ বইটি প্রকাশিত হয়েছে ১৯৭৫ সালে। বইয়ের ৬৬ ও ৬৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, ১৯৫১ থেকে ১৯৬১ পর্যন্ত একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, একাধিক স্ত্রী গ্রহণ-সংক্রান্ত বিবাহ, হিন্দুদের মধ্যে শতকরা পাঁচ দশমিক শূন্য ছয় (৫.০৬%) আর মুসলমানদের মধ্যে চার দশমিক তিন এক (৪.৩১%)। ভারতীয় আইন অনুযায়ী একাধিক স্ত্রী গ্রহণের অনুমোদন শুধুমাত্র মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত। ভারতে যেকোনো অমুসলিমের জন্য একাধিক স্ত্রী রাখা অবৈধ। এটা অবৈধ হওয়া সত্ত্বেও মুসলমানদের তুলনায় হিন্দুরাই একাধিক স্ত্রী বেশি রাখছে। এর আগে তো কোনো বিধিনিষেধই ছিলনা। এমনকি হিন্দু পুরুষদের ক্ষেত্রেও একাধিক স্ত্রী রাখা অনুমোদিত ছিল। এই তো সেদিন ১৯৫৮ সালে হিন্দু বিবাহ-বিধি অনুমোদিত হলো এভাবে যে, একজন হিন্দুর জন্য একাধিক স্ত্রী রাখা অবৈধ। বর্তমানে এটা একটা ভারতীয় রাষ্ট্রীয় আইন। যা নিয়ন্ত্রিত করেছে একজন হিন্দু পুরুষকে একাধিক স্ত্রী রাখতে- “হিন্দু ধর্ম-গ্রন্থ” নয়।
আসুন এবার দেখা যাক ইসলাম কেন একজন পুরুষকে একাধিক স্ত্রী রাখার অনুমতি দেয়।
গ. কুরআন একাধিক বিবাহের নিয়ন্ত্রিত রূপকে অনুমতি দেয়
আমি আগে যেমন বলে এসেছি ভূ-পৃষ্ঠের ওপরে কুরআনই একমাত্র ধর্মীয় গ্রন্থ যা বলে ‘বিবাহ করো মাত্র একজনকে’। কথাটি জ্যোতির্ময় কুরআনের সূরা নিসার নিম্নদ্ধৃত আয়াতের অংশ।
বিবাহ করো তোমাদের পছন্দের নারী- দু’জন অথবা তিনজন অথবা চারজন কিন্তু যদি আশঙ্কা করো যে, তোমরা (তাদের সাথে) ভারসাম্যপূর্ণ আচরণ করতে না-ও পারতে পারো- তাহলে মাত্র একজন। (৪:৩)
কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে বহু-বিবাহের কোনো মাত্রা নির্ধারিত ছিল না এবং ক্ষমতাবান প্রায় প্রতিটি মানুষ এতে অভ্যস্ত ছিল। কেউ কেউ তো শ’ এর মাত্রা ছাড়ালে ক্ষান্ত হতো না। কুরআন সর্বোচ্চ চার জনের একটা মাত্রা নির্ধারণ করে দিল। ইসলাম একজন পুরুষকে দুজন, তিনজন অথবা চারজনের যে অনুমতি দিয়েছে তা কঠিন শর্তের মধ্যে আবদ্ধ যে, কেবলমাত্র তখনই তা সম্ভব যখন তাদের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সুবিচারমূলক আচরণ করতে পারবে।
একই সূরার ১২৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে
তুমি কষ্মিকালেও পেরে উঠবে না স্ত্রীদের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সঙ্গত আচরণ বজায় রাখতে। (৪:১২৯)
কাজেই ইসলামে বহু-বিবাহ কোনো বিধান নয় বরং ব্যতিক্রম। বহু মানুষ এই ভুল ধারণায় নিমজ্জিত যে, একজন মুসলিম পুরুষের জন্য একাধিক স্ত্রী রাখা বাধ্যতামূলক।
করা এবং না করার ক্ষেত্রে ইসলামের পাঁচটি শ্রেণী-বিন্যাস করা আছে।
১. ফরজ-অবশ্য করণীয় বা বাধ্যতামূলক।
২.মুস্তাহাব-অনুমোদিত অথবা উৎসাহিত।
৩.মুবাহ-অনুমোদন যোগ্য বা গ্রহণ যোগ্য।
৪.মাকরুহ- অনুমোদিত নয় বা নিরুৎসাহিত।
৫.হারাম- বে-আইনী বা নিষিদ্ধ।
এরমধ্যে বহু-বিবাহ মধ্যম শ্রেণীতে পড়ে। অর্থাৎ অনুমোদন যোগ্য এবং কোনো ভাবে এমন কথা বলা যাবে না যে, একজন মুসলিম, যার দুজন, তিনজন অথবা চারজন স্ত্রী আছে, সে তার তুলনায় ভালো মুসলিম যার স্ত্রী মাত্র একজন।
ঘ. গড় আয়ুস্কাল পুরুষের তুলনায় নারীর বেশি
প্রাকৃতিকভাবে নারী ও পুরুষের জন্মহার প্রায় সমান। একটি নারী শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পুরুষ শিশুর চাইতে বেশী। একটি নারী শিশু রোগ-জীবানু ও রোগ-ব্যাধির বিরুদ্ধে পুরুষ শিশুর চাইতে লড়াই করতে পারে। এ কারণে শিশুকালে নারীর তুলনায় পুরুষের মুত্যু হার বেশি।
যে কোনো যুদ্ধের সময় নারীর তুলনায় পুরুষ বেশি মারা যায়। সাধারণ দুর্ঘটনা ও রোগ-ব্যাধিতে নারীর তুলনায় পুরুষ বেশি মারা যায়। গড় আয়ুষ্কাল পুরুষের চাইতে নারীর বেশি। মহাকালে যে কোনো যুগে খুঁজে দেখলে দেখা যাবে-বিপত্নীকের চাইতে বিধবার পরিমাণ অনেক বেশি।
ঙ. ভারতে পুরুষের জন্ম-সংখ্যা নারীর তুলনায় বেশি। এর কারণ নারী শিশুর ভ্রুণ-হত্যা ও নারী শিশু হত্যা
প্রতিবেশি কয়েকটি দেশের মধ্যে তুলনামুলক ভাবে ভারতীয় পুরুষ-জনসংখ্যা নারী-জন সংখ্যার চাইতে বেশি। এর নেপথ্য কারণ, নারী শিশু হত্যার উচ্চ হার। প্রতি বছর নুন্যতম দশলাখ ‘নারী-ভ্রূনের’ গর্ভপাত ঘটানো হয় এই দেশে যখনই মায়ের গর্ভে তাকে নারী হিসাবে সনাক্ত করা যায়। যদি এই অভিষপ্ত চর্চ্চা বন্ধ করা যায় তাহলে ভারতেও পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা বেশি হয়ে যাবে।
চ. বিশ্বব্যাপী নারী জনসংখ্যা পুরুষের চাইতে অধিক
আমেরিকায় পুরুষের চাইতে সত্তুর লক্ষ আশি হাজার নারী বেশি। শুধু নিউইয়র্কে পুরুষের চেয়ে দশলাখ নারী। উপরন্তু নিউইয়র্কের এক তৃতীয়াংশ পুরুষ সমকামী। অর্থাৎ এই লোকেরা কোনা নারী-সঙ্গ বা বিবাহ করতে আদৌ আগ্রহী নয়। ইংল্যান্ডে পুরুষ জনসংখ্যার সমসংখ্যক নারী বাদ দিলে চল্লিশ লক্ষ অতিরিক্ত নারী। একই ভাবে জার্মানীতে পঞ্চাশ লাখ অতিরিক্ত নারী। রাশিয়ায় নব্বুই লাখ। এরপর শুধু আল্লাহই বলতে পারেন গোটা পৃথিবীতে একজন পুরুষের বিপরীতে একজন নারী ধরে নিলে তারপর কত নারী অতিরিক্ত থেকে যাবে।
ছ. প্রতিটি পুরুষের জন্য মাত্র একজন স্ত্রী এই নিয়ন্ত্রণ বাস্তবতা বিবর্জিত
আমেরিকার প্রতিটি পুরুষ যদি একজন করে নারীকে বিবাহ করে তারপরেও তিন কোটির বেশি নারী থেকে যাবে এমন, যারা তার জন্য কোনো স্বামী পাবে না। উপরন্তু মনে রাখতে হবে, সারা আমেরিকায় সমকামী পুরুষের সংখ্যা দুই কোটি পঞ্চাশ লাখের বেশী। এভাবে চল্লিশ লাখের বেশি নারী ইংল্যান্ডে। পঞ্চাশ লাখের বেশি জার্মানিতে এবং প্রায় এক কোটি নারী রাশিয়ায়- যারা কোনো স্বামী পাবে না।
ধরা যাক, আমার বোন আমেরিকা নিবাসী একজন অবিবাহিতা মহিলা অথবা আপনার বোন আমেরিকায় বসবাসকারী একজন অবিবাহিতা নারী। সেখানে তার জন্য দুটি বিকল্প পথ খোলা আছে- হয় সে এমন একজন পুরুষকে বিবাহ করবে যার একজন স্ত্রী আছে অথবা তাকে হতে হবে “জনগণের সম্পত্তি”-অন্য কিছুই হওয়া সম্ভব নয়। তাহলে যারা রুচিশীলা তারা প্রথমটাই বেছে নেবে।
অধিকাংশ নারী অন্য নারীর সাথে তার স্বামীকে ভাগাভাগি করতে রাজি হবে না। কিন্তু ইসলামে পরিস্থিতি বিবেচনায় তা-ই অপরিহার্য হয়ে ওঠে-“মুসলিম নারী তার যথার্থ ঈমানের কারণে এই সামান্য ক্ষতির বিনিময়ে অনেক বড় ক্ষতি ঠেকাতে তার আর এক মুসলিম বোনকে জনগণের সম্পত্তি হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে পারেন”।
জ. জনগনের সম্পত্তি হওয়ার চাইতে একজন বিবাহিতা পুরুষ বিয়ে করা শ্রেয়
পশ্চিমা সমাজের একজন পুরুষের ‘মেয়ে-বন্ধু’ খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। অথবা একাধিক বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক। এক্ষেত্রে নারীরা যাপন করে মর্যাদাহীন এক অনিশ্চিত-অরক্ষিত জীবন। অথচ সেই একই সমাজ একজন পুরুষের জন্য একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করতে রাজি নয়। যেখানে নারী হতে পারতো একজন সম্মানিতা, মর্যাদাময় অবস্থানের অধিকারিণী এবং যাপন করতো নিরাপত্তাপূর্ণ নিরাপদ জীবন।
যেখানে নারীর সামনে দুটি পথ খোলা। যে স্বাভাবিকভাবে কোনো স্বামী পাবেনা তাকে হয় একজন বিবাহিত পুরুষকেই বিয়ে করতে হবে নতুবা হতে হবে জনগনের সম্পত্তি। ইসলাম পছন্দ করে নারীকে সম্মানজনক অবস্থান দিতে, প্রথম পথের অনুমোদন দিয়ে এবং ঘৃণার সাথে প্রত্যাখ্যান করে দ্বিতীয়টিকে।
আরো কিছু রয়েছে যে সবের জন্য ইসলাম নিয়ন্ত্রিত বহু-বিবাহ অনুমোদন করে। কিন্তু প্রধানত নারীর সম্মান-মর্যাদা ও সম্ভ্রম সুরক্ষাই লক্ষ্য।
২.একাধিক স্বামী
প্রশ্নঃ একজন পুরুষ যদি একাধিক স্ত্রী রাখার অনুমতি পায়, তাহলে ইসলাম একজন নারীকে কেন একাধিক স্বামী রাখতে নিষেধ করে?
জবাব
অসংখ্য মানুষ যার মধ্যে অনেক মুসলমানও রয়েছে, প্রশ্ন করেন-মুসলিম পুরুষ একাধিক স্ত্রী রাখার অনুমতি পাচ্ছে অথচ নারীর ক্ষেত্রে সে অধিকার অস্বীকার করা হচ্ছে, এর যৌক্তিকতা কি? অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে যে কথাটি প্রথমেই আমাকে বলে নিতে হবে, তা হলো ভারসাম্যপূর্ণ ন্যায় বিচার ও সমতার ভিত্তির ওপরেই একটি ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠিত। মানুষ হিসেবে আল্লাহ তা’আলা নারী ও পুরুষকে সমান মান দিয়েই সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু সাথে সাথে সামর্থ ও যোগ্যতার ভিন্নতা এবং সে অনুযায়ী দায়িত্ব কর্তব্যের বিভিন্নতা দিয়ে। শারিরীক ও মানসিক ভাবে নারী ও পুরুষ সম্পূর্ন ভিন্ন। জীবনের ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা এবং দায়িত্ব-কর্তব্যও বিভিন্ন। ইসলামে নারী ও পুরুষ সমান কিন্তু একই রকম নয়।
সূরায়ে নিসার ২২ থেকে ২৪ আয়াতে একটি তালিকা দেয়া হয়েছে যে, মুসলিম পুরুষ কোন কোন নারীকে বিবাহ করতে পারবে না। এর পরে ২৪ আয়াতে আলাদা করে বলা হয়েছে সেই সব নারীও (নিষিদ্ধ) যারা অন্যের বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ আছে- অর্থাৎ অন্যের বউ।
ইসলামে নারীর জন্য বহু-স্বামী গ্রহণ নিষিদ্ধ কেন, নিম্নোদ্ধৃত বিষয়গুলো তা পরিষ্কার করে দেবে।
ক. একজন পুরুষের একধিক স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও তার পরিবারে জন্মগ্রহণকারী শিশুদের মাতা-পিতার পরিচয় খুব সহজেই পাওয়া যায়। শিশুর পিতা কে আর মাতা কে। অপরদিকে একজন নারী যদি একাধিক স্বামী গ্রহণ করে তবে এ পরিবার জন্ম নেয়া শিশুর শুধু মায়ের পরিচয় পাওয়া যাবে-বাবার নয়। পিতা ও মাতার সুস্পষ্ট পরিচয়ের ক্ষেত্রে ইসলাম আপোসহীন। আধুনিক মনোবিজ্ঞানিরা বলেন, যে শিশু তার মাতা-পিতার পরিচয় জানে না, বিশেষ করে পিতার- সে শিশু তীব্র মানসিক জটিলতা ও হীনমন্যতায় ভোগে। এ শিশুদের শৈশব নিকৃষ্টতর এবং আনন্দহীন । দেহপসারিণী বা বেশ্যাদের সন্তানরা এর জলন্ত প্রমাণ। এদের শিশুকাল ও কৈশোর মর্মান্তিক। বহু স্বামী গ্রহণকারী পরিবারে জন্ম পাওয়া শিশুকে নিয়ে কোনো স্কুলে ভর্তী করতে গেলে যদি মাকে প্রশ্ন করা হয় শিশুর পিতার নাম? তা হলে সে মাকে দু’জন অথবা তার বেশি পুরুষের নাম বলতে হবে। বিজ্ঞানের অগ্রগতি এখন জেনেটিক পরীক্ষার মাধ্যমে মাতা ও পিতা উভয়কে সনাক্ত করার কৌশল আবিষ্কার করেছে। কাজেই যে বিষয়টা অতীতে অসম্ভব ছিল বর্তমানে তা খুব সহজেই হতে পারে।
খ. প্রকৃতি প্রদত্ত যোগ্যতা ও বৈশিষ্ট, বহুগামীতায় নারীর চাইতে পুরুষের বেশি।
গ. শারীরিক যোগ্যতায় একজন পুরুষের পক্ষে কয়েকজন স্ত্রীর স্বামীর দায়িত্ব ও ভূমিকা পালন সহজ। একজন নারী সেই একই অবস্থানে,অর্থাৎ যার কয়েকজন স্বামী আছে, তাদের স্ত্রী হিসেবে যে দায়িত্ব ও কর্তব্য তার ওপর বর্তায় তা পালন করা তার পক্ষে আদৌ সম্ভব নয়। কেননা মাসিক ঋতুচক্রের বিভিন্ন পর্যায়ে মানসিক ও আচরণগত বিভিন্ন পরিবর্তনের মধ্যে তাকে পড়তে হয়।
ঘ. একজন নারী যার একাধিক স্বামী থাকবে-তাকে তো একই সাথে কয়েকজনের যৌন-সঙ্গী হতে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সমূহ সম্ভাবনা থাকবে যৌন রোগের এবং যৌনতার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অন্যান্য মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ার। উপরন্তু তার মাধ্যমেই সে সব রোগে তার স্বামীর আক্রান্ত হবে। এমনকি যদি তার স্বামীদের কারো অন্য কোনো নারীর সাথে বিবাহ বহির্র্ভূত যৌন সম্পর্ক নাও থাকে। পক্ষান্তরে একজন পুরুষ- যার একাধিক স্ত্রী রয়েছে, স্ত্রীদের কারো যদি বিবাহ বহির্ভূত অন্য কারো সাথে যৌন সম্পর্ক না থাকে তাহলে যৌনতা সংক্রান্ত কোনো রোগে আক্রান্ত হবার আদৌ কোনো সম্ভাবনা নেই।
উপরোল্লেখিত কারণগুলো এমন যা যে কারো পক্ষে চেনা এবং বুঝে নেয়া সম্ভব। এছাড়া হয়তো আরো অসংখ্য কারণ থাকতে পারে যে কারণে অন্তহীন জ্ঞানের আধার সৃষ্টিকর্তা বিধাতা প্রতিপালক আল্লাহ তা‘আলা নারীদের জন্য বহু স্বামী বরণ নিষিদ্ধ করেছেন।

৩.‘হিজাব’ বা নারীর পর্দা
প্রশ্নঃ ইসলাম পর্দার আড়ালে রেখে নারীদেরকে কেন অবমূল্যায়ন করেছে?
জবাব
ইসলামে নারীর মর্যাদা’- ধর্মহীন প্রচার মাধ্যমগুলোর উপর্যপুরি আক্রমণের লক্ষ্যস্থল- ‘হিজাব’ বা ইসলামী পোশাক। ইসলামী বিধি বিধানে নারী নিগ্রহের সবচাইতে বড় প্রমাণ হিসেবে যা কথায় কথায় দেখানো হয়। ধর্মীয়ভাবে নারীর জন্য রক্ষণশীল পোশাক বা পর্দা ফরয করার নেপথ্য কারণগুলো আলোচনার পূর্বে ইসলাম আগমনের পূর্বে বিশ্বসমাজে সামগ্রীকভাবে নারীর অবস্থা ও অবস্থান কি ছিল তা নিয়ে কিঞ্চিৎ পর্যালোচনা প্রয়োজন।
ক. ইসলাম-পূর্ব কালে নারীর-মর্যাদা বলতে কোনো ধারণার অস্তিত্ব ছিলনা। তারা ব্যবহৃত হতো ভোগ্য সামগ্রী হিসেবে
নিম্নে বর্ণিত বিষয়গুলো সর্বজনমান্য বিশ্ব-ইতিহাস থেকে তুলে আনা হয়েছে। সমুদয় মিলে যে চিত্র আমাদের চোখের সামনে উঠে আসবে তাতে আমরা সুস্পষ্ট দেখতে পাবো ইসলাম-পূর্ব সভ্যতাগুলোতে নারীর ‘মর্যাদা’ বলতে কিছুই ছিলনা। হীন নীচ এমনকি নুন্যতম ‘মানুষ’হিসেবেও তারা গণ্য ছিল না।
১. ব্যাবিলনীয় সভ্যতাঃ ব্যাবিলনীয় আইনে নারীর কোনো ধরণের কোনো অধিকার স্বীকৃত ছিলনা। মূল্য-মর্যাদা কি ছিল একটি উদাহরণে তা স্পষ্ট করে দেবে। কোনো পুরুষ যদি ঘটনাক্রমে কোনো নারীকে হত্যা করে তাহলে তাকে শাস্তি দেবার পরিবর্তে তার স্ত্রীকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হতো।
২. গ্রীক সভ্যতাঃ গ্রীক সভ্যতাকে পূর্বকালের সকল সভ্যতার শ্রেষ্ঠতম ও উজ্জ্বলতম গণ্য করা হয়। তথাকথিত এই উজ্জ্বলতম সভ্যতায় নারী ছিল সব রকম অধিকার থেকে বঞ্চিত। উপরন্তু অস্তিত্বগত ভাবে অত্যন্ত নিকৃষ্ট। একারণে তাদেরকে ঘৃণার চোখে দেখা হতো। গ্রীক পৌরাণিক শাস্ত্রের এক কাল্পনিক নারী যার নাম “প্যানডোরা”। বিশ্ব মানবতার সকল দুর্ভাগ্যের মূল কারণ সেই নারী। তাই গ্রীকরা নারীকে ‘প্রায় মানুষ’ অর্থাৎ মানুষের মতো বটে, কিন্তু সম্পূর্ণ নয় বলে মনে করত। পুরুষের সাথে তার কোনো তুলনাই হয় না এমন। অপরদিকে নারীর সতীত্ব ছিল মহামূল্যবান কিছু এবং দেবীর মতো সম্মানও করা হতো। কিছুকাল পরেই এই গ্রীকরা আত্মঅহংকারের উত্তুঙ্গে উঠে ধরা পড়ে বিকৃত যৌনাচারের হাতে, বেশ্যালয়ে গমনাগমন সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছি।
৩. রোমান সভ্যতাঃ যখন তার বিকাশের শিখর চূড়ায় তখন একজন পুরুষ যে-কোনো সময় তার স্ত্রীকে হত্যা করার অধিকার রাখতো। নগ্ন নারী যে-কোনো আসরের সৌন্দর্য এবং বেশ্যালয় যাতায়াত পুরুষের সংস্কৃতি।
মিসরীয় সভ্যতাঃ মিসরীয় সভ্যতায় নারী ‘ডাইনী’ এবং শয়তানের নিদর্শন হিসেবে গণ্য হতো।
ইসলাম পূর্ব আরবঃ ইসলাম পূর্ব আরবে নারীর অবস্থান ছিল ঘরের অন্যান্য ব্যবহারীক আসবাবপত্রের মতো। অনেক পিতা অসম্মানের হেতু হিসেবে তার শিশুকণ্যাকে জীবন্ত কবর দিত।
খ. ইসলাম নারীকে ওপরে উঠিয়েছে। দিয়েছে তাদেরকে সমতা এবং প্রত্যাশা করে- তারা তাদের মর্যাদা রক্ষা করবে।
ইসলাম নারীর মর্যাদাকে ওপরে উঠিয়েছে এবং নিশ্চিত করেছে তাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে। ইসলাম নারীর মর্যাদাকে সংরক্ষণ করতে চায়।

পুরুষের পর্দাঃ মানুষ সাধারণত পর্দা নিয়ে আলোচনা করে নারীদের ক্ষেত্রে। অথচ জ্যোতীর্ময় কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নারীর পর্দার আগে পুরুষের পর্দার কথা বলেছেন। সূরা নূরে বলা হয়েছে।
বলো! বিশ্বাসী পুরুষদেরকে- তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে অবনত রাখে এবং তাদের শালীনতা রক্ষা করে। এটা তাদেরকে আরো পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন (মানসিকতার) করে তুলবে, আর আল্লাহ কিন্তু সেই সব কিছুই জানেন যা তোমরা করো। (২৪:৩০)
যে মুহুর্তে কোনো পুরুষ একজন নারীর দিকে তাকাবে- লজ্জাকর অশ্লীল চিন্তা তার মনে এসে যেতে পারে। কাজেই তার দৃষ্টি অবনত রাখাই তার জন্য কল্যাণকর।
নারীর জন্য পর্দাঃ সূরা নূরের পরবর্তী আয়াতে বলা হচ্ছেঃ
এবং বলো, বিশ্বাসী নারীদেরকে- তারা তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থান সমূহের সযত্ন সংরক্ষণ করে এবং তাদের দৈহীক সৌন্দর্য ও অলংকারের প্রদর্শনী না করে। তবে অনিবার্য্য ভাবে যা উন্মুক্ত থাকে। তারা যেন তাদের বক্ষের ওপরে চাদর ঝুলিয়ে দেয় এবং প্রদর্শন না করে তাদের সৌন্দর্য, তাদের স্বামী তাদের পিতা তাদের স্বামীর পিতা (শশুর) এবং সন্তানদের ছাড়া। (২৪:৩১)

গ. হিজাবের ছয়টি শর্ত
কুরআন সুন্নাহ অনুযায়ী হিজাব পালনের ছয়টি শর্ত।
১. মাত্রা বা পরিমাণঃ প্রথম শর্ত হলো দেহের সীমানা যা যতটুকু-অবশ্যই ঢেকে রাখতে হবে। নারী ও পুরুষের জন্য এটা ভিন্ন ভিন্ন। পুরুষের জন্য ঢেকে রাখার বাধ্যতামূলক পরিসীমা তার দেহের নুন্যতম নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত। নারীর জন্য এই পরিসীমা আরো বিস্তৃত- কব্জী পর্যন্ত হাত এবং মুখমন্ডল ছাড়া বাদবাকি শরীরের সকল অংশ ঢেকে রাখা বাধ্যতামূলক। তারা যদি চায় তাহলে তা-ও আবৃত করে নিতে পারে। ইসলামের বিশেষজ্ঞ আলেমগণের অনেকেই হাত ও মুখমন্ডলকেও বাধ্যতামূলক ঢেকে রাখার অংশ মনে করেন। বাদবাকি পাঁচটি শর্ত নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে একই রকম প্রযোজ্য।
২. পরিধেয় পোষাক ডিলেডালা হতে হবে। যেন দেহের মূল কাঠামো প্রকাশ না পায়।
৩. পরিধেয় কাপড় এতটা পাতলা ও স্বচ্ছ হতে পারবেনা যাতে ভেতরটা দেখা যায়।
৪. পোশাক এতটা আকর্শণীয় ও জাকজমকপূর্ণ হতে পারবে না যাতে বিপরীত লিঙ্গ আকর্ষিত হয়।
৫. পোশাক এমন হতে পারবে না যা বিপরীত লিঙ্গের পোশাকের মতো বা সমরুপ।
৬. পোশাক এমন হতে পারবে না দেখতে অবিশ্বাসীদের মতো। তাদের এমন কোনো পোশাক পরা উচিৎ নয় যা বিশেষভাবে পরিচিত এবং চিহ্নিত অন্য ধর্মাবলম্বীদের (যারা মূলত অবিশ্বাসী)।
ঘ. অন্যান্য জিনিসের মধ্যে আচার-আচারণও হিজাবের অন্তর্ভুক্ত
ছয় ধরনের পরিচ্ছদের পাশাপাশি পূর্ণাঙ্গ পর্দা ব্যক্তির নৈতিক চরিত্র, আচার-আচারণ, অভিব্যক্তি এবং লক্ষ উদ্দেশ্যকেও একিভূত করে। একজন ব্যক্তি সে যদিও শুধু কাপড়-চোপড়ে হিজাব পালন করে তাহলে সে ‘হিজাব’ পালক করলো ন্যূনতম পর্যায়ের। পোশাকের পর্দা পালনের সাথে সাথে চোখের পর্দা, মনের পর্দা ,চিন্তা-ভাবনার পর্দা এবং লক্ষ্য উদ্দেশ্যের পর্দাও থাকতে হবে। পর্দার সীমার মধ্যে আরো যা পড়ে, তা হলো- ব্যক্তির চলা, কথা বলা এবং তার সার্বিক আচরণ ইত্যাদি।
ঙ. হিজাব বা পর্দা অহেতুক উৎপীড়ন প্রতিরোধ করে
নারীকে কেন পর্দার বিধান দেয়া হয়েছে কুরআন তা স্পষ্ট করে দিয়েছে। সূরা অহ্‌যাবে বলা হয়েছেঃ
হে নবী! বলুন আপনার স্ত্রী ও কন্যাদেরকে এবং বিশ্বাসী নারীদেরকে যে, তারা যেন তাদের বহিরাবরণ পরে থাকে (যখন বাইরে যাবে)। এটা তাদের পরিচিতির অত্যন্ত উপযোগী। (তারা যেন পরিচিত হয়ে বিশ্বাসী-নারী হিসাবে) তাহলে আর অহেতুক উৎপিড়ীত হবে না। আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল দয়াবান। (৩৩:৫৯)
জ্যোতীময় কুরআন বলছেঃ নারীকে পর্দার বিধান দেয়া হয়েছে এই জন্য যে, তারা যেন রুচিশীলা পরিচ্ছন্ন নারী হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। এবং এটা তাদেরকে লজ্জাকর উৎপীড়নের হাত থেকে রক্ষা করবে।
চ. দু’টি জমজ বোনের উদাহরণ
ধরা যাক জমজ দু’টি বোন। উভয়ই অপূর্ব সুন্দরী। ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। তাদের একজন পরেছে ইসলামী হিজাব। অর্থাৎ সম্পূর্ণ দেহ আবৃত। শুধু কব্জী পর্যন্ত হাত ও মুখমন্ডল খোলা। অন্যজন পরেছে পশ্চিমা পোশাক। শরীরের অধিকাংশ খোলা এবং প্রায় অর্ধ-উলঙ্গ। সামনেই এক মোড়ে আড্ডা দিচ্ছে এক দঙ্গল যুবক। মেয়েদেরকে দেখে হৈ-হল্লা করা, শীশ দেয়া আর বাগে পেলে উত্ত্যক্ত করাই তাদের কাজ। এখন এই দুই বোনকে যেতে দেখে তারা কাকে উদ্দেশ্য করে হল্লা করবে ? শীশ দেবে ? যে মেয়েটি নিজেকে ঢেকে রেখেছে তাকে দেখে? না যে মেয়েটি প্রায় উদোম হয়ে আছে তাকে দেখে? খুব স্বাভাবিক ভাবেই তাদের চোখ যাবে যে কিনা দেখাতে চায় তার দিকে। কার্যত এ ধরনের পোশাক বিপরীত লিঙ্গের প্রতি ‘ভাষাহীন নিরব আমন্ত্রণ’। যে কারণে বিপরীত লিঙ্গ উত্তেজিত হতে বাধ্য হয়। জ্যোর্তীময় কুরআন যথার্থই বলেছে- ‘হিজাব নারীদের উৎপীড়ন থেকে রক্ষা করে’।
ছ. ধর্ষকের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি মৃত্যুদন্ড
ইসলামের বিধান অনুযায়ী একজন পুরুষ যদি কোনো নারী ধর্ষণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয় তাহলে তার শাস্তি প্রকাশ্য মৃত্যুদন্ড। অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেন এই কঠিন বাক্য শুনে। কেউ কেউ তো বলেই বসেন, ইসলাম অত্যন্ত নিষ্ঠুর, বর্বরদের ধর্ম। শত শত অমুসলিম পুরুষের কাছে আন্তরিকভাবে জানতে চেয়েছি- ধরুন, আল্লাহ না করুন কেউ একজন আপনার স্ত্রীকে ধর্ষণ করেছে অথবা আপনার বোন বা কন্যা। আপনাকে বিচারকের আসনে বসানো হয়েছে এবং ধর্ষণকারীকে আপনার সামনে হাজির করা হয়েছে। কি শাস্তি দেবেন তাকে? প্রত্যেকেই উত্তর একটিই-“মৃত্যুদন্ড”। কেউ বলেছেন, ফায়ারিং স্কোয়াডে নিয়ে আমার চোখের সামনে ব্রাস ফায়ার করে ঝাঝরা করে দিতে বলব। কেউ বলেছেন ওকে তিল তিল করে মৃত্যুর স্বাদ দিয়ে মারতে বলব। এই উত্তর দাতাদের কাছেই আমার প্রশ্ন,আপনার মা-বোন স্ত্রী কন্যাকে কেউ ধর্ষণ করলে তাকে ওভাবে মেরে ফেলতে চান। কিন্তু এই একই অপরাধ যদি অন্য কারো স্ত্রী-কন্যার ওপর ঘটে তখন এই আপনিই বলেন মৃত্যুদন্ড অত্যন্ত কঠোর ও নিষ্ঠুর হয়ে যায়। কেন ভাই, একই অপরাধের জন্য ক্ষেত্রভেদে দুই রকম দন্ড?
জ.নারীকে মর্যাদা দেবার পশ্চিমা সমাজের দাবি সর্বৈভ মিথ্যাচার
নারী স্বাধীনতার পশ্চিমা শ্লোগান একটি প্রকাশ্য প্রতারণা। তার দেহের সৌন্দর্যকে খুলে খুলে ব্যবসা করার একটি লোভনীয় ফাঁদ। তার আত্মার অবমাননা এবং তার সম্মান ও মর্যাদাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। আর প্রকাশ্য বাস্তবতা হলো তাদেরকে তাদের সম্মানিত অবস্থান থেকে নামিয়ে উপপত্নী, রক্ষিতা এবং সৌখিন সমাজের লালসা পূরনের জন্য উড়ন্ত প্রজাপতি বানিয়ে ছেড়েছে। ফলে তারা এখন বিলাসী পুরুষের নাগালের মধ্যে থাকা ভোগের পুতুল আর যৌন কারবারীদের ব্যবসায়ের সস্তা পণ্য। যা আড়াল করা হয়েছে শিল্প ও সংস্কৃতির মনোলোভা রঙিন পর্দা দিয়ে।
ঝ. নারী ধর্ষণের হার আমেরিকায় সর্বোচ্চ
উন্নত বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অবস্থানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্য। নৈমিত্যিক সংঘটিত নারী ধর্ষণের হার সারা বিশ্বে তার রেকর্ড কেউ স্পর্শও করতে পারবে না। ১৯৯০ সালের এফবিআই-এর দেয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী গোটা আমেরিকা জুড়ে প্রতিদিন গড়ে ১৭৫৬ টি নারী ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। পরবর্তী পর্যায়ে আরো একটি রিপোর্টে প্রকাশিত হয় যাতে প্রতিদিন সংঘটিত ধর্ষণ অপরাধে সংখ্যা ১৯০০ উল্লেখ করা হয়েছে। রিপোর্টে সন উল্লেখ করা নেই তবে অনুমান করা হয় তা ১৯৯২ বা ১৯৯৩ সালের কথা। হয়তো আমেরিকানরা পরবর্তী দু’তিন বছরে আরো ‘সাহসী’ হয়ে উঠেছে।
আবার একটা কাল্পনিক দৃর্শপট পর্যবেক্ষণ করা যাক- আমেরিকান নারী সমাজ ইসলামী হিজাব পালন করছে। যখনি কোনো পুরুষ কোনো নারীর দিকে তাকাচ্ছে, কোনো অশ্লীল চিন্তা মনে এসে যেতে পারে ভাবার সাথে সাথে সে তার দৃষ্টিকে নীচে নামিয়ে নিচ্ছে। পথে ঘাটে যেখানেই কোনো নারী দৃশ্য হচ্ছে, কব্জী পর্যন্ত তার দুটি হাত আর নেহায়েত সাদামাটা সাজগোজহীন মুখমন্ডলের কিয়দাংশ ব্যাস,বাদবাকি সব ডোলাডালা হিজাবে ডাকা। তদুপুরি রাষ্ট্রীয় বিধান এমন যে, যদি কোনো পুরুষ ধর্ষণের অপরাধ করে তার জন্য নির্দিষ্ট-জনসমক্ষে প্রকাশ্য মৃত্যুদন্ড।
এবার আপনাকে প্রশ্ন করছি, গোটা পরিবেশটা যদি সত্যি সত্যিই এমন হয় তাহলে আমেরিকার এই নারী ধর্ষণের ভঙ্ককর হার বাড়তে থাকবে না একই অবস্থানে থাকবে? নাকি কমে যাবে এবং কমতে কমতে একদিন এই জঘন্য অপরাধ নিঃশেষ হয়ে যাবে।
ঞ. ইসলামী শরীয়তের পুর্ণাঙ্গ বিধান কার্যকর হলে ধর্ষনের হার শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে খুব স্বাভাবিক ভাবেই।
কেননা শরীয়তের বিধান, মানুষেরই জন্য তাদের সৃষ্টিকর্তা বিধাতার নির্বাচিত বিধিবিধান যদি কার্যকর হয় তাহলে তার ফলাফল কল্যাণী অমিয় ধারা হযে বেরিয়ে আসতে শুরু করবে। ইসলামী শরীয়ত যদি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় পৃথিবীর যে কোনো ভূখন্ডে- তা আমেরিকাই হোক অথবা ইউরোপ বা পৃথিবীর অন্যান্য যে কোনো দেশে। তার প্রথম প্রতিক্রিয়া হবে এই যে, সে দেশের গোটা সমাজ একসাথে বুক ভরে নিঃশ্বাস নেবে।
কাজেই ‘হিজাব’ নারীকে অপদস্ত করেনি বরং উপরে তুলে সম্মানের আসন দিয়েছে। আর সংরক্ষণ করেছে তার শালীনতা ও পবিত্রতা।

৪.ইসলাম কি তলোয়ারের মাধ্যমে প্রসারিত হয়েছে ?
প্রশ্নঃ ইসলামকে কিভাবে শান্তির ধর্ম বলা যাবে যেখানে তা প্রচার ও প্রসার হয়েছে তলোয়ারের মাধ্যেমে?
জবাব
কিছু অমুসলিম এটা একটা সাধারণ অভিযোগ যে, সারা বিশ্ব জুড়ে ইসলাম এত কোটি কোটি অনুগামী পেতে পারতো না, যদি না তা- শক্তি প্রয়োগে প্রসারিত হতো। নিম্নে বর্ণিত বিষয়গুলো পরিষ্কার করে দেবে, যা তলোয়ারের মাধ্যমে প্রসারের অভিযোগ থেকে অনেক দূরে। এটা ছিল সত্যের সহজাত শক্তি, সঙ্গত কারণ ও মানব প্রকৃতি সম্মত যৌক্তিকতা যা এক দ্রুত ইসলামের প্রচার ও প্রসারের বাহন হয়েছে।
ক. ইসলাম মানে শান্তি
ইসলাম এসেছে মূল শব্দ ‘সালাম’ থেকে। যার অর্থ শান্তি। এর আরো একটি অর্থ হলো নিজের সম্পূর্ণ ইচ্ছা-শক্তিকে আল্লাহর প্রতি সমর্পিত করা। এভাবে ইসলাম একটি শান্তির ধর্ম, যা অর্জন করা যায় সৃষ্টিকর্তা বিধাতা প্রতিপালক আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছার কাছে নিজের ইচ্ছাকে আন্তরিক নিষ্ঠার সাথে সমর্পিত করে দিলে।
খ. শান্তি বজায় রাখতে কখনো কখনো শক্তি প্রয়োগ করতে হয়
পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার অনুকুলে নয়। এমন অসংখ্য মানুষ রয়েছে যারা তাদের নিজেদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য এর বিগ্ন ঘটায়। এসব ক্ষেত্রে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য শক্তি ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে পড়ে। পৃথিবীর প্রতিটি সভ্য দেশে অপরাধী ও সমাজ বিরোধদের দমন করার জন্য সুনর্দিষ্ট আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সুসজ্জিত বাহিনী আছে। যাদের আমরা ‘পুলিশ’ বলি। ইসলাম শান্তির প্রবর্তক। একই সাথে তার অনুগামীদের উদ্বুদ্ধ করে জুলুম, অত্যাচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই করতে। জালিমদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে কোনো কোনো সময় শক্তির প্রয়োগ অপরিহার্য হয়ে ওঠে। ইসলাম কেবল মাত্র মানুষের সমাজে শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষা এবং ভারসাম্যপূর্ণ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্যই শক্তি প্রয়োগের অনুমতি দেয়।
গ. ঐতিহাসিক ডি ল্যাসি ওলেরীর মন্তব্য
বিশ্ববরণ্য ঐতিহাসিক ডি ল্যাসী ওলেরী’ লিখিত “ইসলাম আট দা ক্রস রোড” গ্রন্থের অষ্টম পৃষ্ঠায় যে মন্তব্য তিনি করেছেন তাতে“তরবারীর সাহায্যে ইসলাম প্রসারিত হয়েছে” এই ভ্রান্ত ধারণায় যারা নিমজ্জিত-তাদের জন্য দাঁত ভাঙ্গা জবাব।
“অবশেষে ইতিহাসই একথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করল যে, ধর্মান্ধ মুসলমানদের কাহিনী হলো পৃথিবীর এক প্রান্ত পর্যন্ত তারা ঝেঁটিয়ে বেরিয়েছে আর বিজিত জাতিগুলোকে তরবারীর অগ্রভাগে রেখে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করেছে। এটা অনেক গুলোর মধ্যে অন্যতম একটি কল্পনা প্রসূত, উদ্ভট ও অবাস্তব কাহিনী-যা ঐতিহাসিকরা খুব বেশি পুনরাবৃত্তি করেছে”।
ঘ. মুসলমানরা আটশত বছর স্পেন শাসন করেছে
প্রায় আট’শ বছর স্পেন শাসন করেছে মুসলমানরা। সেখানে মানুষকে ‘তরবারীর শক্তি প্রয়োগ করে ধর্মান্তরিত করেছে’ -এমন কথা চরম শত্রুও বলতে লজ্জা পাবে। আর খ্রীস্টান ক্রুসেডাররা স্পেনে এসে সেই মুসলমানদেরকেই নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। অবশেষে এমন একজন মুসলমান স্পেনে ছিল না যে তার নামাযের জন্য প্রকাশ্যে আযান দিতে পারত।
ঙ. ১৪ মিলিয়ন আরব মিশরীয় খ্রীস্টান
সমগ্র আরব ভুখন্ডে এক হাজার চারশ বছর মুসলমানরাই ছিল মালিক, মনিক, শাসক। এর মধ্যে সামান্য কিছু বছর ব্রিটিশ এবং আর কিছু বছর ফরাসীরা দখলদারিত্ব করেছিল। সর্বোপরি মুসলমানরা যদি তরবারী ব্যবহার করত তাহলে একজন খ্রীস্টানও কি সেখানে এখন খুঁজে পাওয়ার কথা ?
চ. ভারতে ৮০% এর বেশি অমুসলিম
মুসলমানরা ভারত শাসন করেছে প্রায় আটশ বছর। যদি তারা চাইতো তাহলে তাদের সেই রাজ-শক্তি ও ক্ষমতার বল প্রয়োগ করে ভারতের প্রতিটি অমুসলিমকে ধর্মান্তরিত করে নিতে পারতো। অথচ শতকরা আশি ভাগেরও বেশি অমুসলিম আজো ভারতেই আছে। এদের প্রতিটি অমুসলিম আজ সুস্পষ্ট সাক্ষ্য বহন করছে যে, “ইসলাম তরবারীর সাহায্যে প্রসারিত হয়নি।”
ছ. ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া
ইন্দোনেশিয়া একটি দেশ। পৃথিবীর সর্বোচ্চ-সংখ্যক মুসলমান সেখানে বাস করে। মালয়েশিয়ায় জনসংখ্যার অধিকাংশ মুসলমান। কেউ একজন প্রশ্ন করতে পারে, কোন মুসলিম সেনাবাহিনী ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় গিয়েছিল?
জ. আফ্রিকার পূর্বপ্রান্ত
একই ভাবে ইসলাম অত্যন্ত দ্রুততার সাথে আফ্রিকার পূর্বতীরে বিকাশ লাভ করে। কেউ একজন আবারো প্রশ্ন করতে পারে, ইসলাম যদি তরবারীর অগ্রভাগ দিয়েই প্রসারিত হয়ে থাকে তাহলে আফ্রিকার পূর্বতীরে কোন মুসলিম বাহিনী তরবারী নিয়ে গিয়েছিল?
ঝ. থমাছ কারলাইল
বিশ্ববরেণ্য ঐতিহাসিক থমাস কারলাইল তার রচনা ‘হিরোয এন্ড হিরো ওরশিপ’ গ্রন্থে ইসলামের বিকশিত হওয়া নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা সেই প্রসঙ্গে বলা হয়েছে-
“তরবারী, কিন্তু কোথায় পাবে তুমি তোমার তরবারী? প্রত্যকটি নতুন ‘মত’ তার শুরুতে সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট হয়- এক জনের সংখ্যালঘুত্বে। মাত্র একজন মানুষের মাথায়। সেখানেই তা থাকে। সারা পৃথিবীর একজন মাত্র মানুষ তা বিশ্বাস করে, অর্থাৎ সকল মানুষের বিপক্ষে মাত্র একজন মানুষ। একখানা তরবারী সে নিল এবং তা দিয়ে তা (তার চিন্তা) প্রচার করতে চেষ্টা করল। তাতে তার কোনো কাজ হবে কি? তোমার তরবারী তোমাকেই খুঁজে নিতে হবে! মোট কথা একটি জিনিস নিজে নিজেই প্রচারিত হবে যেমনটা তার ক্ষমতা আছে।”
ঞ. দ্বীন নিয়ে কোন জবরদস্তী নেই
কোন তরবারী দিয়ে ইসলাম বিকশিত হয়েছে? এমনকি সে তরবারী যদি মুসলমানদের হাতেও থাকতো তাহলেও তারা তা ইসলাম প্রচারের জন্য ব্যবহার করতে পারত না কারণ তাদের হৃদয় স্পন্দন আল কুরআন বলেছেঃ
দ্বীন নিয়ে কোনো জবরদস্তি নেই। সকল ভ্রান্তি-বিভ্রান্তি ও ভ্রষ্টতা থেকে সরল-শুদ্ধ সত্য-পথ স্পষ্ট করে দেয়া আছে।
ট. জ্ঞান ও প্রজ্ঞার তরবারী
তা ছিল চেতনা ও জ্ঞানের তরবারী, যে তরবারী মানুষের হৃদয় ও মন অন্তরকে জয় করেছে। জ্যোতীর্ময় কুরআনের সূরা নাহলে বলা আছেঃ
আহবান করো সকলকে তোমার বিধাতা প্রতিপালকের পথে- পান্ডিত্যপূর্ণ সুন্দরতম বাগ্মীতার সাথে। আর যুক্তি প্রমাণ দিয়ে আলোচনা করো তাদের সাথে এমনভাবে, যা সর্বোত্তম (এবং সে আহবান হতে হবে এমন হৃদ্যতাপূর্ণ যেন কোন পাষাণ হৃদয়ের কাছেও তা গ্রহণযোগ্য হয়)। (১৬:১২৫)
ঠ. ১৯৩৪ সাল থেকে ১৯৮৪ পর্যন্ত পৃথিবীতে ধর্ম বর্ধিষ্ণুতার
১৯৮৬ সালের রীডার্স ডাইজেস্টের ‘এলমানাক’ সংখ্যার একটি তথ্য সমৃদ্ধ প্রবন্ধে- পূর্বের অর্ধ শতাব্দীতে প্রধান প্রধান ধর্মসমূহের বর্ধিষ্ণুতার হার সম্পর্কে একটি পরিসংখ্যান দেয়া হয়েছে। প্রবন্ধটি “প্লেইন ট্রুথ” মাগ্যাজিনেও প্রকাশিত হয়। সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে ইসলাম-যা বেড়েছে ২৩৫% হারে। এখানে একজন প্রশ্ন করতে পারে, কোন যুদ্ধ অবস্থান নিয়েছিল এ শতাব্দীতে যা কোটি কোটি মানুষকে ধর্মান্তরীত করে মুসলমান বানিয়েছিল?
ঢ. আমেরিকা ও ইউরোপে ‘ইসলাম’ দ্রুততম বর্ধিষ্ণু ধর্ম
আজকের দিনে আমেরিকায় দ্রুততম বর্ধিষ্ণু ধর্ম ‘ইসলাম’। মুসলমানের সংখ্যা দ্রুত গতিতে বেড়েই চলেছে ইউরোপেও। শক্তি ও বিকশিত সভ্যতার অহংকারে চীৎ হয়ে থাকা পাশ্চাত্য সভ্যতার এই সব সু-সভ্য মানুষকে এত বিরাট সংখ্যায় ইসলাম গ্রহণ করতে কোন তরবারী বাধ্য করছে?
ড. ডক্টর জোসেফ এডাম পিয়ারসন
ডক্টর জোসেফ এডাম পিয়ারসন যথার্থই বলেছেন, যারা আশঙ্কা করছে আনবিক বোমা কোনো একদিন আরবদের হাতে এসে পড়বে। তারা উপলদ্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছে যে, ইসলামী বোমা ইতিমধ্যেই ফেলে দেয়া হয়েছে। এটা পড়েছে সেদিন যেদিন মুহাম্মদ (স) জন্ম নিয়েছিলেন।

৫.মুসলমানরা মৌলবাদী এবং সন্ত্রাসী
প্রশ্নঃ মুসলমানদের অনেকেই মৌলবাদী ও সন্ত্রাসী কেন?
জবাব
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অথবা ধর্ম সম্পর্কিত কোনো আলোচনা উঠলেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এ প্রশ্নটি মুসলমানদের দিকে ছুঁড়ে মারা হয়। সুপরিকল্পিত এ প্রচার, বিরামহীনভাবে প্রচারের প্রতিটি মাধ্যম থেকে আরো অসংখ্য মিথ্যা ও ভুল তথ্য সহকারে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে চালানো হচ্ছে। কার্যত এই ধরনের ভুল তথ্য ও মিথ্যা রটনা মুসলমানদেরকে বর্বর হিসেবে চিহ্নিত করা এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বী মানুষদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার জন্যই করা হয়।
ওকলাহোমায় বোমা বিষ্ফোরনের পরে আমেরিকান প্রচার মাধ্যমের মুসলিম বিরোধী প্রচারণার একটি প্রকৃষ্ট নমুনা পাওয়া যায় গেছে। যেখানে এই আক্রমনের নেপথ্যে ‘মধ্যপ্রাচ্যের ষড়যন্ত্র’ কাজ করেছে বলে সংবাদ মাধ্যম গুলোর ঘোষনা করে দিতে এতটুকু দেরী হয়নি। অথচ মূল অপরাধী হিসেবে পরবর্তীকালে যাকে সনাক্ত করা হয়েছে সে ছিল ‘আমেরিকান সশস্ত্র বাহিনীরই একজন সৈনিক’। আসুন এবার সন্ত্রাসবাদ ও মৌলবাদের অভিযোগ দুটি পর্যালোচনা করে দেখি।
ক. মৌলবাদী শব্দটির সংজ্ঞা
মৌলবাদী এমন এক ব্যক্তি যে অনুসরণ ও আনুগত্য করে তার চিন্তা বিশ্বাসের মৌলনীতি ও শিক্ষা সমূহকে। কেই যদি ভালো ডাক্তার হতে চায় তাহলে তাকে জানতে হবে, বুঝতে হবে এবং কঠোর অনুশীলনী চালাতে হবে ঔষধের মূল কার্যকারীতার ওপর। অন্য কথায় তাকে হতে হবে ঔষধী জগতের একনিষ্ঠ মৌলবাদী। একইভাবে কেই যদি গণিতবেত্তা বা গণিতবীদ হতে চায় তাহলে তাকে জানতে হবে,বুঝতে পারতে হবে এবং একাগ্র মনোযোগে অনুশীলনী চালাতে হবে গণিতের মূল সূত্রে ওপরে। অর্থাৎ তাকে হতে হবে গণিত শাস্ত্রের মৌলবাদী। একইভাবে কেই যদি বিজ্ঞানী হতে চায় তাহলে তাকে জেনে নিতে হবে, বুঝতে হবে এবং গভীর গবেষণায় নিমগ্ন হয়ে অনুশীলনী চালাতে হবে বিজ্ঞানের মৌলতত্ত্ব ও মূল সূত্রগুলোর ওপর। অর্থাৎ তাকে হতে হবে বিজ্ঞান জগতের মৌলবাদী।
খ. সব মৌলবাদী একরকম নয়
সব মৌলবাদীর চিত্র যেমন একই তুলি দিয়ে আঁকা যাবে না। তেমনি ভালো কি মন্দ, হুট করে এরকম কোনো মন্তব্যও করা যাবে না। যে কোনো মৌলবাদীর শ্রেণী বিন্যাস নির্ভর করে তার কাজ ও সে কর্মে জগত নিয়ে। একটি মৌলবাদী ডাকাত বা চোর সমাজের জন্য ক্ষতিকর সুতরাং সে অনাকাঙ্খিত। অপরদিকে একজন মৌলবাদী চিকিৎসক সমাজের জন্য কল্যাণকর এবং শ্রদ্ধা ও সম্মানের পাত্র।
গ. একজন মৌলবাদী মুসলিম হতে পেরে আমি গর্বিত
আমি একজন মৌলবাদী মুসলিম। আল্লাহর অসীম কৃপায়-জানি, বুঝি এবং চেষ্টা করি ইসলামের মুলনীতি সমূহকে অনুশীলন করতে। আল্লাহতে সমর্পিত কোনো একজন মৌলবাদী মুসলিম আখ্যায়িত হতে আদৌ লজ্জিত হবে না। একজন মৌলবাদী মুসলিম হতে পেরে আমি গর্বিত এবং নিজেকে ধন্য মনে করি কারণ আমি জানি ইসলামের মৌলনীতি সমূহ বিশ্বমানবতার জন্য শুধুই কল্যাণকর। পৃথিবীর জন্য তা আশির্বাদ স্বরুপ। ইসলামের এমন একটি মূলনীতি খূঁজে পাওয়া যাবে না যা বিশ্বমানবতার জন্য ক্ষতিকর অথবা সামগ্রীকভাবে মানুষের স্বার্থের প্রতিকূলে।
অনেক মানুষই ইসলাম সম্পর্কে তাদের মনে অসংখ্য ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করে এবং ইসলামের কিছু কিছু শিক্ষাকে অযৌক্তিক ও অবিচারমূলক বলে আখ্যায়ীত করে। এটা ইসলাম সম্পর্কে তাদের অশূদ্ধ ও অপ্রতুল জ্ঞানের কারণে।
কেই যদি মুক্তবুদ্ধি মুক্তমন ও ন্যায়পরায়ন মনোবৃত্তি নিয়ে ইসলামের শিক্ষা সমূহকে সূক্ষ্মভাবে বিচার বিশ্লেষণ করে দেখেন, তাহলে তারপক্ষে একথা অস্বীকার করার কোনো উপায় থাকবে না যে, ইসলাম ব্যক্তির স্বতন্ত্র পর্যায়ে অথবা সমাজের সামগ্রীক পর্যায়ে -মানবতার জন্য অফুরন্ত কল্যাণের এক অমিয় ঝর্ণাধারা।
ঘ. মৌলবাদ শব্দটির আভিধানিক অর্থ
ওয়েবেষ্টারস ডিকশনারী অনুযায়ী “ফান্ডামেন্টালিজম” ছিল একটি আন্দোলনের নাম। যা বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে আমেরিকার প্রোটেস্ট্যান বাদীরা গড়ে তুলেছিল। এটা ছিল আধুনিকতাবাদীদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া এবং বাইবেলের নির্ভুল হওয়ার স্বপক্ষে কঠিন চাপ প্রয়োগ। তা শুধু বিশ্বাস ও শিক্ষার ক্ষেত্রেই নয়- সাহিত্য ও ঐতিহাসিক তথ্যাদির ক্ষেত্রেও। বাইবেলের ভাষা, আক্ষরিক অর্থেই তাদের গড় এর-এভাবে ‘মৌলবাদ’ এমনই একটি শব্দ যা প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যবহৃত হয়েছিল খ্রীস্টানদের একটি দলের জন্য যারা বিশ্বাস করতো‘বাইবেল’ কোনো ধরনের ভুল ভ্রান্তিহীন, আক্ষরিক ভাবেই আল্লাহর কথা।
অক্সফোর্ড ডিকশনারীতে বর্ণিত ‘ফান্ডামেন্টালিজম’-এর অর্থ- যে কোনো ধর্মের মৌলিক শিক্ষাসমূহকে কোনো শৈথীল্য বরদাস্ত না করে কঠোর অনুশীলন, লালন ও পালন করা। বিশেষ করে ইসলামের।
আজ যখনই কেউ ‘মৌলবাদ’ শব্দটি ব্যবহার করে তার ভাবনায় চলে আসে এমন একজন মুসলমান যে সন্ত্রাসী।
ঙ. প্রত্যেক মুসলমানের সন্ত্রাসী হওয়া কাম্য (?)
প্রত্যেক মুসলমানের সন্ত্রাসী একজন সন্ত্রাসী তো হওয়া উচিত। সন্ত্রাসী তো তাকেই বলে যে ত্রাস বা আতঙ্কের সৃষ্টি করে। যখনই কোনো ডাকাত একজন পুলিশকে দেখে- সে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। অর্থাৎ একজন পুলিশ ডাকাতের জন্য ‘সন্ত্রাসী’। এভাবেই চোর-ডাকাত,ধর্ষণকারী, বদমাশ তথা সমাজ বিরোধী সকল দুষ্কৃতকারীর জন্য একজন মুসলমানকে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী সন্ত্রাসী হতে হবে। যখনই সমাজ বিরোধী কোনো বদমাশ একজন মুসলমানকে দেখবে সে যেন আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
এ ব্যাপারে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই যে, ‘সন্ত্রাসী’ শব্দটি সাধারণভাবে ব্যবহৃত হয় এমন এক লোকের জন্য যে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি করে। কাজেই একজন সত্যিকারের মুসলমান সন্ত্রাসী হবে অপরাধীদের জন্য-নিরীহ সাধারণ জগণের নয়। বস্তুত একজন মুসলমানকে হয়ে উঠতে হবে নিরীহ জনসাধারনের সামনে শান্তি ও নিরাপত্তার অবলম্বন।
চ. একই ব্যক্তিকে একই কাজের জন্য ভিন্ন ভিন্ন নাম দেয়া হয়েছে- সন্ত্রাসী এবং দেশ প্রেমিক
ইংরেজদের গোলামী থেকে ভারত যখন স্বাধীনতা অর্জন করল তখন ভারত-মুক্তির অসংখ্য যোদ্ধা যারা গান্ধীবাদী অহিংসার পথকে সমর্থন করেনি। ব্রিটিশ সরকার তাদেরকে ‘সন্ত্রাসী’ লেবেল লাগিয়ে দিয়েছিল। সেই একই ব্যক্তিত্বদের ভারতীয়রা সম্মানিত করেছে। আর সেই একই কর্মকান্ডের কজন আখ্যা দিয়েছে ‘দেশ প্রেমিক’।
এভাবেই দুটি ভিন্ন ভিন্ন নাম দেয়া হয়েছিল একই লোকদেরকে একই কর্মকান্ডের জন্য। এক শ্রেণী যেখানে তাকে বলেছে একজন‘সন্ত্রাসী। সেখানে অন্য শ্রেণী তাকে বলেছে ‘দেশ প্রেমিক’। যারা বিশ্বাস করত ইংরেজদের অধিকার ছিল ভারত শাসন করার তারা তাদেরকে সন্ত্রাসী বলত। আর যারা বিশ্বাস করত ইংরেজদের কোনো অধিকার নেই ভারত শাসন করার, তারা তাদেরকে বলত ‘দেশ প্রেমীক’ এবং ‘মুক্তিযোদ্ধা’। কাজেই বিষয়টা হালকা করে গুরুত্বহীনভাবে দেখার কোনো উপায় নেই। কারো ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করার আগে ভালো করে শুনে নিতে হবে উভয় পক্ষের যাবতীয় বক্তব্য। অবস্থা ও প্রেক্ষিতের পর্যালোচনা করতে হবে। ব্যক্তির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে তারপর বিচার করা যেতে পারে। এবং তারপর প্রশ্ন আসবে চূড়ান্ত মন্তব্যের।
ছ. ইসলাম মানে শান্তি
ইসলাম শব্দের উৎপত্তি ‘সালাম’ থেকে। এর অর্থ শান্তি। একটা শান্তির জীবন ব্যবস্থা। যার মৌলিক নীতি সমূহ তার অনুসারীদের শিক্ষা দেয় গোটা পৃথিবীতে শান্তির শ্লোগান উচ্চকিত করতে এবং তা অর্জিত হলে তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে।
প্রতিটি মুসলিম মৌলবাদী হবে। তাকে নিষ্ঠার সাথে অনুসরণ করতে হবে শান্তির জীবন বিধান ইসলামের মৌলিক শিক্ষা সমূহের। তাকে মূর্তিমান আতঙ্ক ও সন্ত্রাসী হয়ে উঠতে হবে সমাজ বিরোধী দুষকৃতিকারীদের সামনে। যাতে সমাজে ন্যায়পরায়ণা, সুবিচার ও শান্তি-শৃঙ্খলা দিন দিন বৃদ্ধি পায়- বজায় থাকে।

৬. আমিষ খাদ্য গ্রহণ
প্রশ্নঃ একটি পশুকে হত্যা করা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত নিষ্ঠুর কাজ। তাহলে মুসলমানরা কেন এতো পশু হত্যা করে, আমিষ খাদ্য গ্রহন করে।
জবাব
‘নিরামিষবাদ” বিশ্বব্যাপী এখন একটা আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। অনেকেই এমনকি এটাকে যুক্ত করেছে ‘পশু অধিকারের’ সাথে। সন্দেহ নেই জনগণের একটি বিশাল অংশ মনে করেন মাংস ভক্ষণ এবং অন্যান্য উৎপাদিত আমিষ দ্রব্যসামগ্রী ‘পশু অধিকার’ কে হরণ করে।
ইসলাম আদেশ করে সকল সৃষ্টি জীবের প্রতি দয়া ও অনুকম্পার নীতি গ্রহণ করতে। একই সাথে ইসলাম এ বিশ্বাসও লালন করে যে, এ পৃথিবীর যাবতীয় ফুল-ফল তথা উদ্ভিদ ও পশুপাখি এবং জলজপ্রাণী, সৃষ্টিই করা হয়েছে মানুষের জন্য। এর পরের দায়িত্ব মানুষের, এসব সম্পদ ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায় সঙ্গত ভাবে ব্যবহার করা এবং আল্লাহর এই নেয়ামত (বিশেষ অনুগ্রহ) ও আমানত সমূহের যথাযথ সংরক্ষণ তাদেরই দায়িত্বের অন্তর্ভূক্ত।
এ বিতর্কের সম্ভাব্য আরো কিছু দিক পর্যালোচনা করে নেয়া যাক।
ক. একজন মুসলিম সম্পূর্ণ নিরামিষভোজীও হতে পারে
একজন মুসলমান সম্পূর্ন নিরামিষভোজী হয়েও প্রথম শ্রেণীর মুসলিম থাকতে পারেন। এটা বাধ্যতামূলক কিছু নয় যে, একজন মুসলমানকে আমিষ খাদ্য খেতেই হবে।
খ. জ্যোতির্ময় কুরআন মুসলমানদেরকে আমিষ খাবারের অনুমতি দেয়
মুসলমানদের পথ প্রদর্শক আল-কুরআনের নিম্নোদ্ধৃত আয়াত সমূহ তার প্রমান। বলা হচ্ছেঃ
হে ঈমান ধারণকারীরা! পূরণ করো তোমাদের প্রতি সকল অর্পিত দায়িত্ব। তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে (খাবার জন্য) সকল চতুষ্পদ জন্তু-অন্য কারো নামে তা জবাই করা না হয়ে থাকলে। (৫:১)
আর গৃহপালিত পশু তিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জন্য ওগুলো থেকে তোমরা উষ্ণতা পাও (গরমের পোশাক) এবং আরো অসংখ্য উপকারী জিনিষ। আর সেগুলো(গোস্ত) তোমরা খাও। (১৬:৫)
আর গৃহপালিত পশুর মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে শেখার মতো উদাহরণ। ওগুলো দেহ-অভ্যন্তর থেকে আমরা এমন কিছু উৎপাদন করি (দুধ) যা তোমরা পান করো। ওগুলোর মধ্যে অসংখ্য উপকার আছে তোমাদের জন্য আর ওগুলো (গোস্ত) তোমরা খাও। (২৩:২১)
গ. মাংস পুষ্টিকর এবং আমিষে ভরপুর
আমিষ খাদ্য প্রোটিনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উৎস। জৈবীক ভাবেই তা প্রোটিন সমৃদ্ধ। আটটি অতি প্রয়োজনীয় এমাইনো এসিড যা দেহের দ্বারা সমন্বিত হয় না। তাই খাদ্যের মাধ্যেমে তা সরবরাহ করতে হয়। মাংসের মধ্যে আরো আছে লৌহ, ভিটামিন বি-১ এবং নিয়াসিন।
ঘ. মানুষের দাঁত সব রকম খাদ্য গ্রহনে সক্ষম করে বিন্যস্ত
আপনি যদি পর্যবেক্ষণ করেন তৃণভোজী প্রাণীর দাঁতের বিন্যাষ-যেমন গরু, ছাগল, ভেড়া, হরিণ ইত্যাদি। আপনি দেখে আশ্চর্য হবেন যে,তা সব একই রকম। এসব পশুর দাঁত ভোঁতা (সমতল) যা তৃণ জাতীয় খাদ্য গ্রহণের জন্য উপযোগী। আপনি যদি লক্ষ্য করেন মাংসাশী পশুদের দন্ত বিন্যাস অর্থাৎ বাঘ, সিংহ, লিউপার্ড, শৃগাল, হায়েনা ইত্যাদি-এগুলোর দাঁত ধারালো যা মাংসের জন্য উপযোগী। মানুষের দাঁত লক্ষ্য করে দেখলে দেখা যাবে সমতলের ভোঁতা দাঁত যেমন আছে তেমনি ধারালো এবং চোখা দাঁতও আছে। অর্থাৎ মানুষের দাঁত মাংস ও তৃণ উভয় ধরনের খাদ্য গ্রহনের জন্য উপযোগী। এক কথায় ‘সর্বভূক’।
কেই হয়তো প্রশ্ন করতে পারে সর্বশক্তিমান আল্লাহ যদি চাইতেন মানুষ শুধু তরিতরকারী খাবে তাহলে আমাদের মুখে ধারালো দাঁত ক’টি দিলেন কেন? এর দ্বারা এটাই কি প্রমাণিত হয়না যে, খোদ সৃষ্টিকর্তাই চান যে, মানুষ সব ধরনের খাবার গ্রহণ করুক।
ঙ. আমিষ ও নিরামিষ দুই ধরণের খাদ্যই মানুষ হজম করতে পারে।
তৃণভোজী প্রাণির হজম প্রক্রিয়া শুধু তৃণ জাতীয় খাদ্যই হজম করতে পারে। মাংসাশী প্রাণীর হজম প্রক্রিয়া পারে শুধু মাংস হজম করতে। কিন্তু মানুষের হজম প্রক্রিয়া তৃণ ও মাংস উভয় ধরনের খাদ্যই হজম করতে সক্ষম।
সর্বশক্তিমান আল্লাহ যদি চাইতেন আমরা শুধু নিরামিষ ভক্ষণ করি তাহলে তিনি আমাদেরকে এমন হজম শক্তি দিলেন কেন যা দিয়ে তৃণ ও মাংস উভয় ধরনের খাদ্যই হজম করা যায়?
চ. হিন্দু ধর্ম-গ্রন্থ আমিষ খাদ্য গ্রহণের অনুমতি দেয়
১. অসংখ্য হিন্দু রয়েছে যারা নিষ্ঠাবান নিরামিষ ভোজি। তারা আমিষ খাদ্যকে তাদের ধর্ম বিরোধী মনে করে। অথচ আসল সত্য হলো,হিন্দু শাস্ত্রই মাংস খাবার অনুমতি দিয়েছে। গ্রন্থসমূহ উল্লেখ করেছে- পরম বিজ্ঞ সাধু-সন্তরা আমিষ খাবার গ্রহণ করতেন।
২. হিন্দুদের আইনের গ্রন্থ মনুশ্রুতি পঞ্চম অধ্যায় শ্লোক ৩০এ আছে-খাদ্য গ্রহণকারী যে খাবার খায়, সেই সব পশুর যা খাওয়া যায়,মন্দ কিছু করে না।এমনকি সে যদি তা করে দিনের পর দিন। ঈশ্বর নিজেই সৃষ্টি করেছেন কিছু ভক্ষিত হবে আর কিছু ভক্ষণ করবে।
৩. মনুশ্রুতীর পঞ্চম অধ্যায়ের ৩১শ্লোকে আবার বলা হয়েছে- যা মাংস ভক্ষণ শুদ্ধ উৎসের জন্য। ঈশ্বরের বিধান হিসেবে বংশ পরম্পরায় তা জানা আছে।
৪. এরপরে মনুশ্রুতীর পঞ্চম অধ্যায়ের ৩৯ এবং ৪০ শ্লোকে বলা হয়েছেঃ ঈশ্বর নিজেই সৃষ্টি করেছেন উৎসর্গের পশু উৎসর্গের জন্যই। সুতরাং উৎসর্গের জন্য হত্যা-হত্যা নয়।
৫. মহাভারত অনুশীলন পর্ব ৮৮ অধ্যায় বর্ণনা করছে-ধর্মরাজ যুধিষ্টির ও পিতামহ ভীষ্ম, এদের, এদের মধ্যে কথোপকথন কেউ যদি শ্রাদ্ধ করতে চায় তাহলে সে অনুষ্ঠানে কি ধরনের খাবার খাওয়ালে স্বর্গীয় পিতৃ পুরুষ (এবং মাতাগণ) সন্তুষ্ট হবেন। যুধিষ্টির বলল, হে মহাশক্তির মহাপ্রভু! কি সেই সব বস্তু সামগ্রী যাহা-যদি উৎসর্গ করা হয় তাহলে তারা প্রশান্তি লাভ করবে ? কি সেই বস্তু সামগ্রী যা (উৎসর্গ করলে) স্থায়ী হবে? কি সেই বস্তু যা (উৎসর্গ করলে) চিরস্থায়ী হবে?
ভীষ্ম বলেছেন, তাহলে শোন হে যুধিষ্টীর! কী সেই সব সামগ্রী। যারা গভীর জ্ঞান রাখে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান সম্পর্কে- যা উপযোগী শ্রাদ্ধের জন্য। আর কি সেই ফল-ফলাদি যা তার সঙ্গে যাবে। সীম বিচীর সাথে চাল, বার্লী এবং মাশা এবং পানি আর বৃক্ষমূল (আদা, আলু বা মূলা জাতীয়) তার সাথে ফলাহার। যদি স্বর্গীয় পিতৃদেবদের শ্রাদ্ধে দেয়া হয়। হে রাজা! তা হলে তারা এক মাসের জন্য সন্তুষ্ট থাকবে।
শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে মৎস সহকারে আপ্যায়ন করলে স্বর্গীয় পিতৃকুল দুই মাসের জন্য সন্তুষ্ট থাকবে। ভেড়ার মাংস সহকারে- তিন মাস। খরগোশ সহকারে চারমাস। ছাগ-মাংস সহকারে ৫ মাস। শুকর-মাংস সহকারে ছয় মাস। পাখীর মাংস দিয়ে আপ্যায়িত করলে সাত মাস। হরিণের মধ্যে ‘প্রিসাতা’ হরিণ শিকার করে খাওয়ালে আট মাস এবং ‘রুরু’ হরিণ দিলে নয় মাস। আর গাভীর মাংস দিলে দশমাস। মহিসের মাংশ দিলে তাদের সন্তুষ্টি এগারো মাস বজায় থাকে।
শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে গরুর মাংস দিয়ে আপ্যায়ন করলে, বিশেষ করে বলা হয়েছে তাদের সন্তুষ্টি থাকে পুরো এক বছর। ঘি মিশ্রিত পায়েশ, স্বর্গীয় পিতৃপুরুষের কাছে গরুর মাংসের মতোই প্রিয়। ভদ্রিনাসার (বড় ষাড়) মাংস দিয়ে আপ্যায়ন করলে পিতৃপুরুষ বার বছর সন্তুষ্ট থাকেন। পিতৃপুরুষের মৃত্যু বার্ষিকি গুলোর যে দিনটিতে সে মারা গেছে সেই রকম একটি দিন দিন যদি শুক্ল পক্ষের হয় আর তখন যদি গন্ডারের মাংস দিয়ে শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে আপ্যায়ন করা যায়- স্বর্গীয় পিতৃ পুরুষের সন্তুষ্টি অক্ষম হয়ে যায়। ‘কালাসকা’ কাঞ্চন ফুলের পাপড়ি আর লাল ছাগলের মাংস যদি দিতে পারো তাহলেও তাদের সন্তুষ্টি অক্ষয় হয়ে যাবে।
অতএব আপনি যদি চান আপনার স্বর্গীয় পিতৃপুরুষের সন্তুষ্টি অক্ষয় হয়ে যাক তাহলে লাল ছাগলের মাংস দিয়ে শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে আপ্যায়ন করতে হবে।
ছ.হিন্দু ধর্ম অন্যান্য ধর্মের দ্বারা প্রভাবিত
হিন্দু ধর্ম গ্রন্থ তার অনুসারীদের আমিষ খাদ্য গ্রহনের অনুমতি দেয়। তথাপি অনেক হিন্দু নিরামিষ ভোজনকে সংযোজন করে নিয়েছে। প্রকৃত পক্ষে এটা এসেছে ‘জৈন’ ধর্ম থেকে।
জ. উদ্ভীদেরও জীবন আছে
বিশেষ কিছু ধর্ম খাদ্য হিসেবে শুধুমাত্র নিরামিষ খাবার বাধ্যতামূলক করে নিয়েছে। কারণ তারা জীব হত্যার সম্পূর্ণ বিরোধী। যদি কেউ কোনো সৃষ্ট জীবকে হত্যা না করে বেঁচে থাকতে পারে তাহলে নির্দ্বিধায় বলতে পারি, আমি হবো প্রথম ব্যক্তি যে এধরনের জীবন যাপন পদ্ধতিকে বেছে নেবে।
অতীত কালের মানুষ মনে করত উদ্ভিদের প্রাণ নেই। অথচ আজ তা বিশ্ববাসীর কাছে দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, উদ্ভীদেরও প্রাণ আছে। কাজেই সম্পূর্ণ নিরামিষ ভোজী হয়েও জীব হত্যা না করার শর্ত পূরণ হচ্ছে না।
ঝ. উদ্ভীদ ব্যাথাও অনুভব করতে পারে
এর পরেও হয়তো নিরামিষ ভোজীরা বলবেন, প্রাণ থাকলে কি হবে উদ্ভীদ ব্যাথা অনুভব করতে পারে না। তাই পশু হত্যার চাইতে এটা তাদের কম অপরাধ। আজকের বিজ্ঞান পরিষ্কার করে দিয়েছে উদ্ভিদও ব্যাথা অনুভব করে কিন্তু তাদের সে আর্ত চিৎকার মানুষই শোনার ক্ষমতা রাখে না ২০ Herts থেকে ২০০০ Herts এর ওপরে বা নীচের কোনো শব্দ মানুষের শ্রুতি ধারণ করতে সক্ষম নয়। একটি কুকুর কিন্তু শুনতে পারে ৪০,০০০ Herts পর্যন্ত। এজন্য কুকুরের জন্য নিরব ‘হুইসেল’ বানানো হয়েছে যার ফ্রীকোয়েন্সী ২০,০০০ Herts এর বেশী এবং ৪০,০০০ Herts এর মধ্যে। এসব হুইসেল শুধু কুকুর শুনতে পারে, মানুষ পারে না। কুকুর এ হুইসেল শুনে তার মালিককে চিনে নিতে পারে এবং সে চলে আসে তার প্রভুর কাছে।
আমেরিকার এক খামারের মালিক অনেক গবেষণার পর একটি যন্ত্র আবিষ্কার করেছে যা দিয়ে উদ্ভীদের কান্না মানুষের শ্রুতিযোগ্য করে তোলা যায়। সে বিজ্ঞানী বুঝে নিতে পারত, উদ্ভীদ কখন পানির জন্য চিৎকার করত। একেবারে এখনকার গবেষণা প্রমাণ করে দিয়েছে যে, উদ্ভীদ সুখ ও দুঃখ অনুভব করতে পারে এবং পারে চিৎকার করে কাঁদতেও।
ঞ. দু’টি ইন্দ্রীয়ানুভূতী কম সম্পন্ন প্রাণীকে হত্যা করা কম অপরাধ নয়
এবার নিরামিষ ভোজীরা তর্কে অবতীর্ণ হবেন যে, উদ্ভীদের মাত্র দু’টি অথবা তিনটি অনুভূতির ইন্দ্রীয় আছে আর পশুর আছে পাঁচটি। কাজেই পশু হত্যার চাইতে উদ্ভীদ হত্যা অপরাধের দিক থেকে কম।
ধরুন এক ভাই জন্মগত ভাবেই অন্ধ ও কালো। চোখে দেখেনা কানেও শোনেনা। অর্থাৎ একজন স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় দুটি ইন্দ্রীয় তার কম। সে যখন পূর্ণ যৌবনে এসে প্বৌছাল তখন এক লোক নির্দয়ভাবে তাকে খুন করল। খুনী ধরা পড়ার পর- বিচারালয়ে দাঁড়িয়ে আপনি কি বিচারপতিকে বলবেন, মহামান্য আদালত খুনিকে আপনি পাঁচ ভাগের তিন ভাগ শাস্তি দিন?
জ্যোতীর্ময় কুরআন বলেছেঃ
হে মানুষ! পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা থেকে পবিত্র ও উত্তম (জিনিসগুলো) খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করো।
ট. গৃহপালিত পশুর সংখ্যাধিক্য
পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ যদি ফল-মূল তরিতরকারী ও শাক শব্জীকেই খাবার হিসাবে বেছে নেয় তা হলে গবাদী পশুর জন্য ভু-পৃষ্ঠ ছেড়ে দিয়ে মানুষকে অন্য কোনো গ্রহে গিয়ে বাস করতে হবে। আর খাল বিল নদী নালা ও সাগর মহাসাগর পানি শূন্য হয়ে যাবে মাছ ও অন্যান্য জ্বলজ প্রাণীর আধিক্য। কেননা উভয় শ্রেণীর জন্মের হার ও প্রবৃদ্ধি এত বেশি যে, এক শতাব্দী লাগবে না এ পৃথিবী তাদের দখলে চলে যেতে।
সুতরাং সৃষ্টিকর্তা বিধাতা প্রতিপালক আল্লাহ তা’য়ালা খুব ভালো করে জানেন এবং বোঝেন। তাঁর সৃষ্টিকুলের ভারসাম্য তিনি কিভাবে রক্ষা করবেন। কাজেই এটা খুব সহজেই অনুমেয় যে, তিনি কি কারণে আমাদেরকে মাছ মাংস খাবার অনুমতি দিয়েছেন।
{mospagebreak title= পশু জবাই করার ইসলামীপদ্ধতি- দৃশ্যতঃ নির্দয় }

৭.পশু জবাই করার ইসলামীপদ্ধতি- দৃশ্যতঃ নির্দয়
প্রশ্নঃ মুসলমানরা কেন এত ধীরে ধীরে কষ্ট দিয়ে দিয়ে নির্দয়ভাবে পশু জবাই করে?
জবাব
একটি বিরাট সংখ্যাক সমালোচনার বিষয় পশু জবাইয়ের ইসলামী পদ্ধতি। মুক্ত মনে নিচের বিষয়গুলো বিবেচনায় আনলে প্রমাণ হয়ে যাবে জবাই পদ্ধতিটি শুধু মানবিকই নয় বৈজ্ঞানিকও বটে।
ক. পশু জবাই করার ইসলামী পদ্ধতি
‘যাক্কায়াতুম’ একটি ক্রিয়া, উৎপন্ন হয়েছে মূল শব্দ ‘যাকাহ’ থেকে (পবিত্র করতে)। এর ক্রিয়া ভাব প্রকাশক ‘তায্‌কীয়াহ’। অর্থাৎ পবিত্রকরণ। ইসলামী পদ্ধতিতে একটি পশু জবাই করতে হলে নিম্নোদ্ধৃত শর্তগুলো পূরণ করতে হবে।
১. সর্বোচ্চ পর্যায়ের ধারালো অস্ত্র দিয়ে জবাই করতে হবে
অত্যন্ত ধারালো অস্ত্র দিয়ে দ্রুততার সাথে পশুটি জবাই করতে হবে যেন ওটা ব্যাথা কম পায়।
২. গলনালী, শ্বাশ নালী ও রক্তবাহী ঘাড়ের রগ কেটে ফেলতে হবে
‘যাবীহাহ্‌’ একটি আরবী শব্দ যার মানে ‘জবাই করা হয়েছে’। যবাই করতে হবে গলা, শ্বাসনালী ও ঘাড়ের রক্তবাহী রগগুলো কেটে। মেরুদন্ডের তন্ত্রী (স্পাইনাল কড) কাটা যাবে না।
৩. শরীরের রক্ত প্রবাহিত হয়ে বেরিয়ে যেতে হবে।
দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করার আগে দেহের সমস্ত রক্ত বের করে দিতে হবে। অধিকাংশ রক্ত বের করে দিতে হবে এই জন্য যে, তা ব্যাকটেরিয়া ও জীবানু ইত্যাদির নিরাপদ নিবাস ও বংশ বিস্তারের ক্ষেত্র কাজেই মেরুদন্ডের তন্ত্রী কিছুতেই কাটা যাবে না। কেননা হৃদযন্ত্রের দিকে যেসব স্নায়ু তন্তু রয়েছে সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যেতে পারে এসময়। যা হৃদপিন্ডের স্পন্দন থামিয়ে দেবার কারণ হবে। ফলে রক্ত নালীসমূহে রক্ত আটকা পড়ে যাবে।
খ. রক্ত, রোগ-জীবানু ও ব্যাকটেরিয়ার সহজ বাহন
জৈব-বিষ ব্যাকটেরিয়া ও রোগ-জীবানু ইত্যাদির সর্বোত্তম বাহক রক্ত। সুতরাং ইসলামী জবাই পদ্ধতি সাস্থ্যবিধি সম্মত। কেননা রক্ত, যার মধ্যে জৈব-বিষ, রোগ-জীবানু ও ব্যাকটেরিয়া বাসা বেধে থাকে। যা অসংখ্য রোগ ব্যাধির কারণ হয়।
গ. গোস্ত বেশি দিন ভাল থাকে
পৃথিবীতে প্রচলিত খাদ্যের জন্য পশু হত্যার মধ্যে ইসলামী পদ্ধতীতে জবাই করা পশুর মাংস বেশিদিন ভালো থাকে। কেননা তাতে রক্তের পরিমাণ থাকে নাম মাত্র।
ঘ. পশু ব্যাথা অনুভব করে না
ক্ষীপ্রতার সাথে গলনালীগুলো কেটে ফেললে মস্তিষ্কের স্নায়ুতে রক্ত প্রবাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। যে রক্ত প্রবাহ ব্যাথা বোধের কারণ। একারণে পশু ব্যাথা বোধ করে উঠতে পারে না। মৃত্যুর সময় ওটা যে ছট্‌ ফট্‌ করে তা ব্যাথার জন্য নয় বরং রক্তের ঘাটতি পড়ে যাওয়ায় মাংসপেশির শৈথিল্য ও সংকোচনের জন্য এবং দ্রুত গতিতে দেহের বাইরে যাবার কারণে।

৮.আমিষ খাদ্য মুসলমানদেরকে প্রচন্ড উগ্র বানিয়ে ফেলে
প্রশ্নঃ বিজ্ঞান আমাদের বলে, যে যা খায় তার আচরণে তার প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পায়। তাহলে ইসলাম কেন মুসলমানদেরকে আমিষ খাদ্য গ্রহণের অনুমতি দেয়। যেখানে পশুর মাংস ব্যক্তিকে হিংস্র ও দুঃসাহসী করে তুলতে পারে?
জবাব
ক. পশুর মধ্যে শুধু তৃনভোজী পশু খাওয়া অনুমোদিত
এ ব্যাপারে আমি সম্পূর্ণ একমত যে, ব্যক্তি যা আহার করে তার প্রতিক্রিয়া তার আচরণে প্রকাশ পায়। বাঘ, সিংহ, নেকড়ে ইত্যাদি হিংস্র মাংসাশী প্রাণী খাওয়া ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে- এটা তার অন্যতম একটি কারণ। এ ধরনের হিংস্র হয়ে উঠতে পারে। সে কারণে ইসলাম শুধু মাত্র গরু, মহিশ, ছাগল, ভেড়ার মতো শান্ত ও খুব সহজে পোষমানা প্রাণীর মাংস খেতে অনুমতি দেয়। বস্তুত এ কারণেই মুসলমানরা শান্তিকামী- শান্তিপ্রিয়।
খ. জ্যোতির্ময় কুরআন বলছে- যা কিছু মন্দ রাসূল তা নিষিদ্ধ করেছেন
রাসূল তাদেরকে ভালো কাজ করতে আদেশ করেন। আর নিষেধ করেন যাবতীয় মন্দ থেকে এবং তিনি তাদের জন্য হালাল করেছেন যা কিছূ ভাল, পবিত্র, পরিচ্ছন্ন। আর হারাম করেছেন যা কিছু মন্দ অপরিচ্ছন্ন অপবিত্র। (৭:১৫৭)
রাসূল তোমাদেরকে যা কিছু দেন তা তোমরা গ্রহণ করো। আর যে সব থেকে নিষেধ করেন সে সব থেকে বিরত থাকো। (৫৯-৭)
একজন মুসলমানের জন্য তাদের রাসূলের এই বার্তার যথেষ্ট যে, আল্লাহ চান না মানুষ এমন কোনো ধরনের মাংস খায়- যেখানে অন্য কিছু ধরনকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে।
গ. মাংসাশী প্রাণী খাবার ব্যাপারে রাসূল (স)-এর বাণী
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত বেশ কিছু সর্বসম্মত শুদ্ধ হাদীসের মধ্যে ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণিত মুসলিম শরীফের ‘শিকার ও জবাই’অধ্যায়ের ৪৭৫ নং হাদীসে, সুনানে ইবনে মাজাহর ১৩ অধ্যায়ের ৩২৩২ থেকে ৩২৩৪ হাদীস সমূহ উল্লেখযোগ্য। রাসূল (স) খেতে নিষেধ করেছেনঃ
১.তীক্ষ্ণ ধারালো দাঁতওয়ালা হিংস্র জন্তু। অর্থাৎ মাংসাশী বন্য পশু প্রধানত বেড়াল ও কুকুর জাতীয় বাঘ, সিংহ, বেড়াল এবং শেয়াল,কুকুর, নেকড়ে, হায়না ইত্যাদি।
২. তীক্ষ্ণ দন্ডের অন্যান্য প্রাণী যেমন ইঁদুর, ন্যাংটি ইদুর, ছুঁচো ও ধারালো নখওয়ালা খরগোশ ইত্যাদি।
৩. সরিশ্রীপ জাতীয় অন্যান্য প্রাণী যেমন সাপ কুমীর ইত্যাদি।
৪. ধারালো ঠোঁট ও নখরওয়ালা শিকারী পাখি যেমন চিল, শুকুন, কাক, পেচাঁ ইত্যাদি। সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণ করতে পারে এমন কোনো বৈজ্ঞানীক দলিল নেই যে, আমিষ খাদ্য গ্রহণের ফলে মানুষ উগ্র ও হিংস্র হয়ে উঠতে পারে।

৯. মুসলমানরা কা’বার পূজা করে
প্রশ্নঃ ইসলাম যেখানে আকার বা মূর্তি পূজাকে প্রত্যাখ্যান করে সেখানে তারা নিজেরাই কেন তাদের প্রার্থনায় কাবার প্রতি নত হয়ে তার উপাসনা করে?
জবাব
কা’বা মুসলমানদের ‘কেবলা’। মুসলমানরা তাদের প্রার্থনায় দিক নির্দেশক হিসেবে গণ্য করে। এখানে লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো,মুসলমানরা তাদের প্রার্থনায় কা’বার দিকে মুখ করে বটে তবে তারা কাবা ঘরের উপাসনা করে না। উপাসনা করে সেই ঘরের মালিক অদৃশ্য আল্লাহ তা‘আলার। জ্যোতীর্ময় কুরআনে বলা হয়েছেঃ
তোমার (নির্দেশনার জন্য) বার বার আকাশের দিকে করে তাকানো আমরা দেখেছি। এখন আমরা কি তোমাকে ঘুরিয়ে দেব সেই কেবলার দিকে যা তোমাকে সন্তুষ্ট করবে? তাহলে ঘুরিয়ে নাও তোমরা থাকনা কেন (নামাযে) তার দিকেই মুখ ফিরিয়ে নেবে।
ক. ইসলাম চূড়ান্ত ঐক্যকে উৎসাহিত করে
যেমন, মুসলমানরা যদি নামায আদায় করতে চায় তাহলে এমনটা হতেই পারে যে, কারো ইচ্ছা হবে উত্তর দিকে ফিরে নামায পড়তে,কারো ইচ্ছা হবে দক্ষিণ দিকে দিকে ফিরতে। তাই উপাসনার ক্ষেত্রেও মুসলমানদের চূড়ান্তভাবে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য যেখানেই তারা থাকনা কেন এক আল্লাহর প্রতি এক মুখী হয়ে তাদের নামায আদায় করতে বলা হয়েছে। ‘কাবা’ সেই একটি দিকের দিক-নির্দেশক,অন্য কিছুই নয়। কাবার পশ্চিমাঞ্চলে যে মুসলমানরা বাস করে তারা মুখ করবে পূর্ব দিকে আর তার পূর্বাঞ্চলে যারা বাস করে তারা মুখ করবে পশ্চিম দিকে। একইভাবে উত্তরাঞ্চলের লোকেরা দক্ষিণ দিকে আর দক্ষিণাঞ্চলের লোকেরা উত্তর দিকে।
খ. পৃথিবী গোলকের কেন্দ্রবিন্দু কা‘বা
মুসলমানরাই প্রথম পৃথিবীর মানচিত্র এঁকেছিল। তাদের চিত্রে দক্ষিণ ছিল ওপর দিকে আর উত্তর ছিল নিচের দিকে। তখন কা‘বা ছিল কেন্দ্র বিন্দুতে। পরবর্তিকালে পশ্চিমা মানচিত্রকররা পৃথিবীর যে মানচিত্র আঁকলো তাতে ওপর দিকটা নিচে আর নিচের দিকটা ওপরে অর্থাৎ উত্তর হলো ওপরের দিকে আর দক্ষিণ হলো নিচের দিকে। আলহামদুলিল্লাহ এ ক্ষেত্রেও “কাবাই মানচিত্রের কেন্দ্র বিন্দু থেকে গেল”।
গ. কা‘বাকে ঘিরে তওয়াফ করা আল্লাহর একত্বের নির্দেশক
মুসলমানরা কা’বা যেয়ারতে মক্কায় গেলে ‘তাওয়াফ’ করে। অর্থাৎ কা’বা ঘরকে কেন্দ্র করে চারিদিকে প্রদক্ষিণ করে। কাজটি এক আল্লাহ বিশ্বাস ও উপাসনার নিদর্শন। প্রতিটি বৃত্ত গোলাকার এবং তার একটিই কেন্দ্র বিন্দু থাকে। কাজেই উপাসনার যোগ্য আল্লাহ-মাত্র একজনই, এটা তারই অন্যতম নিদর্শণ।
ঘ. হযরত উমর (রা) এর হাদীস
হাজরে আসওয়াদ বা কালো পাথর সম্পর্কিত হযরত উমর (রা) এর একটি বিখ্যাত উক্তি রয়েছে। হাদীসে শাস্ত্র অনুযায়ী যাকে ‘আছার’ বা ঐতিহ্য বলা যায়। বুখারী শরীফের হজ্জ সম্পর্কিত ৩৫৬ অধ্যায়ে ৬৭৫ নং হাদীসে, উমর (রা) বলেছেন,
“আমি জানি তুমি একটি পাথরখন্ড মাত্র এবং না কোনো উপকার করতে সক্ষম না কোনো ক্ষতি। আমি যদি না দেখতাম খোদ আল্লাহর রাসূল (স) তোমাকে স্পর্শ করেছেন তা হলে কস্মিন কালেও আমি তোমাকে স্পর্শ করতাম না।”
ঙ. মানুষ কা’বা ঘরের ওপরে উঠে আযান দিয়েছিল
রাসূলুল্লাহ (স) এর সময়ে লোকেরা কা’বা ঘরের ওপরে উঠে আযান দিত। মুসলমানরা কা’বা ঘরের উপাসনা করে বলে যারা মনে করেন তাদেরকে যদি কেউ প্রশ্ন করে যে, কোন মুর্তী-পূজারী, যে মুর্তী সে পূজা করে, তার মাথার ওপরে উঠে দাঁড়ায়?
.
১০. অমুসলিমদের মক্কায় প্রবেশাধিকার নেই
প্রশ্নঃ পবিত্র মক্কা ও মদীনায় অমুসলিমদের প্রবেশাধিকার নেই কেন?
জবাব
একথা সত্য যে, আইনত মক্কা ও মদীনায় অমুসলিমদের প্রবেশানুমতি নেই। নিম্নে বর্ণিত বিষয়গুলো এই নিষিদ্ধতার নৈপথ্য কারণগুলো উদঘাটনে সহায়ক হবে।
ক. সেনানিবাস এলাকায় সকল নাগরিক প্রবেশানুমতি পায় না
আমি একজন ভারতীয় নাগরিক। তা সত্ত্বেও এদেশের এমন কিছু এলাকা আছে যেখানে আমার অবাধে প্রশোনুমতী নেই। যেমন সেনানিবাস। পৃথিবীর প্রত্যিকটি দেশই সাধারণ নাগরিক প্রবেশ করতে পারবে না এমন সব এলাকা রয়েছে। শুধু মাত্র সেনাবাহিনীর সদস্য এবং প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত বিষয়াদির সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গ সে সব এলাকায় প্রবেশানুমতি পায়।
একইভাবে ইসলাম সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য একটি বিশ্বজনীন জীবন ব্যবস্থা। মক্কা ও মদীনা এ দুটি পবিত্র নগরিকে ইসলামের ক্যান্টনমেন্ট ধরা যেতে পারে। এখানে শুধু যারা তার অনুসারী এবং এর প্রতিরক্ষার সাথে জড়িত তারাই প্রবেশানুমতি পায় অর্থাৎ মুসলমানরা।সেনানিবাস এলাকায় সাধারণ নাগরিকের প্রবেশ নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আপত্তি তোলা যে কোনো বিবেকবান মানুষের কাছেই অযৌক্তিক বলে গন্য হবে। একই ভাবে কোনো অমুসলিমের মক্কা-মদীনায় প্রশোধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলা সঙ্গত বলে বিবেচিত নয়।
খ.মক্কা ও মদীনায় প্রবেশের “ভীসা”
১. যখনি কেউ অন্য কোনো দেশে ভ্রমন করতে চায়। প্রথমে তাকে সেদেশের ভিসা পাবার জন্য আবেদন করতে হয়।অর্থাৎ সে দেশে প্রবেশের অনুমতি। প্রতিটি দেশের এ ক্ষেত্রে নিজ নিজ আইন নীতিমালা এবং কিছু শর্ত রয়েছে। এসব কিছু পূরণ না হলে তারা ভিসা দেবে না।
২. ভিসা দেবার ব্যাপারে অত্যন্ত কঠিনভাবে রক্ষণশীল দেশগুলোর মধ্যে সবার ওপরে আমেরিকা। বিশেষ ভাবে তৃতীয় বিশ্বের কোণো নাগরিককে ভিসা দেবার জন্য তাদের আছে অসংখ্য নিয়ম কানুন। আরো আছে দুর্লভ ও দুরুহ শর্তসমুহ যা সাধারণের আয়ত্বাধীন নয় কোনো ভাবেই।
৩. আমি সিঙ্গাপুর ভ্রমনে গিয়েছিলাম। তাদের অভিবাসন বা ইমিগ্রেশন ফর্মে উল্লেখ ছিল মাদক দ্রব্য বহনকারীর জন্য “মৃত্যুদন্ড”। এখন সিঙ্গাপুরে প্রবেশানুমতি চাইলে আমাকে তাদের যে আইন তা মেনেই নিতে হবে। আমি তো আর বলতে পারি না মৃত্যুদন্ড মধ্যযুগীয় নৃশংস বর্বরদের শাস্তি। তাদের সব নিয়ম-কানুন এবং শর্তগুলোকে যদি আমি মেনে নেই কেবলমাত্র তখনই আমার পক্ষে সে দেশের প্রবেশানুমতি পাওয়া সম্ভব।
৪. ভিসা-পৃথিবীর যে কোনো মানুষের জন্য মক্কা ও মদীনায় প্রবেশের অনুমতি পেতে হলে সর্ব প্রথম যে শর্তটি পুরণ করতে হবে তা হলো তার মুখে বলতে হবে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” অর্থাৎ মানা যায় এমন কেউ নেই কিছু নেই আল্লাহ ছাড়া এবং মুহাম্মাদ (সঃ) তার প্রেরিত রাসূল।

১১.শুকর মাংস নিষিদ্ধ
প্রশ্নঃ ইসলামে শুকরের মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ কেন?
জবাব
এটা সর্বজন বিদিত যে, শুকুর মাংস ভক্ষণ ইসলামে নিষিদ্ধ। এই লিংকে বর্ণিত বিষয়গুলো এই নিষিদ্ধতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরবে।

১২. মদ্যপানের নিষিদ্ধতা
প্রশ্নঃ ইসলামে মদ্যপান নিষিদ্ধ কেন?
জবাব
স্মরণাতীত কাল থেকে বিশ্বমানবতার জন্য ‘এলকোহল’ তীব্র যন্ত্রনার কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে। মদ অসংখ্য অগুনতী মানুষের অকাল মৃত্যুর কারণ এবং বিশ্ব জুড়ে কোটি কোটি মানুষের ভয়ঙ্কর দুর্দশার কারণ। মানুষের সমাজে অসংখ্য সমস্যার নেপথ্যে আসল হেতু এই ‘এলকোহল’ বা মদ। অপরাধ প্রবনতার তীব্র উর্ধগতী, ক্রমবর্ধমান মানসিক বিপর্যয় এবং কোটি কোটি ভাঙ সংসার জীবন্ত প্রমাণ বহর করছে বিশ্ব জুড়ে এলকোহলের নিরব ধ্বংসযজ্ঞের তান্ডবলীলা কি ভাবে চলছে।
বিস্তারিত প্রমাণ ও যুক্তির জন্য এই লিংকে ক্লিক করুন।

১৩. সাক্ষীদ্বয়ের সমতা

প্রশ্নঃ কেন দু’জনের সাক্ষী, যারা নারী- সমতূল্য মাত্র একজনের, যে পুরুষ ?
জবাব
ক. একজন পুরুষ সাক্ষির বিকল্প দুজন নারীর সাক্ষী সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়
সাক্ষী প্রদান প্রসঙ্গে কুরআনের কমপক্ষে তিনখানি আয়াত রয়েছে যেখানে পুরুষ ও নারীর পার্থক্য করা হয়নি।
১. উত্তরাধিকারের ওসীয়ত করার সময় সাক্ষী হিসেবে দু’জন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে।
হে ঈমানধারনকারীরা! তোমাদের মধ্যে কেউ যখন মৃত্যুর দুয়ারে পৌছায় তখন অসীয়ত করতে হলে তোমাদের মধ্য থেকে সাক্ষী রেখো। তোমাদের নিজেদের মধ্যে থেকে দু’জন ন্যায়পরায়ণ ব্যাক্তি অথবা বাইরের, যখন তোমরা এপৃথিবীর বুকে (কোথাও) সফরে আছো, আর এমন সময় মৃত্যু এসে উপস্থিত হয়েছে। (সূরা মায়েদাঃ১০৬)
২. তালাকের ক্ষেত্রে দু’জন ন্যায়পরায়ন সাক্ষীর কথা বলা হয়েছে।
এবং সাক্ষীর জন্য তোমাদের মধ্যে থেকে দুজন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিকে নাও। আর প্রতিষ্ঠিত করো এসাক্ষী শুধু আল্লাহর জন্য। (সূরা তালাকঃ২)
৩. নারীর প্রতি ব্যভিচারের অভিযোগে চারজন সাক্ষী দাড় করাতে হবে।
আর যারা পবিত্র চরিত্রের নারীদের সম্পর্কে মিথ্যা অভিযোগ আনবে। তারপর চারজন সাক্ষী উপস্থিত করতে পারবেনা (অভিযোগ প্রমানের জন্য) তাহলে তাদেরকে আশিবার বেত্রঘাত করো। আর কোনো দিন তাদের কোনো সাক্ষ্য গ্রহণ করবে না। আর এসব লোক তারাই যারা ফাসেক। (সূরা নূরঃ ৪)
খ. টাকা পয়সা লেন-দেনের ক্ষেত্রে একজন পুরুষের স্থলে দুজন নারীর সাক্ষীর প্রয়োজন
একজন পুরুষের স্থলে দুজন নারীর সাক্ষীসর্বক্ষেত্রেই প্রযোজ্য একথা সত্য নয় এর সত্যতা শুধু বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে । সাক্ষী প্রসঙ্গে কুরআনে পাঁচ খানি আয়াত আছে যেখানে নারী কিংবা পুরুষ আলাদা করে উল্লেখ করা হয়ণি। আর একজন পুরুষের স্থলে দুজন নারীর সাক্ষির কথা মাত্র একখানি আয়াতে বলা হয়েছে সূরা বাকারা ২৮২ আয়াত। আয়াত খানির বিশেষ বৈশিষ্ট হলো কুরআনের দীর্ঘতম আয়াত এবং তা ব্যাবসা ও টাকা পয়সা লেনদেন সংক্রান্ত।
হে ঈমানদারগন যদি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য তোমরা একে অপরের সাথে লেন-দেন করো। তাহলে তা লিখে নিও —অতঃপর তোমাদের নিজেদের মধ্যের দুজন পুরুষকে সাক্ষী বানাও। তখন যদি দুজন পুরুষের আয়োজন না করা যায়, তাহলে একজন পুরুষ ও যাদের সাক্ষীর ব্যাপারে তোমরা আস্থাশীল এমন দুজন নারী বেছে নাও যে একজন ভুলকরলে অন্যজন স্মরণ করিয়ে দিতে পারে। (সূরা বাকারাঃ২৮২)
এসব ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের মধ্যে একটি লিখিত চুক্তির আদেশ করা হয়েছে এবং সেখানে দুজন সাক্ষীর কথা বলা হয়েছে। আর সে দুজনই পুরুষ হতে হবে। কিন্তু যদি সে রকম আস্থভাজন দুজন পুরুষ মানুষের ব্যবস্থা না করা যায় কেবল তখন, অন্ততঃ একজন পুরুষ ও দুজন মহিলা থাকতেই হবে। এখানে একটা উদাহন প্রণিধানযোগ্য। ধরা যাক কেউ একজন তার একটি বিশেষ রোগের জন্য অপারেশন করতে মনস্থ করেছে। মোটামুটি নিশ্চিত হবার জন্য সে সমমানের দুজন শল্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিবে। কোনো কারণে যদি দুজন সার্জনের ব্যবস্থা করতে সে ব্যর্থ হয় তখন বিকল্প হিসেবে একজন সার্জন এবং দুজন সাধারণ এম বি বি এস-এর পরামর্শ গ্রহণ করল।
একইভাবে ব্যবসা ও ঋণ লেনদেনের ক্ষেত্রে দু’জন পুরুষকে সাক্ষী রাখতে বলা হয়েছে। ইসলাম চায় পরিবারের ভরণ পোষণের জন্য উপার্জনের দায়ভার পুরুষ চহন করুক। অর্ধনৈতিক দায়-দায়িত্ব যেখানে পুরুষের কাঁধে ন্যাস্ত। পৃথিবীতে প্রচলিত সাধারণ বাস্তবতাও তাই। কাজেই অর্থনৈতিক লেন-দেনে নারীর তুলনায় পুরুষই সুদক্ষ।
বিকল্প হিসেবে যে, একজন পুরুষ ও দু’জন নারীর কথা বলা হয়েছে। তার কারণও স্পষ্ট করে বলে দেয়া হয়েছে যে, একজন যদি কোনো ভুল করে তাহলে আর একজন যেন তাকে স্মরণ করিয়ে দিতে পারে। কুরআন এখানে শব্দ ব্যবহার করেছে ‘তা’দিল’ যার মানে দালগোল পাকিয়ে ফেলা। অথবা ভুল করা। অনেকেই শব্দটির তরজমা করেছেন ‘ভুলে যাওয়া’ এটা শুদ্ধ নয়। যা হোক আর্থিক লেনদেনই একমাত্র বিষয় যেখানে সাক্ষী হিসাবে একজন পুরুষের বিকল্প দু’জন নারী।
গ. হত্যা মামলার ক্ষেত্রেও সাক্ষী হিসেবে একজন পুরুষের বিকল্প দু’জন নারী
কিছু ইসলামী আইন-শাস্ত্রবীদগণের মতে, হত্যা মামলার সাক্ষী দানের ক্ষেত্রে নারীসুলভ অভিব্যক্তি প্রক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। এধরনের পরিস্থিতিতে একজন পুরুষের তুলনায় একজন নারী বেশি মাত্রায় ঘাবড়ে যেতে পারে। তার নারী সুলভ ভাবাবেগ তাকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দিতে পারে। এ কারনেই কিছু বিশেষজ্ঞ আলেম খুনের মামলায় একজন পুরুষের বিকল্প হিসেবে দু’জন নারীর সাক্ষী এই রায় দিয়েছেন। অন্য সব ব্যাপারেই একজন নারীর সাক্ষী এক জন পুরুষের সাক্ষীর সমান মূল্যমানের।
ঘ. কুরআন সুস্পষ্ট ভাবে নির্দিষ্ট করে দিয়েছে-একজন নারীর সাক্ষী একজন পুরুষের সমান
কিছু বিশেষজ্ঞ আলেম যদিও এ ব্যাপারে জোরালো মতামত দিয়েছেন যে একজন পুরুষের সাক্ষীর বিকল্প দু’জন নারীর সাক্ষী বিষয়টা সর্বক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কিন্তু নির্দ্বিধায় একথা মেনে নেয়া যায় না। কেননা খোদ কুরআনেই তা সমান করে দিয়েছে।
আর যারা তাদের স্ত্রীদের সম্পর্কে অভিযোগ তুলবে অথচ তাদের কাছে তাদের নিজেদের ছাড়া অন্যকোনো সাক্ষদাতা নেই। তাহলে তাদের একজনের সাক্ষ্যই চার বার (আল্লাহর নামে শপথ করে বললে) গ্রহণ যোগ্য হবে। (সূরা নূর ঃ ৬)
ঙ. হযরত আয়শা (রাঃ)-এর একক সাক্ষী হাদীসের বিশুদ্ধতার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য
মুসলমানদের কাছে কুরআনের পরেই নির্দেশনার জন্য মূল্যবান যে উৎস সেই হাদীস সমূহের মধ্যে হযরত আয়শা (রাঃ) বর্ণিত ২২২০ খানা হাদূস শুধু মাত্র তাঁর একক সাক্ষীর ওপরেই বিশুদ্ধতার সকল বিবেচনায় উত্তীর্ন। কাজেই ক্ষেত্র অনুযায়ী একজন নারীর সাক্ষীই যে গ্রহণ ও যোগ্য, এর জন্য আর কোনো দলিলের প্রয়োজন পড়েনা। ইসলামী আইন-শাস্ত্রবীদগণের অনেকেই এব্যাপারে একমত যে চাঁদ দেখার ব্যাপারে একজন “মো’মেনা” নারীর সাক্ষই যথেষ্ট। বিষয়টা অবশ্যই ভেবে দেখার মতো। ইসলামের একটি স্তম্ভ ‘রোযা’র কার্যকরিতার ব্যাপারে সমগ্র মুসলিম জনগোষ্ঠি একজন মাত্র নারীর সাক্ষী দানের ওপরেই নির্ভর করতে পারে।
কোন কোন ইসলামী পন্ডিত বলেছেজন, রমযানের চাঁদ দেখার জন্য একজন সাক্ষী এবং রমযানের শেষের চাঁদ অর্থাৎ ঈদের চাঁদ দেখার জন্য দু’জন সাক্ষীর প্রয়োজন। সাক্ষীগণের পুরুষ বা নারী হওয়ার ব্যাপারে কোন শর্ত নেই।
চ. কোন কোন ক্ষেত্রে মহিলার সাক্ষী অগ্রগন্য
কোন কোন ক্ষেত্রে শুধুমাত্র নারীর সাক্ষীই গ্রহণযোগ্য, সেখানে পুরুষের কোনো ভূমিকাই নেই। যেমন কেনো মহিলার মৃতদেহের গোসল করানোর সাক্ষী একজন নারীর পক্ষেই হওয়া সম্ভব।
দৃশ্যত সাক্ষীদানের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের যে বৈষম্য পরিলক্ষিত হয় তা আদৌ লিঙ্গ বৈষম্যের জন্য নয়। তা বরং ইসলামের বিবেচনায় সমাজে নারী ও পুরুসের প্রকৃতি ও ভূমিকার পার্থক্যের কারণে।

১৪.উত্তরাধীকার
প্রশ্নঃ ইসলামী আইনে উত্তরাধীকারী সম্পদে একজন নারীর অংশ একজন পুরুষের অর্ধেক কেন?
জবাব
ক. কুরআনে উত্তরাধিকার
যথাযোগ্য প্রাপকের মধ্যে উত্তরাধিকারী সম্পদ বন্টনের সুনির্দিষ্ট এবং বিস্তারিত নির্দেশনা জ্যোতীর্ময় কুরআনে বিধৃত আছে।
উত্তরাধিকার সংক্রান্ত কুরআনে আয়াত সমূহঃ
সূরা বাকারাঃ ১৮০
সূরাবাকারাঃ ২৪০
সূরানিসাঃ ৭-৯
সূরানিসাঃ ১৯
সূরানিসাঃ ৩৩
সূরামায়েদাহঃ ১০৬-১০৮
খ. আত্মীয় স্বজনের জন্য উত্তরাধিকারের সুনির্দিষ্ট অংশ
কুরআনের তিনখানি আয়াতে বিস্তারিতভাবে নিকটাত্মীয়দের অংশ বর্ননা করা হয়েছে।
তোমাদের সন্তানদের ব্যাপারে আল্লাহ তোমাদেরকে এই বিধান দিচ্ছেনঃ পুরুষের অংশ দুই নারীর সমান হবে। (উত্তরাধিকারী) যদি দুই জনের বেশি নারী হয় তাহলে সম্পদের দুই তৃতীয়াংশ দেয়া হবে। আর একজন নারী হলে মোট সম্পদে অর্ধেক পাবে। মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে তার পিতা-মাতা প্রত্যেক ছয় ভাগের এক ভাগ করে পাবে। আর সে যদি নিঃসন্তান হয় পিতা-মাতাই হয় উত্তরাধিকারী তাহলে মাকে দেয়া হবে তিন ভাগের এক ভাগ। মৃতের ভাই বোন থাকলে মা সেই ছয় ভাগের এক ভাগই পাবে। এসব বণ্টন মৃতের কোনো অসীয়ত থাকলে তা এবং ঋণ থাকলে তা আদায় করার পরে।
তোমাদের পিতা-মাতা এবং তোমাদের সন্তান-সন্ততী, তোমাদের জানা নাই এদের মধ্যে তোমাদের কল্যাণের দিক দিয়ে কারা ঘনিষ্ঠতর। এই বণ্টন ব্যবস্থা ফরয করে দেয়া হয়েছে (তোমাদের জন্য) আল্লাহর পক্ষ থেকে। আল্লাহ তো সব কিছুর ব্যাপারেই পূর্ণ অবহিত এবং মহামহীম জ্ঞানের আধার। আর তোমাদের স্ত্রীরা যা কিছু রেখে গেছে, তার অর্ধেক তোমরা পাবে যদি তারা নিঃসন্তান হয়। সন্তান থাকলে তোমরা পাবে ত্যাক্ত সম্পত্তির চারভাগের এক ভাগ- তাদের করে যাওয়া অসীয়ত এবং দেনা থাকলে তা সব আদায়ের পরে। আর (তোমরা মরে গেলে) তোমাদের রেখে যাওয়া সম্পদের তারা পাবে চার ভাগের একভাগ যদি তোমাদের কোনো সন্তান না থাকে। সন্তান থাকলে তারা পাবে আট ভাগের একভাগ। তা-ও কার্যকর হবে তোমাদের কোনো অসীয়ত এবং দেনা থাকলে তা আদায়ের পর।
আর যদি এমন কোনো পুরুষ অথবা স্ত্রীলোক (সম্পদ রেখে মারা যায়) যার না আছে কোনো সন্তান আর না আছে পিতা-মাতা। আছে এক ভাই অথবা এক বোন তাহলে তাদের প্রত্যেক (কোনো পার্থক্য ছাড়া) পাবে ছয় ভাগের এক ভাগ। আর ভাই বোন যদি দুই এর বেশি হয় তাহলে তারা সবাই মিলে মোট সম্পদের তিন ভাগের একভাগ পাবে। তা-ও কোনো অসীয়ত এবং ঋণ থাকলে তা আদায়ের পরে। কোনো ভাবেই কারো কোনো ক্ষতি করা বা হতে দেয়া যাবে না। (এসব কিছু) আল্লাহর দেয়া উপদেশ মালা। আর আল্লাহ সব কিছুর ব্যাপারেই পূর্ণ অবহিত এবং পরম ধৈর্য্যশীল। (সূরা নিসাঃ ১১-১২)
.
তারা আপনার কাছে ফতোয়া জানতে চায়। বলুন, আল্লাহ তোমাদেরকে ফতোয়া দিচ্ছেন- নিঃসন্তান ও পিতৃ-মাতৃহীন মৃত ব্যক্তির সম্পদ বণ্টন সম্পর্কে। যদি এমন ব্যক্তি মারা যায়, যার কোনো সন্তান নেই, আছে এক বোন। তাহলে সে (বোন) পাবে সম্পদের অর্ধেক আর যদি (এরকম কোনো) বোন মারা যায় তাহলে ভাই পুরো সম্পদের উত্তরাধিকারী হবে। মৃতের উত্তরাধীকারী যদি দুই বোন হয় তাহলে ত্যাক্ত সম্পত্তির তিন ভাগের দুই ভাগের দুই ভাগ তারা পাবে। আর যদি কয়েকজন ভাই বোন হয় তাহলে পুরুষের অংশ নারীর অংশের দু’জনার সমান।
আল্লাহ (এই সব জটিল বিষয়গুলো খুলে) স্পষ্ট করে দিচ্ছেন তোমাদের জন্য যেন তোমরা বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে না যাও। প্রত্যেকটি জিনিস সম্পর্কেই আল্লাহ পূর্ণ অবহিত। (সূরা নিসাঃ১৭৬)
গ. প্রতিপক্ষ পুরুষের তুলনায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারী সমান অথবা বেশির অধিকারী হয়
অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারী অধিকারী হয় প্রতিপক্ষ পুরুষের অর্ধেক। যাই হোক এটা কিন্তু সর্বক্ষেত্রে নয়। মৃত ব্যক্তি এমন, যার পিতা-মাতও নেই, পুত্র কন্যাও নেই। আছে বৈপিত্রীয় ভাই ও বোন। এদের প্রত্যেকে এক ষষ্টমাংশ করে পাবে।
মৃতের পুত্র কন্যা থাকলে মাত-পিতা উভয়ে এক ষষ্টমাংশ করে পাবে। ক্ষেত্র বিশেষে নারী উত্তরাধিকার হয় পুরুষে দ্বিগুন। মৃত যদি একজন নারী হয় যার না কোনো সন্তান আছে ভাই বোন, আছে স্বামী এবং মা ও বাবা। এখানে মৃত্যের স্বামী পাবে অর্ধেক সম্পদ এবং পাবে এক তৃতীয়াংশ বাবা পাবে এক ষষ্টমাংশ। বিশেষ এই ক্ষেত্রটিতে বাবার তুলনায় মা দ্বিগুন পাচ্ছে।
ঘ. নারী সাধারণত পুরুষের অর্ধেক অংশের উত্তরাধিকারী হয়
১. পুত্র যতটুকু উত্তরাধিকারী হয় কন্যা তার অর্ধেক।
২.মৃতের কোনো সন্তান না-থাকলে স্বামী চারের এক অংশ এবং স্ত্রী আটের এক অংশ।
৩.মৃতের সন্তান থাকলে স্বামী দুইয়ের এক অংশ স্ত্রী চারের এক অংশ।
৪.যদি মৃতের পিতা-মাতা অথবা সন্তান না থাকে তাহলে ভাই যা পাবে বোন পাবে তার অর্ধেক।
ঙ. পুরুষ নারীর চাইতে দ্বিগুন সম্পদের উত্তরাধিকারী হয়, কারণ সে পরিবারের আর্থিক প্রয়োজনের যোগানদাতা।
ইসলাম নারীর ওপরে কোনো আর্থিক বাধ্যবাধকতা এবং অর্থনৈতিক দায়দায়িত্ব নেই যা পুরুষের কাঁধে ন্যাস্ত আছে। যে কোনো মেয়ের বিয়ের আগে পর্যন্ত থাকা, খাওয়া, কাপড়-চোপড় এবং অন্যান্য আর্থিক প্রয়োজনের যোগানদাতা তার বাবা অথবা ভাই। বিবাহের পরে এসব দায়িত্ব স্বামীর অথবা পুত্রের। ইসলাম পুরুষের ওপরই তার পরিবারের আর্থিক প্রয়োজন পূরণের দায়-দায়িত্ব চাপিয়ে দ্বিগুণ অংশ দেয়া হয়েছে।
উদাহরণ স্বরুপ এক পুত্র ও এক কন্যা এবং নগদ এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা রেখে এক লোকমারা গেল। এখন উত্তরাধিকার বণ্টনে পুত্র মালিক হলো পূর্ণ এক লক্ষ টাকার আর কন্যা পেলো মাত্র পঞ্চাশ হাজার টাকা। কিন্তু পরিবারে যাবতীয় আর্থিক প্রয়োজন পূরণের দায় এখন পুত্রের ঘাড়ে। সে সব প্রয়োজন পূরণে পুত্রকে প্রায়সব টাকাই ব্যায় করে ফেলতে হচেছ। অথবা ধরা যাক প্রায় আশি হাজার টাকা ব্যায় করে এখন তার কাছে আছে মাত্র বিশ হাজার টাকা। অপরদিকে কন্যা যে পেয়েছে পঞ্চাশ হাজার টাকা তা থেকে কারো জন্য একটি পয়সা খরচ করার কোনো দায়-দায়িত্ব তার ওপরে নেই এবং সে বাধ্যও নয়। অর্থাৎ সম্পূর্ণ টাকাটাই তার কাছে গচ্ছিত আছে।
এখন আশি-নব্বই এমন কি পুরোটাই প্রয়োজণে ব্যয় করতে হতে পারে এমন ঝুকির মুখে, এক লক্ষ টাকা আর একটি পয়সারও কোনো দায়-দায়িত্ব নেই এমনভাবে সংরক্ষিত পঞ্চাশ হাজার টাকা-কে কোনটা নিতে চাইবেণ?

১৫. কুরআন কি আক্ষরিক অর্থেই আল্লাহর কথা ?
প্রশ্নঃ কিভাবে আপনি প্রমাণ করবেন আক্ষরিক অর্থেই কুরআন আল্লাহর কথা?
জবাব
ইন্টারনেটে পাওয়া যায়নি বলে এখানে দেয়া হলো না। তবে আই, আর, এফ কর্তপক্ষ এর কলের সম্পর্কে ধারণা দিযেছে য, কমপক্ষে পাঁচ পৃষ্ঠা হবে এই একটি প্রশ্নের জবাব। আমরাও ইনশাআল্লাহ আগামী সংস্করণে তা সংযোযন করতে পারবো বলে আশা রাখি।

১৬. পরকাল-মৃত্যুর পরবর্তী জীবন
প্রশ্নঃ কিভাবে প্রমাণ করবেন, পরকালের অস্তিত্ব অর্থাৎ ‘মরনের পরে আবার একটি স্থায়ী জীবন আছে’?
জবাব
ক. পরকালে আস্থা অন্ধ বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়
অনেকেই আশ্চার্য হয়ে যান, বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিসম্মত প্রকৃতির কোনো মানুষ কিভাবে পরকাল বা মৃত্যু পরে আর একটি জীবনের ওপরে আস্থা রাখতে পারে? তারা ধারণা করে যে, যারা পরকালে আস্থাশীল তাদের যে আস্থা, তা একটি অন্ধ বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
পরকালে আমার আস্থা সঙ্গত যুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত।
খ. ‘পরকাল’ একটি যৌক্তিক বিশ্বাস
বৈজ্ঞানিক বিষয়াদি নিয়ে জ্যোতির্ময় কুরআনঅন্তত হাজারের ওপরে আয়াত ধারণ করে আছে (এ প্রসঙ্গে বই কুরআন ও আধুনিক বিজ্ঞান সুসঙ্গত অথবা অসঙ্গত) বিগত কয়েক শতাব্দীতে কুরআন বর্ণিত বিজ্ঞানের অসংখ্য বিষয় সত্যায়িত হয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞান এখনও সে পর্যায়ে গিয়ে পৌছায়নি যাতে কুরআন বির্ণিত প্রতিটি বিষয়কে সত্যায়ীত করতে পারে।
যদি কুরআন বর্ণিত বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব সমূহের ৮০% ইতিমধ্যে শতকরা একশ ভাগ সত্যতা নিয়ে প্রমাণিত হয়ে থাকে। বাকি থাকলো মাত্র ২০% ভাগ, যে সব সম্পর্কে বিজ্ঞানের কাছে সুস্পষ্ট কোনো বক্তব্য নেই। যেখানে বিজ্ঞানই এখন পর্যন্ত সে পর্যায়ে পৌছায়নি যাতে কুরআনের এসব বর্ণনাকে সত্য বা মিথ্যা বলে প্রমাণ করতে পারে। কাজেই আমাদের সীমাবদ্ধ জ্ঞান নিয়ে আমরা নিশ্চিত করে ঐ ২০% ভাগ অনুদঘাটিত সত্যাসত্যের এমন কি একটি আয়াতও ভুল একথা বলতে পারিনা।
তাই কুরআনের ৮০% ভাগ যেখানে চূড়ান্তভাবে সত্য বলে প্রমাণিত এবং বাকি ২০% ভাগ শুধু প্রমাণের অপেক্ষায়। সেখানে যৌক্তিতা এটাই বলবে যে, ঐ ২০% ভাগও সময়ে সত্য বলেই প্রমাণিত হবে। কুরআনে বর্নিত পরকালীন স্থায়ী জীবনের বিষয়টি ঐ ২০% ভাগের অন্তর্ভূক্ত, অনুদ্‌ঘাটিত একটি সত্য। যৌক্তিতা এখানে তার সত্যতার দিকেই মত দেবে।
গ. ‘পরকাল দর্শণ’ ছাড়া শাস্তি ও মানবীক মূল্যবোধসমূহ সম্পূর্ণ অর্থহীন
ডাকাতি করা ভাল না মন্দ কাজ? ভারসাম্যপূর্ণ সাধারন একজন মানুষও বলবেন, এটা জঘন্য কাজ্‌ পরকালের ভালো-মন্দ যে বিশ্বাস করে না সে কেমন করে একজন শক্তিশালী ও প্রভাবশালী অপরাধীকে বোঝাবে যে, ডাকাতি একটি জঘন্য অপরাধ?
ধরা যাক, পৃথিবীতে আমি একজন শক্তিশালী অপরাধী , একই সাথে আমি একজন বুদ্ধিমান ও যুক্তি পরায়ন মানুষ। আমি বলব ডাকাতি একটি ভালো কাজ কেননা এটা আমাকে বিলাস বহুল জীবন যাপন করার সহায়তা করছে- তাই ডাকাতি আমার জন্য ভালো।
যদি কেউ আমার সামনে উপযুক্ত একটি যুক্তিও দাঁড় করিয়ে দেখাতে পারে যে, ডাকাতি আমার জন্য মন্দ কেন? তাহলে সাথে সাথে একাজ আমি ছেড়ে দেব। মানুষ সাধারণত যে সব যুক্তি সামনে রাখে।
১.কেউ হয়তো বলবে যার সর্বস্ব ডাকাতি হয়ে গেছে সে সে সমস্যায় পড়বে
আমি অবশ্যই তারা সাথে একমত যে, যার ওপর ডাকাতি চালানো হয়েছে তার জন্য এটা মন্দ। কিন্তু এটা আমার জন্য তো ভালো। আমি যদি হাজার ডলার ডাকাতি করে থাকি তাহলে অত্যন্ত আনন্দের সাথে কোনো পাঁচতারা হোটেলে দু’চারবেলা খাবার খেতে পারবো।
২.তোমার ওপরেও কেউ ডাকতি চালাতে পারে
কেউ হয়তো বলবেন একদিন আমার সর্বস্বও ডাকাতি হয়ে যেতে পারে। আমার কাছে থেকে কেউ কিছু কেড়ে নিতে পারবে না। কারন আমি নিজেই অনেক শক্তিশলী।অন্তত শ’খানেক বডিগার্ড আছে আমার । ডাকাতি আমি করি আমার ঘরে কে ডাকাতি করবে?
একজন সাধারণ মানুষের জন্য ডাকাতি একটা ঝুঁকিপূর্ণ পেশা হতে পারে কিন্তু আমার মতো প্রভাবশালী মানুষের জন্য নয়।
৩.পুলিশ তোমাকে গ্রেফতার করতে পারে
কেউ হয়তো বলবেন পুলিশ তোমাকে একদিন ধরে ফেলবে। পুলিশ আমাকে ধরবে না। কারণ পুলিশকে আমি রীতিমতো টাকা দেই। এমনকি শক্তিশালী এক মন্ত্রীকেও আমি বড় বড় চাঁদা দেই। হাঁ এ ব্যাপারে আমি একমত যে, একজন সাধারন মানুষ ডাকাতি করলে সে ধরা পড়ে যেতে পারে এবং তার জন্য সে অবস্থা অত্যন্ত ভয়ংকর হয়ে যাবে। কিন্তু আমার তো এধরণের কোনো ভয়ই নেই। ধরা পড়লেও সাথে সাথে আমি মুক্ত হয়ে যাবে এ গ্যারান্টি আমার আছে।
যুত্তিপূর্ন একটা কারণ কেউ আমাকে দেখাক-কেন এটা আমার জন্য মন্দ এবং কেনই বা এ পেশা আমি ছেড়ে দেব।
৪.কেউ হয়তো বলবেন এটা ফাঁকা পয়সা, কষ্টার্জিত নয়
আমি তার সাথে সম্পুর্ন একমত- এটা খুব সহজে উপার্জিত টাকা। মূলত এটাই তো আসল কারণ যে জন্য আমে ডাকাতি করি। যদি কোনো মানুষের সামনে উপার্জনের দু’টো পথ খোলা থাকে-একটা সহজ আর একটা কঠিন-বুদ্ধিমান যে কোনো মানুষ সহজ পথটাকেই তো বেছে নেবে।
৫. এটা মানবতা বিরোধী
কেউ হয়তো বলবেন এটা মানবতা বিরোধী মানুষের জন্য মানুষের ভাবা উচিৎ। আমি তাদের কাছে পাল্টা প্রশ্ন করব। মানবতার এ বিধান কে লিখেছে? কেন আমি তা মানতে যাব? এ আইন হতে পারে আবেগ প্রবন অনুভুতিশীল মানুষের জন্য ভালো। কিন্তু আমি সঙ্গত যুক্তি ছাড়া কিছুই মানতে রাজি না- মানুষের ভাবনা আমি ভাবতে যাবো কোন দুঃখে?
৬. এটা চরম স্বার্থপরতা
কেউ হয়তো বলবেন ডাকাতি একটি চরম স্বার্থপরতা। হাঁ একথা মানি, ডাকাতি একটা স্বার্থপর কাজ । তাহলে আমি কি এমার স্বার্থ দেখব না? এটাতো আমাকে আমার জীবন ভোগের উপায় করে দিয়েছে!
১.যুক্তি দিয়ে ডাকাতিকে মন্দ প্রমাণ করা যাবে না
অতঃপর ডাকাতিকে মন্দ কাজ হিসেবে প্রমাণ করার সকল যুক্তি উপস্থাপন ব্যর্থ ও অকার্যকর প্রমানিত হলো। এসব যুক্তির কথা একজন সাধারণ মানুষকে সন্তুষ্ট করতে পারে কিন্তু আমার মতো একজন সবল প্রভাবশালী অপরাধীকে নয়। কোনো বিতর্কই শুধুমাত্র যুত্তির ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনা। কাজেই পৃথিবী জুড়ে অসংখ্য অপরাধীর জয়জয়কারে অবাক হবারও কিছু নেই।
একইভাবে প্রতারণা, নারীধর্ষণ ইত্যাদি আমার মতো ব্যক্তির জন্য ভালো হিসেবেই বিবেচিত হবে এবং যৌক্তিতার দিক দিয়ে এমন কোনো কারণ নেই যা আমাকে বোঝাতে পারে যে, এসব কাজ মন্দ।
২. একজন শক্তিধর প্রভাবশালী অপারাধীকেএকজন মুসলিম বুঝিয়ে নমনীয় করতে পারে
এবার একটু অন্যভাবে দেখা যাক। ধরুন আপনি এ পৃথিবীর একজন শক্তিশালী প্রভাবশালী অপরাধী। পুলিশ আপনার বগল তলে। এমনকি দু’চারজন মন্ত্র-মিনিষ্টারও হাতের মুঠোয়। বহু চেলা চাতুন্ডা রয়েছে আপনাকে পাহারা দেবার জন্য আর আমি একজন মুসলিম যে আপনাকে বোঝাতে সক্ষম হবো- ডাকাতি ধর্ষণ, প্রতারণা ইত্যাদি জঘন্য কাজ।
এখন আমি যদি একই যুক্তিতর্ক তার সামনে রাখি একইভাবে সে উত্তর দেবে যেমনটা আগে সে দিয়েছে। একথা সত্যি যে, অপরাদী অত্যন্ত যুক্তিবাদীএবং তার সকল যুক্তি সঠিক। কিন্তু তা কেবল কতখানি সত্য ও সঠিক যখন সে একজন শক্তি ও প্রভাবশালী অপরাধী।
৩. প্রতিটি মানুষ ন্যায় ও সুবিচারের আকাঙ্ক্ষি
এমনকি এ সুবিচার যদি সে অপরের জন্য না চায়-নিজের জন্য তা অবশ্যই আশা করে। শক্তি ও প্রভাবের কারণে অনেকে নেশা করে আর অন্যদের দুঃখ কষ্টের কারণ হয়। এই একই মানুষ ফোঁস করে উঠবে যদি তাদের প্রতি কোনো অবিচার হয়। এধরনের মানুষের অণ্যের দুঃ-কষ্টের প্রতি কোনো অনুভূতি না থাকার কারণে তারা ক্ষমতা ও প্রভাবের পূজা করে। এই ক্ষমতা ও প্রভাবের জন্য তারা যে শুধু অন্যের ওপরে অবিচার করতে পারছে তা-ই নয় বরং অন্যে যাতে তাদের প্রতি এই একই আচারণ না করতে পারে তার প্রতিরোধও করছে।
৪. আল্লাহ মহাশক্তিমান এবং ন্যায়পরায়ণ
একজন মুসলমান হিসেবে আমি অপরাধিকে আল্লাহর অস্তিত্ত্ব সম্পর্কে সম্মত করাব যে, এই আল্লাহ তোমার চাইতে অনেক অনেক বেশি শক্তির অধিকারী এবং একই সাথে তিনি ন্যায়পরায়ণও। জ্যেতির্ময় কুরআণ বলছেঃ
নিশ্চয়ই আল্লাহ অবিচার করেন না (কারো প্রতি) বিন্দু পরিমাণ।
৫. আল্লাহ আমাকে কেন শাস্তি দিচ্ছেন না?
অপরাধী, যুক্তিবাদী এবং বিজ্ঞান মনস্ক হবার কারণে কুরআনের বিজ্ঞান ও উত্তমতম ও যুক্তিসঙ্গত দলিল প্রমাণ উপস্থাপনের পরে আল্লাহর অস্তিত্ত্বের ব্যাপারে তার কোন আপত্তি থাকল না। এখন সে হয়তো প্রমাণ করে বসবে যে, আল্লাহ শক্তিমান এবং সুবিচারক হওয়া সত্ত্বেও তাকে কেন শাস্তি দিচ্ছেন না।
৬. যারা অবিচার করে তাদের শাস্তি হওয়া দরকার
প্রতিটি মানুষ, যে কোনো অবিচারের শিকার হয়েছে- তা আর্থিক দিক থেকেই হোক অধবা সামাজিক দিক থেকে- ভূক্তবোগী প্রতিটি মানুষ চাইবে জালিমের শাস্তি হোক। প্রতিটি সাধারণ মানুষের আন্তরিক কামনা, ডাকাত-ধর্ষককে উচিত শিক্ষা দেয়া হোক। যদিও অসংখ্য অপরাধি ধরাও পড়ছে, শাস্তিও পাচ্ছে কিন্তু তার চাইতে আরো অনেক বেশি পরিমাণ মুক্ত থেকে সমাজে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে নিজের ফূর্তিময় বিলাসপূর্ন জীবন যাপন করছে। যদি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তির ওপর অবিচার আপতিত হয় এমন একজনের দ্বারা যে তার চাইতেও বেশি শক্তিধর। তখন এই অপরাধিও চাইবে যে, তার প্রতি অবিচারকারীর চরম শাস্তি হোক।
৭. এই জীবন পরকালীন স্থায়ী জীবনের জন্য পরীক্ষার অবকাশ মাত্র
পরকালের অনন্ত জীবনে কৃতকার্যতার সাথে প্রবেশের ছাড়পত্র পাওয়ার জন্য জীবনটা একটা পরীক্ষা।জ্যোতির্ময় কুরআন বলছেঃ
যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, যেন তিনি পরীক্ষা করে দেখতে পারেন কাজে-কর্মে তোমাদের মধ্যে কে সর্বোত্তম। তিনি তো মহাশক্তিমান ক্ষমা দানকারী। (সূরা আল-মুলকঃ২)
৮. চূড়ান্ত ফয়সালা শেষ বিচার দিনে
প্রতিটি প্রানকেই মৃত্যুর যাতনা ভোগ করতে হবে এবং অবশ্যই পুরোপুরি ভাবে বুঝিয়ে দেয়া হবে তাদের পাওনা কেয়ামতের দিন। তখন যে রক্ষা পেলো আগুন থেকে এবং প্রবেশ করতে দেয়া হলো জান্নাতে নিশ্চিতভাবে সে-ই লাভ করলো চূড়ান্ত সফলতা। আর কিছুই নয় এই পৃথিবীর জীবন, শুধু (ক্ষনিকের ) মায়া ও মোহময় আয়োজন। (সূরা আল ইমরানঃ১৮৫)
ভালো মন্দের সবকিছু পরিমাপ করে দেখানো হবে শেষ বিচার দিনে। একজন মানুষের মৃত্যুর পরে তাকে পুনরায় জীবিত করা হবে সর্বকালের সকল মানুষের সাথে শেষ বিচার দিনে। এটা খুবই সম্ভব যে, একজন মানুষ তার প্রাপ্য শান্তির কিছু অংশ এই পৃথিবীতে পেলো। আর চূড়ান্ত শাস্তি অথবা পুরস্কার সে পাবে পরকালে।বিধাতা প্রতিপালক একজন ডাকাত বা একজন ধর্ষককে পৃথিবীতেই কোনো শাস্তি নাও দিতে পারেন, কিন্তু শেষ বিচার দিনে তাকে অবশ্যই সব কৃতকার্যের হিসেব দিতে হবে এবং সেই স্থায়ী পরকালে তাকে শাস্তি ভোগ করতে হবে। অর্থাৎ মৃত্যুর পরে যে জীবন সেই জীবনে।
৯. মানুষের আইন হিটলারকে কি শাস্তি দিতে পারে?
হিটলার তার ভয়ঙ্কর ত্রাসের শাসনামলে ৬০ লক্ষ ইহুদিকে পুড়িয়ে মেরেছে। এখন পুলিশ যদি তাকে গ্রেফতার করতো তাহলে মানুষের আইন ন্যায়সঙ্গত ভাবে তাকে কি শাস্তি দিত? সর্বোচ্চ শাস্তি তারা তাকে যা দিতে পারত তাহলো সেই গ্যাস চেম্বারে খোদ হিটলারকে ঢুকিয়ে দিতে পারত। কিন্তু তাতে তো শুধুমাত্র একজন ইহুদী হত্যার প্রতিশোধ হতো! বাকি যে ৫৯ লক্ষ ৯৯হাজার ৯শ ৯৯জন ইহুদী -তাদের হত্যার প্রতিশোধ কিভাবে হবে?
১০. শুধুমাত্র আল্লাহ পারেন হিটলারকে জাহান্নামে ফেলে ষাটলক্ষ বারের চাইতেও বেশি বার জ্বালাতে
জ্যোতর্ময় কুরআনে আল্লাহ বলেছেনঃ
যারা আমাদের আয়াতসমূহ প্রত্যাখ্যান করেছে খুব শিঘ্রই আমরা তাদেরকে আগুনে নিক্ষেপ করব। তাদের চামড়া যখন পুড়ে গলে যাবে তখন তার বদলে আমরা তাদেরকে নতুন চামড়া দিয়ে দিব যেন তারা আযাবের স্বাদ বুঝতে পারে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ মহা শক্তিমান মহাজ্ঞানী। (৪:৫৬)
পরকালের অনন্ত জীবনে হিটরারকে একমাত্র আল্লাহই পারেন ষাট লক্ষ বার পুড়ে মরার স্বাদ কেমন তা বুঝিয়ে দিতে।
১১. মানবীয় মূল্যবোধ অথবা ভালো ও মন্দের ধারনা-পরকালের নিশ্চিত আস্থা ছাড়া আদৌ কোনো মূল্য রাখে না
যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই করা সত্য এই যে, পরকালে যার দৃঢ় আস্থা নেই, মানবীয় মূল্যবোধ এবং ভালো ও মন্দ কাজের পরিণতি এমন ব্যাক্তির কাছে প্রমাণ করা সম্পূর্ন অসম্ভব-এখানে যে অবিচার , জুলুম অত্যাচার করেই যাচ্ছে। বিশেষ করে যদি সে ক্ষমতাবান হয়।

১৭. মুসলমানেরা এতভাগে বিভক্ত কেন? চিন্তাধারার বিভিন্নতার কারণ কি?
প্রশ্নঃ মুসলমানের যেখানে এক এবং একই কুরআনের অনুসারী তাহলে মুসলমানদের মধ্যে এত বিভক্তি এবং চিন্তাদারার এত বিভিন্নতা কেন?
জবাব
ক. মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ থাকা উচিৎ
এটা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে, আজকের মুলমান নিজেদের মধ্যেই অসংখ্য ভাগে বিভক্ত হয়ে আছে। আর তার চাইতেও দুঃখজনক হলো এই বিভক্তি খোদ ইসলামের দ্বারা আদৌ স্বীকৃত নয়। ইসলাম বিশ্বাস করে তার অনুসারীদের মধ্যে ঐক্য এবং একতার লালন করতে। জ্যোতির্ময়ী কুরআন বলছেঃ
এবং আকড়ে ধরো দৃঢ়তার সাথে সবাই মিলে আল্লাহর রজ্জুকে (যা তিনি ঝুলিয়ে রেখেছেন তোমাদের জন্য কুরআনের আকারে) এবং নিজেরা বিভক্ত হয়ে যেও না।
এ আয়াতে যে রজ্জুর কাথা বলা হয়েছে সে রজ্জু কি বা কোন রজ্জু? জ্যোতীর্ময় কুরআন, মহাবিজ্ঞান আল কুরআনই সেই আল্লাহর রজ্জু যা সকল মুসলমানের সম্মিলিতভাবে ধরে রাখা উচিত। ঐক্যের ব্যাপারে দ্বিগুন গুরুত্ব দেয় হয়েছে। অর্থাৎ সবাই মিলে শক্ত করে ধরো বলার সাথে সাথেই বলা হয়েছে বিভক্ত হয়ো না।
কুরআন আরো বলছেঃ
আনুগত্য করো আল্লাহর এবং আনুগত্য করো রাসূলের। (৪:৫৯)
সকল মুসলমানের কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদূসসমূহ অনুসরণ করা কর্তব্য এবং নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হওয়া উচিত নয়।
খ. ফের্কাবাজী ও বিভক্তি ইসলামে নিষিদ্ধ
জ্যোতির্ময় কুরআন বলছেঃ
যারা নিজেদের দ্বীনকে খন্ড খন্ড করে দিয়েছে এবং দলে দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে তাদের সাথে তোমার এতটুকু সম্পর্ক নেই। তাদের এসব ব্যাপার আল্লাহ কাছে ন্যাস্ত। অবশেষে তাদেরকে তিনি বলে দেবেন সেই সব সম্পর্কে যেসব কাজ তারা করছিল। (সূরা আনআমঃ১৫৯)
এ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, তাদের থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে যারা তাদের দ্বীনকে বিভক্ত করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে গেছে।
কিন্তু কেউ যখন কোনো মুসলমানকে জিজ্ঞেস করে তুমি কে? সাধারণ উত্তর হলো, আমি একজন সুন্নি অধবা আমি শিয়া। অনেকেই নিজেদেরকে হানাফী অথবা শা’ফী অথবা মালেকী অথবা হাম্বলী ইত্যাদি হিসেবে পরিচিত হতে গর্ববোধ করেন। কেউ আবার দেওবন্দী। কেউ ব্রেলোভী।
গ. আমাদের রাসূল ছিলেন একজন ‘মুসলিম’
এ ধরনের একজন মুসলমানকে কেউ যদি প্রশ্ন করে আমাদের প্রিয় নবী (সঃ) কি ছিলেন? তিনি ছিলেন একজন মুসলিম। তাঁর পূর্বে আগত আল্লাহর সকল নবী ও রাসূলগণের মতো।
যেমন সূরা নিসা ৫২ নং আয়াতে বলা হয়েছে-ঈসা (আ) ছিলেন একজন মুসলিম। ৬৭ আয়াতে বলা হয়েছে- ইব্রাহীম না ইহুদী ছিল না খ্রীষ্টান, সে ছিল একজন মুসলমান।
ঘ. কুরআন বলছে নিজেদেরকে মুসলিম বলে পরিচয় দাও
কেউ পরিচয় জানতে চাইলে তার বলা উচিত আমি একজন মুসলিম।
আর কে হতে পারে বক্তব্যে তার চাইতে উত্তম? যে (মানুষকে) আল্লাহর পথে আহ্‌বান করে আর যাবতীয় জীবন কর্ম যেভাবে আল্লাহ করতে বলেছেন সেভাবে করে এবং বলে আমি তো আল্লাহতে সমর্পিতদের একজন (মুসলিম)। (৪১:৩৩)
কুরআন বলে আমি তাদেরই একজন যারা আল্লাহতে সমর্পিত। অন্য কথায় বলো, আমি একজন মুসলিম।
২. রাসূলুল্লাহ (স) অমুসলিম রাজা বাদশাহদের কাছে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে চিঠি লিখেছিলেন। সেই সব চিঠিতে তিনি সুরা আলে ইমরানের এই আয়াত উল্লেখ করেছিলেন।
তাহলে বলে দিন ওদেরকে তোমরা সাক্ষী থাকো একথার যে আমরা (কিন্তু) সর্বান্তকরনে আল্লাহতে আত্মসর্ম্পনকারী ‘মুসলিম’। (৩:৬৪)
ঙ. ইসলামের মহান ইমামগণের প্রতি শ্রদ্দা ও সম্মান
ইসললামের ইতিহাসে মহান ইমাম ও আলেমগনের প্রতি আমাদের সম্মানবোধ আন্তরিক হতে হবে। তাঁদের জীবন নিংড়ানো জ্ঞান সাধনা মুসলিম জাতিকে জ্ঞান সম্পদে সম্পদশালী করেছে। নিঃসন্দেহে আল্লাহর দরবারে তাঁরা পুরুষকৃত হবেন। সাধারণের মধ্যে কিউ যদি বিশেষ কোনো ইমামের রীতি পদ্ধতি অনুসরণ করেন, সেটা অবশ্যই দোষের কিছু নয়। কিন্তু সেটি যেন অন্ধভাবে না হয়। যেমনটা করতে তাঁরা কেউ বলে জাননি। নবী রাসূলগনের মতো তাঁরাও ছিলেন শুধুমাত্র আল্লাহতে সমর্পিত মুসলিম। কাজেই তাঁদের কারো অনুসারী হলেই পরিচয় বদলে যায় না। মুসলমানদের পরিচয় একটাই তারা মুসলিম।
অনেকেই হয়তো তাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংকীর্ণ মানসিকতাকে চাপা দেবার জন্য সুনানে আবু দাউদে বর্নিত ৪৫৭৯ নং হাদীস খানি নিয়ে তর্কে লাফিয়ে পড়বেন। যা রাসূল (স) বলেছেন, আমার উম্মত ৭৩টি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়বে।
কিন্তু এ হাদীসখানি রাসূল (স) তাঁর উম্মতের অধঃপতনের চূড়ান্ত পর্যায়ে যেসব বিকৃতি দেখা দেবে তারই অন্যতম একটি আগাম বার্তা বহন করছে। তিনি তো একথা বলেননি। যে মুসলমানরা এভাবে ফের্কায় ফের্কায় ভাগ হয়ে যেতে হবে।
কুরআন যেখানে আমাদেরকে আদেশ করছে কোনো বিভক্তির সৃষ্টি করা যাবে না। অতএব যারা কুরআন ও শুদ্ধ হাদিস সমূহের একনিষ্ঠ অনুসারী এবং কোনো ধরনের বিচ্ছিন্নতার না কারণ হয় না কাউকে উৎসাহিত করে তারাই সঠিক পথে রয়েছেন।
তিরমিযির ১৭১ নং হাদীসে বলা হয়েছে রাসূল (স) বলেছেনঃ আমার উম্মত ৭৩ ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়বে। এর মধ্যে শুধু একটি ছাড়া বাদ বাকি সব জাহান্নামী হবে। সাহবায়ে কেরাম জানতে চাইলেন ইয়া রাসূলুল্লাহ সেই শুদ্ধ দল কোনটি হবে? রাসূল (স) বললেন, “যাদের কাছে আমি এবং আমার সঙ্গী সাথীরা অনুসরণীয় হবো।
“আনুগত্য করো আল্লাহর এবং আনুগত্য করো রাসূলের” কুরআনের বহু জায়গায় এই একটি কথা মুসলমানদের মনের মধ্যে স্থায়ী ভাবে বসিয়ে দেবার জন্য নানান ভাবে বলে দেয়া হয়েছে। কাজেই একজন মুসলমানের অনুস্মরনীয় আদর্শ হচ্ছে কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদীস। তারপর এ দুয়ের নির্দেশনা সমূহকে অনুশীলনীর পদ্ধতি হিসেবে সে যদি কোনো বিশেষ আলেমকে অনুসরণ করতে চায় তাতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু তা যদি আবার কোনো এক পর্যায়ে গিয়ে খোদ কুরআন ও হাদীসের বিরুদ্ধে চলে যায় তাহলে তা যত বড় বিশেষজ্ঞ আলেমই হোকনা কেন্ দুই কড়ি মূল্য রাখেন না।
প্রতিটি মুসলমান যদি তার সামর্থ অনুযায়ী কুরআন বুঝে পড়ার অনুশীলনী করে এবং সেখান থেকে পাওয়া মূলনীতিসমূহ খোদ রাসূল (স) এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি অনুযায়ী বাস্তবায়নের চেষ্টা করে তাহলে ইনশাআল্লাহ একদিন এই বিভক্তি দূর হয়ে যাবে এবং আমরা ঐক্যবদ্ধ শক্তিশালী এক ‘উম্মাহ’ হয়ে আত্মপ্রকাশকরতে সমক্ষ হবো।

১৮. সকল ধর্মই তো ভালো ও কল্যাণের শিক্ষা দেয় তাহলে শুধু ইসলামেরই অনুসরণ করতে হবে কেন?
প্রশ্নঃ সকল ধর্মই মুলত তার অনুসারীদেরকে ভালো ভালো কাজ করতে শিক্ষা দেয়। তা হলে শুধু ইসলামকে অনুসরণ করতে বলা হচ্ছে কেন? যে কোনো একটি ধর্ম অনুসরণ করলে সমস্যা কোথায়?
জবাব
ক. অন্যান্য ধর্মের সাথে ইসলামের মৌলিক পার্থক্য
মুলত প্রতিটি ধর্মই মানুষকে মন্দ দূর করে ভাল হবার পরামর্শ দেয়। কিন্তু ইসলামের পরিধি আরো ব্যাপক। ইসলাম আমাদেরকে ন্যায়-পরায়নতা অর্জনের প্রকৃতিসম্মত পথ ও পদ্ধতি দেখিয়ে দেয় কিভাবে ব্যক্তি ও সমাজ জীবন থেকে যাবতীয় মন্দ নির্মূল করা যায়। ইসলাম মানুষের স্বভাব প্রকৃতি ও সমাজের চিন্তা ভাবনা ও রুচি অভিরুচিকে বিবেচনায় রাখে। ইসলাম খোদ সৃষ্টিকর্তা বিধাতা প্রতিপালক আল্লাহ তা‘আলার দেয়া মানুষের জীবন যাপন পদ্ধতির দিক নির্দেশিকা। এ কারণে ইসলামকে ‘দ্বীনুল ফিৎরাহ’ বা মানুষের প্রকৃতি সম্মত জীবন ব্যবস্থাও বলা হয়।
খ. যেমন ইসলামে আমাদেরকে চুরি, ডাকাতি পরিহার করতে বলার সাথে সাথে সে এ ও বলে দেয় যে, কেমন করে সমাজ থেকে এ প্রবনতা নির্মূল করা যাবে।
১. বড় বড় সব ধর্মই শিক্ষা দেয় চুরি ডাকাতি মন্দ কাজ ইসলামের শিক্ষাও তাই। তাহলে অন্য ধর্মের সাথে ইসলামের পার্থক্য কোথায়?পার্থক্যটা হলো চুরি ডাকাতি মন্দ কাজ এ শিক্ষার সাথে সাথে ইসলাম এমন একটি সামাজিক অবকাঠামো নির্মাণের বাস্তব পদ্ধতি নির্দেশ করে যে সমাজে চুরি ডাকাতির প্রয়োজনই পড়বে না।
২. মানুষের অভাব দুর করতে ইসলাম যাকতের বিধান দিয়েছে।
ইসলাম বিধান দিয়েছে এমন ব্যক্তির জন্য যাকাতি বাধ্যতাম্যলক যার নিসাব পরিমান উদ্ধৃত্ত তাকে। অর্থাৎ বাৎসরিক আয় ব্যায়ের পরে ৮৫ গ্রাম সোনা বা এর সমমূল্যের নগদ অর্থ অথবা অন্যান্য মাল পত্র উদ্ধৃত্ত থাকবে। ২.৫% বা শতকারা আড়াই টাকা প্রতি চন্দ্র বৎসরের শেষে তাকে (অভাবগ্রস্তদের দিয়ে দিতে হবে)। পৃথিবীর প্রতিটি সম্পদশালী ব্যক্তি যদি সত্যি সত্যিই এই যাকাত আদায় করে তাহলে দারিদ্রতা বলতে পৃথিবীতে কিছু থাকবে না। তখন ভিক্ষা দিতেও একজন ভিখারী খুজে পাওয়া যাবে না। (এই হলো ইসলামী অর্থনীতির মাত্র একটি কার্যক্রম। শুধুমাত্র এই যাকাত ব্যাবস্থাটুকু কার্যকর হলে হাত পাতার লোক খুঁজে পেতে হবে।)
৩. চুরি ডাকাতির শাস্তি হাত কেটে ফেলা
চোর ডাকাত প্রমাণিত হলে তার হাত কেটে ফেলার আদেশ দিয়েছে ইসলাম। জ্যোতীর্ময় কুরআন বলছেঃ
চোর অথবা চোরনী, তোমরা তাদের হাত কেটে দাও এটাই শাস্তি যে কর্ম তারা করেছে তার দৃষ্টান্তমূলক (দেয়া) আল্লাহর তরফ থেকে। আর আল্লাহ মহা মক্তিমান জ্ঞানপূর্ন।(সূরা মায়েদাহঃ৩৮)
৪. ইসলামী বিধি বিধান প্রতিষ্ঠিত হলে তার কল্যানী ফলাফল হাতে হাতে পাওয়া যায়
আমেরিকা পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর মধ্যে উন্নততম। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে চুরি, ডাকাতি ও অন্যান্য অপরাধের ক্ষেত্রে তার আছে সর্বোচ্চ রেকর্ড। এহেন আমেরিকায় যদি ইসলামের পূর্নাঙ্গ বিধান প্রতিষ্ঠিত হয়- একদিকে প্রতিটি সার্মথ্যবান ব্যক্তি রীতিমতো যাকাত আদায় করছে অপর দিকে নারী বা পুরুষ চোর প্রমাণিত হলে তার শাস্তি হাত কেটে ফেলা। তাহলে আমেরিকায় চুরি, ডাকাতির বর্তমান প্রবণতা বাড়বে, না একই রকম থাকবে, নাকি একেবারে কমে যাবে? সঙ্গত ভাবেই তা কমে যাবে।তদুপরি এই ধরনের কঠিন আইন থাকলে অনেক স্বভাবের চোরও নিজেকে এই ভয়ঙ্কর পরিণতি থেকে রক্ষা করতে চেষ্টা করবে। অর্থাৎ চুরি ডাকাতি প্রায় বিলুপ্ত।
একথা মানতেই হবে যে, পৃথিবীব্যাপী চুরি ডাকাতির বর্তমান যে হার তাতে হাত কাটা আইন চালু হলে লক্ষ লক্ষ লোক এমন দেখা যাবে যাদের হাত কাটা। বিষয়টা হলো যে মুহুর্তে এই আইন ঘোষনা করা হবে তার পরের মুহুর্ত থেকেই এ প্রবণতা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে কমে আসতে থাকবে। পেশাদারী চোরও এ পথে পা ফেলার আগে একবার ভেবে নেবে ধরা পড়লে তার পরিনতি কি হবে। শাস্তির ভয়াবহতাই চোরের ইচ্ছাকে দমন করার জন্য যথেষ্ট। তখন নিতান্ত দুরাত্মা ও দুর্ভাগা ছাড়া এ কাজ আর কেউ করবে না সামান্য কয়েকটি লোকের হয়তো হাত কাটা যাবে কিন্তু কোটি কোটি মানুষ লাভ করবে নিরাপত্তা, শান্তি এবং সর্বস্ব হারাবার ভয় থেকে মুক্তি।
ইসলামী বিধান এই রকম বাস্তবধর্মী এবং প্রত্যক্ষবাবে ফলদায়ক
গ. যেমন ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে নারী ধর্ষণ ও উৎপীড়ন। সাথে সাথে কার্যকর করতে বলেছে নারী ও পুরুষের পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদা রক্ষায় উভয়ের কঠোরভাবে পালনীয় হিজাব বা পর্দা এবং সাব্যস্ত ধর্ষকের শাস্তি মৃত্যুদন্ড।
১. ধর্ষণ ও উৎপীড়নের শেকড় শুদ্ধ নির্মূল করার পরামর্শ দিয়েছে
বড় বড় সকল ধর্ম নারী ধর্ষণ ও উৎপীড়ন জঘন্য অপরাধবলে ঘোষণা করে। ইসলামের শিক্ষাও তাই। তাহলে কি পার্থক্য ইসলাম ও অন্যান্য ধর্মের? পার্থক্যের বিষয়টা হলে ইসলাম শুধুমাত্র নারী মর্যাদার ওয়াজই করেনা বা ধর্ষণ ও উৎপীড়ণকে ঘৃনার সাথে জঘন্য অপরাধ হিসেবে পরিত্যাগ করতেই বলে না। সাথে সাথে সুস্পস্ট নির্দেশনাও দেয় কিভাবে সমাজ থেকে এই অপরাধ সম্পূর্ন বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
২.পুরুষের পর্দা
হিজাব বা পর্দা ইসলামের একটি বিধান। জ্যোতির্ময় কুরআন প্রথম উল্লেখ করেছে পুরুষের পর্দা। তারপরে তা নারীর জন্য।
(হে রাসূল!) মোমেন পুরুষদের বলোঃ তারা যেন নিজেদের চোখকে বাঁচিয়ে চলে। এবং নিজেদের লজ্জাস্থান সমূহ হেফাজত তরে। এটা তাদের আরো পবিত্র হয়ে ওঠার জন্য অত্যন্ত কার্যকর। (তাদের চরিত্র নির্মাণের জন্য) যা কিছুই তারা করে অবশ্য অবশ্যই আল্লাহ সে সব কিছু সম্পর্কেই খবর রাখবেন। (সূরা নূরঃ ৩০)
যে মুহুর্তে একটি পুরুষ একজন নারীর প্রতি দৃষ্টিপাত করলো যদি কোনো ধরনের অশ্লিল চিন্তা মাথায় এসে যায় এই ভয়ে সাথে সাথে তার দৃষ্টি নামিয়ে নেবে।
৩. নারীর পর্দা
কুরআন নারীর পর্দা সম্পর্কে এভাবে বরেছেঃ
আর (হে নবী) মোমেন স্ত্রীলোকদের বলুন! তারা যেন নিজেদের চোখ অবনত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থান সমূহের যথাযথ সংরক্ষণ করে। আর যেন প্রদর্শনী না করে তাদের রুপ-সৌন্দর্য ও অলংকারের। তবে এ সবের মধ্যে যা অনিবার্যভাবে প্রকাশ পেয়ে যায়। আর তারা যেন ঝুলিয়ে দেয় তাদের ওড়না তাদের বুকের ওপর। আর তারা প্রকাশ করবে না তাদের রুপ-সৌন্দর্য তাদের স্বামী অথবা তাদের পিতা অথবা তাদের স্বামীদের পিতা (শ্বশুর) অথবা তাদের পুত্র।(সূরা নূরঃ৩১)
নারীর জন্য হিজাবের পরিধি তার সম্পূর্ণ দেহ আর্বত থাকতে হবে ঢিলেঢালা কাপড়ে। শুধু কব্জী পর্যন্ত হাত এবং মুখ মন্ডল খোলা থাকতে পারে যদি তারা চায়, তা না হলে তাও ঢেকে নিতে পারে। অনেক ইসলামী বিশেষজ্ঞ মুখমন্ডল ঢাকারও পরামর্শ দেন।
৪. হিজাব উৎপীড়ন থেকে রক্ষা করে
নারীকে কেন আল্লাহ হিজাব ধারণ করতে বরেছেন কুরআনে তা এভাবে বলা হয়েছে
হে নবী! আপনার স্ত্রীগণ ও কন্যাগণ এবং ঈমান গ্রহণকারী নারীদেরকে বলে দিন তারা যেন ঝুলিয়ে দেয়া তাদের নিজেদের ওপর তাদের বড় চাগর জাতীয় কিছু (যখন বাইরে যাবে)। এটা তাদের পরিচিতির জন্য ন্যুনতম (পোষাক) তাহলে তারা আর উৎপীড়িত হবে না। আর আল্লাহ তো আছেনই ক্ষমা দানকারী দয়াময়। (সূরা আহযাবঃ ৫৯)
কুরআন বলে, নারীকে এই কারণে হিজাব পড়তে বলা হয়েছে যেন তারা রুচিশিলা মহিলা হিসাবে পরিচিত হয়। এটা তাদেরকে উৎপীড়ন থেকে রক্ষা করবে।
ধর্ষণের সর্বোচ্চ রেকর্ড
আমেরিকায় ১৯৯০ সালে এফ, বি, আই এর রিপোর্ট অনুযায়ী ১,০২,৫৫৫ টি ধর্ষনের ঘটনা ঘঠেছে। মন্তব্যে বলা হয়েছে আনুমানিক সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ ঘটনার অভিযোগ করা হয়। তাহলে সত্যিকারের পরিমাণ বের করতে হলে ৬.২৫ দিয়ে গুন করতে হবে দাঁড়ালো ৬,৪০,৯৬৮ এ সংখ্যাকে ৩৬৫ দিয়ে ভাগ করলে প্রতিদিন ১৭৫৬ টি ধর্ষণের ঘটনা আমেরিকায় ঘটছে।
আমেরিকার ডিপার্টমেন্ট অব জ্যাস্টিস এর ন্যাশানাল ক্রাইম ভিকটিমাইজেশন সারভে ব্যুরো অব জাস্টিস এর রিপোর্ট অনুযায়ী ১৯৯৬ সালে ৩,০৭,০০০ ধর্ষণের অভিযোগ রেকর্ড করা হয়েছে। তারপর বলা হয়েছে সংঘটিত ঘটনার সর্বোচ্চ ৩১ শতাংশ অভিযোগ দায়ের করা হয়, তাহলে ৩,০৭,০০০ * ৩,২২৬ =৯,৯০,৩২২ টি ধর্ষনের ঘটনা ১৯৯৬ সালে ঘটেছে। প্রতিদিন ২৭১৩ অর্থাৎ প্রতি ৩২ সেকেন্ড পৃথিবীর সভ্যতম দেশে একজন নারী ধর্ষিত হয়। ১৯৯০ থেকে ১৯৯৬ এর এই পার্থক্য লক্ষ্য করার মতো। মনে হয় আমেরিকার ধর্ষকরা দিন দিন শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
এফ , বি, আই এর রিপের্টে বলা হয়েছে মাত্র ১০ শতাংশ ঘটনার অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়। অর্থাৎ সংঘটিত ঘটনার মাত্র ১.৬% ভাগ। এদিকে অভিযুক্তদের ৫০ শতাংশ বিচারের আগেই বেরিয়ে যায়। তার মানে ০.৮% ভাগ ধর্ষক বিচারের সম্মুখীন হয়। অন্য কথায় কোনো ধর্ষক ১২৫ জন নারীকে ধর্ষণ করলে এর মধ্যে তার ধরা পড়া শাস্তি পাওয়ার সম্ভাবনা মাত্র একবার। অনেক ধর্ষণকারী পুরুষ এটাকে একটা নিশ্চিন্ত বাজী ও জুয়ার মতো ধরে নিতে পারে। কেননা ১২৫ বারে ধরা পড়ে শাস্তি পাওয়ার সম্ভাবনা মাত্র একবার।
রিপোর্টে আরো বলা হয় ০.৮ শতাংশের যারা বিচারের সম্মুখীন হয় তাদরে ৫০% শতাংশেই এক বছরের কম, কারা ভোগ করে। যদিও আমেরিকার আইনে তার বিধান আছে ৭ বছরের। ধর্ষনের দায়ে প্রতিবার ধরা পড়লে বিচারকরা তাদের প্রতি কোমল দন্ডের রায় দেন। ভেবে দেখার মতো বিষয় বটে! একজন ধর্ষক ১২৫ বার ধর্ষণ করলে, ধরা পড়র সম্ভাবনা মাত্র একবার। আর ধরা পড়লে শাস্তির সম্ভাবনা মাত্র কয়েক মাস।
ঘ. মানবীয় সমস্যায় ইসলামের সমাধান বাস্তব মুখী
ইসলাম মানুষের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ জীবন্তযাপন পদ্ধতি। কেননা এর শিক্ষা অকার্যকর তত্ত্বাগত বাগাড়ম্বর নয় বরং মানুষের যাবতীয় সমস্যার নগদ ও বাস্তব সমাধান। স্বতন্ত্র ব্যক্তি ও সমাজিক সমস্যা, উভয় ক্ষেত্রেই ইসলামে প্রত্যক্ষ ফলাফর অর্জন করে। ইসলাম একারণেও শ্রেষ্ঠতম জীবন পদ্ধতি যে, এটা বাস্তব সম্মত বিশ্বজনীন ধর্ম। কোনো জাতি অথবা জাতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

১৯. ইসলাম আজকের মুসলমানদের মধ্যে আকাশ ও পাতালের পার্থক্য
প্রশ্নঃ ইসলাম যদি শ্রেষ্ঠতম ধর্ম হয় তাহলে অসংখ্য মুসলমান কেন এত অসৎ অবিশ্বস্ত এবং অপরাধ জগতের সাথে এমনভাবে জড়িত ?
জবাব
ক. প্রচার মাধ্যম
১. ইসলাম শ্রেষ্ঠতম ধর্ম এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। কিন্তু প্রচার মাধ্যমগুলো সব পশ্চিমাদের হাতে- যারা ইসলামকে ভয় পায়। বিরামহীন ভাবে ওদের প্রচার যন্ত্রগুলো ইসলামের বিরুদ্ধে প্রচার করে যাচ্ছে এবং ছেপে যাচ্ছে। হয় তারা ভুল তথ্য দিচ্ছে অথবা ভুল তত্ত্ব নিচ্ছে অথবা ইসলামের আংশিক সত্যকে বিরাট করে তুলে ধরছে।
২. পৃথিবীর কোথাও কোনো বোমা ফাটলে কোনো তথ্য প্রমাণ ছাড়াই এর দায় মুসলমানদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হবে। এটাই হবে সংবাদের শিরোনাম। পরবর্তীতে যদি খুঁজে পাওয়া যায় যে, কোনো অমুসলিম এর জন্য দায়ি-তখন সে সংবাদটা আর উল্লেখ করার মতো খবর থাকবে না।
৩. পঞ্চাশ বছর বয়সী কোনো মুসলিম যদি ১৫ বছরের এক যুবতীকে তার সম্মতিক্রমেও বিবাহ করে তা চলে আসবে পত্রিকার প্রথম পাতায়। অথচ পঞ্চাশ বছরের কোনো অমুসলিম যদি ছয় বছরের কোনো ধর্ষণও করে তাহলে সেটা হয় যাবে ভেতরের পাতার অনুল্লেখযোগ্য কোনো খবরের মতো। আমেরিকায় প্রতিদিন ২৭১৩ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, কিন্তু প্রচার মাধ্যমের জন্য এটা আদৌ কোনো খবর নয়। যে কোনো সময় যে কোনো নারী কোনো দুর্বৃত্তের দ্বারা ধর্ষিত হতে পারে- এটা বোধ হয় আমেরিকান নারীদের জন্য একটা রোমাঞ্চকর অনুভূতি।
খ. কালো ভেড়া সব পালেই আছে
এটা আমাদের ভালো করেই জানা আছে যে, কিছু মুসলিম অসৎ, চরিত্রহীন, প্রতারক ইত্যাদি। কিন্তু প্রচার মাধ্যম তা এমনভাবে প্রচার করে যে, এ ধরনের কাজ শুধু মুসলমানরাই করে। সমাজের কলঙ্ক সব সমাজেই আছে।
গ. সামগ্রীকভাবে মুসলমানরাই শ্রেষ্ঠ
মুসলিম সমাজে এসব কলঙ্কিত লোকজন থাকা সত্ত্বেও পৃথিবীর বুকে মুসলমানরাই শ্রেষ্ঠ সমাজের অধিকারী। সামগ্রীকভাবে আমরাই“নেশামুক্ত” বৃহত্তর সমাজ। যৌথভাবে আমরা এমন একটি সমাজ যারা পৃথিবীতে সবচাইতে বেশি দান-দক্ষীনা করে থাকি। সামগ্রীকভাবে পৃথিবীতে এমন কোনো সমাজ নেই যেটা মুসলমানদের সাথে একটু তুলনা করে দেখাতে পারে, যেখানে মানবীয় মর্যদাবোধ, সংযম,সহনশীলতা, মূল্যবোদ এবং নীতি-নৈতিকতা ও স্বভাব-চরিত্র ইত্যাদির প্রশ্ন ওঠে।
ঘ . একটি গাড়িকে তার ড্রাইভার দিয়ে বিচার করবেন না
‘মার্সিডিস্‌’ কোম্পানীর নতুন বেরিয়ে আসা লেটেস্ট মডেলের একটি গাড়ী যদি আপনি দেখে নিতে চান এবং চালকের আসনে এমন একজন লোককে বসিয়ে দিলেন যে ভালো ড্রাইভিং জানেনা। সে যদি ওটাকে নিয়ে দুম করে কোথাও লাগিয়ে দেয় তাহলে আপনি কাকে দোষ দেবেন- গাড়ীটিকে না ড্রাইভারকে!
গাড়িটি সম্পর্কে জানার জন্য আপনার উচিৎ ছিল ওটার ক্যাটালগ ও ম্যানুয়েল নিয়ে একজন বিশেষজ্ঞের সামনে বসে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব জেনে নেয়া। চলার ধরন, গতী, জালানী খরচ, দুর্ঘটনা কবলিত হলে তা থেকে সুরক্ষার জন্য কি কি ব্যাবস্থা নেয়া হয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। ড্রাইভারকে দিয়ে গাড়ীর আসল মূল্যমান যাচাই করা যায় না। টাকার জোরে অনেক কোটিপতির ছেলে বিশ্বসেরা কোম্পানীর গাড়ি কিনে দু’দিনেই বারোটা বাজিয়ে ছেড়ে দেয়।
একইভাবে জন্মগতভাবে পাওয়া ইসলাম নিয়ে আজকের মুসলমানরা যা করছে তাতে তার বাহ্যিক অবয়ব দুমড়ে মুচড়ে এমন ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করেছে যা দেখে নতুন কোনো ক্রেতা দু’পা এগোলে দশ পা পিছিয়ে যায়-একথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। কিন্তু একজন মানুষ হিসেবে যিনি জীবনের পথটা সুন্দরভাবে পাড়ি দিয়ে সঠিক গন্তব্যে নির্বিঘ্ন পৌঁছাপতে চান তাকে তো সর্বোত্তম গাড়িটি খুঁজে বের করতেই হবে এবং গ্রহণ করতে হবে গাড়ি চেনার সঠিক পদ্ধতি, অর্থাৎ তার ম্যানুয়াল ও ক্যাটালগ ধরে বিশেষজ্ঞের কাছে থেকে বিস্তারিত জেনে নিতে হবে।
খোদ সৃষ্টিকর্তা বিধাতা প্রতিপালক আল্লাহ তা’য়ালা রচিত মানব-জীবন ম্যানুয়েল, ‘আলকুরআন’ এবং তাঁরই নির্বাচিত শ্রেষ্টতম নমুনা-মানুষ মুহাম্মদ (স) নির্মিত ক্যাটালগ বিশুদ্ধ হাদীস সমূহ ইসলামকে চেনা ও জানার একামত্র মাধ্যম।
ঙ. ইসলামকে বিচার করতে হবে তার বাস্ত- বায়নকারী মুহাম্মাদ (স)- এর মাধ্যমে। বিশ্ববরণ্য মুসলিম ঐতিহাসিকগণের পাশাপাশি কিছু অমুসলিম ঐতিহাসিক রয়েছেন যারা কোনো প্রভাবে প্রভাবিত না হযে নিতান্ত সততার সাথে মানবেতিহাসের সেবা করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম মাইকেল এইচ হার্ট তার রচিত ‘দি হানড্রেড’ গ্রন্থে মানবেতিহাসের শ্রেষ্ঠতম মানুষ হিসেবে এক নম্বর দিয়ে প্রথমেই যার নামটি লিখেছেন, তিনি মুহাম্মদ (স) । থমাস কার্লাইল এবং লা-মর্টিন এর মতো ব্যক্তিত্বগণও তাদের রচনায় ইসলামের নবী ও রাসূল মুহাম্মাদ (স)-এর প্রতি প্রভুত সম্মান প্রদর্শন করেছেন।

২০. অমুসলিমদের কাফের বলা
প্রশ্নঃ মুসলমানরা কেন অমুসলিমদের কাফের বলে?
জবাব
কাফের মানে যে প্রত্যাখ্যান করে
কাফের শব্দটি মূল শব্দ ‘কুফর’ থেকে উৎপন্ন। যার মানে গোপন করা, আড়াল করা, অথবা প্রত্যাখ্যান করা। ইসলামী পরিভাষায় কাফের বলা হয় সেই লোককে যে ইসলামের মহাসত্যকে গোপন করে, আড়াল করে বা প্রত্যাখ্যান করে এবং এমন এক ব্যক্তি, যে ইসলামকে প্রত্যাখ্যান করে তাকে বাংলায় অমুসলিম এবং ইংরেজীতে ‘ননমুসলিম’ বলা হয়।
যদি কোনো অমুসলিম তাকে অমুসলিম অথবা কাফের বলাকে গালি মনে করেন তা হলে ইসলাম সম্পর্কে তার ভুল ধারণা ছাড়া এটাকে আর কিছুই বলা যায় না। ইসলাম ও ইসলামী পরিভাষা সম্পর্কে ভালো করে জেনে নেবার জন্য তাকে ইসলামের মূল উৎস কুরআন ও বিশদ্ধ হাদীস থেকে জ্ঞান লাভ করতে হবে। তখন তিনি বুঝতে পারবেন এটা গালি তো নয়ই বরং যথাযোগ্য পারিভাষা ব্যবহারে জন্য ইসলামকে ধন্যবাদ না জানিয়ে পারবেন না।

বিদ‘আতের দশটি কুফল
Posted by shabab • অক্টোবর 2, 2012 • Printer-friendly
Download article as PDF

প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না

এমন অনেকের সাক্ষাত পাবেন যারা ইসলামী চেতনায় সমৃদ্ধ। কিন্তু বলেন, বিদ‘আতের বিরোধিতায় এত বাড়াবাড়ির কি দরকার? কেহ একটু মীলাদ পড়লে, কুলখানি বা চল্লিশা-চেহলাম পালন কিংবা এ জাতীয় কিছু করলে দ্বীন ইসলামের কি এমন ক্ষতি হয়ে যায়?
আমি একদিন এক মাসজিদের ইমাম সাহেবের বক্তব্য শুনছিলাম। তিনি বলছিলেন শবে মিরাজ উপলক্ষ্যে এ রাতে কোন বিশেষ সালাত, ইবাদাত-বন্দেগী বা সিয়াম নেই। যদি শবে মিরাজ উপলক্ষ্যে কোন ‘আমল করা হয় তা বিদ‘আত হিসাবেই গণ্য হবে। তার এ বক্তব্য শেষ হতে না হতেই কয়েকজন শিক্ষিত শেণীর মুসল্লী বলে উঠলেন, হুজুর এ কি বলেন! রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুহাব্বতে এ রাতে কিছুকরলে বিদ‘আত হবে কেন? প্রশ্নকারী লোকগুলোযে বিভ্রান্ত বা বিদ‘আতপন্থী তা কিন্তু নয়। তাদের খারাপ কোন উদ্দেশ্য নেই। কিন্তু তারা যা করার ইচ্ছা করেছেন, উহার ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে তাদের ধারণা নেই।
অবশ্যই রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুহব্বত ঈমানের অঙ্গ। আর সব ধরনের মুহাব্বতেই আবেগ থাকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুহব্বতেও থাকবে। কিন্তুসেই আবেগ যেন মুহব্বতের নীতিমালা লংঘন না করে। সেই আবেগভরা মুহাব্বত যেন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ ও সুন্নাহর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত না হয়। যদি এমনটি হয় তাহলে বুঝতে হবে যে, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুহাব্বতের নামে শয়তান তাকে ধোকায় ফেলেছে।
এ কথাতো মুসলিমদের কাছে দিবালোকের মত স্পষ্ট যে, খৃষ্টানরা বিদ‘আতী কাজ-কর্ম করে ও তাদের নবীর মুহব্বতে বাড়াবাড়ি করে পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে। এ কথা যেমন আল-কুরআনে এসেছে, তেমনি হাদীসেও আলোচনা করা হয়েছে। আমি অতি সংক্ষেপে এখানে বিদ‘আতের কতিপয় পরিণাম সম্পর্কে আলোচনা করছি
(১) বিদআত মানুষকে পথভ্রষ্ট করে
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা উম্মতের জন্য নিয়ে এসেছেন তা হল হক্ক। এ ছাড়া যা কিছুধর্মীয় আচার হিসাবে পালিত হবে তা পথভ্রষ্টতা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন :
হক আসার পর বিভ্রান্তি ব্যতীত আর কি থাকে? (সূরা ইউনূস, ৩২)
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
সকল ধরনের বিদ‘আত পথভ্রষ্টতা।(মুসলিম, ইবনে মাজাহ)
(২) বিদ‘আত রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্য থেকে মানুষকে বের করে দেয় এবং সুন্নাতের বিলুপ্তি ঘটায়
কেননা বিদ‘আত অনুযায়ী কেউ ‘আমল করলে অবশ্যই সে এক বা একাধিক সুন্নাত পরিত্যাগ করে। উলামায়ে কিরাম বলেছেন :
“যখন কোন দল সমাজে একটা বিদ‘আতের প্রচলন করে, তখন সমাজ থেকে কম করে হলেও একটি সুন্নাত বিলুপ্ত হয়ে যায়।”
আর এটা অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত যে, যখনই কোন বিদ‘আত ‘আমলে আনা হয়েছে তখনই সেই স্থান থেকে একটি সুন্নাত চলে গেছে বা গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে। এ প্রসঙ্গে মুজাদ্দিদ আলফেসানীর মাকতুবাত থেকে উদ্ধৃতি দেয়া যায়। তিনি লিখেছেন : এক ব্যক্তি আমাকে প্রশ্ন করল : ‘আপনারা বলেছেন : যে কোন বিদ‘আত নাকি একটি সুন্নাতকে বিলুপ্ত করে। আচ্ছা, যদি মৃত ব্যক্তিকে কাফনের সাথে একটি পাগড়ী পড়িয়ে দেয়া হয় তাহলে কোন সুন্নাতটি বিলুপ্ত হয়? কি কারণে এটা বিদ‘আত বলা হবে?’
আমি জবাবে লিখলাম : অবশ্যই একটি সুন্নাত বিলুপ্ত হয় যদি মৃতের কাফনে পাগড়ী দেয়া হয়। কারণ পুরুষের কাফনের সুন্নাত হল কাপড়ের সংখ্যা হবে তিন। পাগড়ী পড়ালে এ সংখ্যা আর ‘তিন’ থাকেনা, সংখ্যা দাড়ায় ‘চার।’
উদাহরণ হিসাবে আরো বলা যায়, এক ব্যক্তি ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়ল। ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না। এ সমস্যার জন্য এক পীর সাহেবের কাছে গেল। পীর সাহেব তাকে বললেন, তুমি এক খতম কুরআন বখশে দাও অথবা নির্দেশ দিলেন একটা মীলাদ দাও বা খতমে ইউনূসের ব্যবস্থা কর। সে তাই করল। ফলাফল কি দাড়াল? ঋণ পরিশোধে অক্ষম ব্যক্তির জন্য একটি দু‘আ রয়েছে যা ‘আমল করা সুন্নাত। বিদ‘আত অনুযায়ী ‘আমল করার কারণে সে সেই সুন্নাতটি পরিত্যাগ করল। জানার চেষ্টা করলনা যে, এ ক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি ব্যবস্থা দিয়ে গেছেন। অন্যদিকে সে মিলাদ, কুরআন খতম ইত্যাদি বিদ‘আতী কাজ করে আরও আর্থিক ঋণভারে জর্জরিত হলো।
রামাযানের শেষ দশ দিনের রাতসমূহে রাত জেগে ইবাদাত-বন্দেগী করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত, যা কেউ অস্বীকার করতে পারে না। কিন্তু ১৫ শাবানে রাত জাগাকে যেমন গুরুত্ব দেয়া হয় তেমনভাবে এ সুন্নাতী ‘আমলের প্রচলন দেখা যায় না। বরং শবে কদরের মূল্যায়ন শবে বরাতকে করা হচ্ছে। ফরয সালাত আদায়ের পর সর্বদা জামাতবদ্ধ হয়ে মুনাজাত করা একটি বিদ‘আত। এটা ‘আমল করার কারণে ফরয সালাত আদায়ের পর যে সকল যিকর-আযকার সুন্নাত হিসাবে বর্ণিত আছে তা পরিত্যাগ করা হয়।
আপনি দেখবেন এভাবে প্রতিটি বিদ‘আত একটি সুন্নাতকে অপসারিত করে উহার স্থান দখল করে নিয়েছে।
(৩) বিদ‘আত আল্লাহর দ্বীনকে বিকৃত করে
এর জ্বলন্ত উদাহরণ আজকের খৃষ্টান ধর্ম। তারা ধর্মের বিদ‘আত প্রচলন করতে করতে উহার মূল কাঠামো পরিবর্তন করে আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে পথভ্রষ্ট হিসাবে অভিহিত হয়েছে। তাদের বিদ‘আত প্রচলনের কথা আল-কুরআনে উলেখ− করা হয়েছে :
আর সন্ন্যাসবাদ! ইহাতো তারা নিজেরাই আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় প্রচলন করেছিল। আমি তাদের এ বিধান দেইনি। (সূরা হাদীদ, ২৭)
সন্ন্যাসবাদ তথা বৈরাগ্যবাদের বিদ‘আত খৃষ্টানেরা তাদের ধর্মের প্রবর্তন করেছে। তাদের উদ্দেশ্য ভাল ছিল; উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি। কিন্তু ভাল উদ্দেশ্য নিয়ে নিজেদের ইচ্ছামত যে কোন কাজ করলেই তা গ্রহণযোগ্য হয় না। এ জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুমোদন প্রয়োজন। এভাবে যারা ধর্মের বিদ‘আতের প্রচলন করে তাদের অনেকেরই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ভাল থাকে। কিন্তু তাতে নাজাত পাওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। ইয়াহুদী ও খৃষ্টানেরা তাদের ধর্মের অন্য জাতির রসম-রেওয়াজ ও বিদ‘আত প্রচলন করে ধর্মকে এমন বিকৃত করেছে যে, তাদের নবীগণ যদি আবার পৃথিবীতে ফিরে আসেন তাহলে তাদের রেখে যাওয়া ধর্ম তাঁরা নিজেরাই চিনতে পারবেন না।
আমাদের মুসলিম সমাজে শিয়া সম্প্রদায় বিদ‘আতের প্রচলন করে দ্বীন ইসলামকে কিভাবে বিকৃত করেছে তা নতুন করে বর্ণনা করার প্রয়োজন নেই।
(৪) বিদ‘আত ইসলামের উপর একটি আঘাত
যে ইসলামে কোন বিদ‘আতের প্রচলন করল সে মূলতঃ অজ্ঞ লোকদের মত এ কথা স্বীকার করে নিল যে, ইসলাম পরিপূর্ণ জীবন বিধান নয়, তাতে সংযোজনের প্রয়োজন আছে। যদিও সে মুখে এ ধরনের বক্তব্য দেয় না, কিন্তু তার কাজ এ কথার স্বাক্ষী দেয়। অথচ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন :
আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম। (সূরা মায়িদা,৩)
(৫) বিদ‘আত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে খিয়ানাতের এক ধরনের অভিযোগ
যে ব্যক্তি কোন বিদ‘আতের প্রচলন করল বা ‘আমল করল আপনি তাকে জিজ্ঞেস করুন “এ কথা বা কাজটি যে ইসলাম ধর্মের পছন্দের বিষয় এটা কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানতেন? তিনি উত্তরে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ বলবেন। যদি ‘না’ বলেন তাহলে তিনি স্বীকার করে নিলেন যে, ইসলাম সম্পর্কে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কম জানতেন। আর যদি ‘হ্যাঁ’ বলেন তাহলে তিনি স্বীকার করে নিলেন যে,আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিষয়টি জানতেন, কিন্তু উম্মাতের মধ্যে প্রচার করেননি। এ অবস্থায় তিনি তাবলীগে শিথিলতা করেছেন। (নাউ‘যুবিল্লাহ!)
(৬) বিদ‘আত মুসলিম উম্মাহকে বিভক্ত করে ও ঐক্য সংহতিতে আঘাত করে
বিদ‘আত মুসলিম উম্মাহর মধ্যে শত্রুতা ও বিবাদ-বিচ্ছেদ সৃষ্টি করে তাদের মারামারি হানাহানিতে লিপ্ত করে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় যে, একদল লোক মীলাদ বা মীলাদুন্নবী পালন করল। আরেক দল বিদ‘আত হওয়ায় তা বর্জন বা বিরোধিতা করল। যারা এটা পালন করল তারা প্রচার করতে লাগল যে, অমুক দল আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মদিনে আনন্দিত হওয়া পছন্দ করে না। তাঁর গুণ-গান করা তাদের কাছে ভাল লাগেনা। তাদের অন্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুহাব্বত নেই। যাদের অন্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুহাব্বত নেই তারা বেঈমান, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুশমন। আর এ ধরনের প্রচারনায় তারা দুটি দলে বিভক্ত হয়েএকে অপরের দুশমনে পরিণত হয়ে হানাহানিতে লিপ্ত হয়ে পড়ল। এভাবে ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকেই বিদ‘আতকে গ্রহণ ও বর্জনের প্রশ্নে মুসলিম উম্মাহ শিয়া ও সুন্নি এবং পরবর্তী কালে আরো শত দলে বিভক্ত হয়ে গেল। কত প্রাণহানির ঘটনা ঘটল, রক্তপাত হল।
তাই মুসলিম উম্মাহকে আবার একত্র করতে হলে সকলকে কুরআন ও সুন্নাহর দিকে আহ্বান ও বিদ‘আত বর্জনের জন্য অহিংস ও শান্তিপূর্ণপন্থায় পরম ধৈর্য্যের সাথে আন্দোলন করতে হবে। আন্দোলন করতে হবে সকল মানুষ ও মানবতার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসা প্রদর্শন করে । কারো অনুভূতিতে আঘাত লাগে এমন আচরণ করা যাবে না। এ বিশ্বাস রাখতে হবে যে, যা হক ও সত্য তা-ই শুধু টিকে থাকবে। আর যা বাতিল তা দেরীতে হলেও বিলুপ্ত হবে।
(৭) বিদ‘আত ‘আমলকারীর তাওবা করার সুযোগ হয় না
বিদ‘আত যিনি প্রচলন করেন বা সেই অনুযায়ী ‘আমল করেন তিনি এটাকে এক মহৎ কাজ বলে মনে করেন। তিনি মনে করেন এ কাজে আল্লাহ তা‘আলা সন্তুষ্ট হবেন। যেমন আল্লাহ খৃষ্টানদের সম্পর্কে বলেছেন তারা ধর্মের বৈরাগ্যবাদের বিদ‘আত চালু করেছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য। যেহেতু বিদ‘আতে লিপ্ত ব্যক্তি বিদ‘আতকে পাপের কাজ মনে করেন না, তাই তিনি এ কাজ থেকে তাওবা করার প্রয়োজন মনে করেন না এবং তাওবা করার সুযোগও হয় না। অন্যান্য পাপের বেলায় কমপক্ষে যিনি পাপে লিপ্ত হন তিনি এটাকে অন্যায় মনে করেই করেন। পরবর্তীতে তার অনুশোচনা আসে, এক সময় তাওবা করে আল্লাহ তা‘আলার ক্ষমা লাভ করেন। কিন্তুবিদ‘আতে লিপ্ত ব্যক্তির এ অবস্থা কখনো হয় না।
(৮) বিদ‘আত প্রচলনকারী রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের শাফাআত পাবে না
রাহমাতুলি−ল আলামীন সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর গুনাহগার উম্মাতের শাফায়াতের ব্যাপারে হাশরের ময়দানে খুব আগ্রহী হবেন । আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে অনুমতি লাভ করার পর তিনি বহু গুনাহগার বান্দা-যাদের জন্য শাফাআত করতে আল্লাহ তা‘আলা অনুমতি দিবেন-তাদের জন্য শাফাআত করবেন। কিন্তু বিদ‘আত প্রচলনকারীর জন্য তিনি শাফাআত করবেন না।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
শুনে রেখ! হাউজে কাউছারের কাছে তোমাদের সাথে আমার দেখা হবে। তোমাদের সংখ্যার আধিক্য নিয়ে আমি গর্ব করব। সেই দিন তোমরা আমার চেহারা মলিন করে দিওনা। জেনে রেখ! আমি সেদিন অনেক মানষু কে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করার চেষ্টা চালাব। কিন্তু তাদের অনেককে আমার থেকে দূরে সরিয়ে নেয়া হবে। আমি বলব : হে আমার প্রতিপালক! তারা তো আমার প্রিয় সাথী-সঙ্গী, আমার অনুসারী। কেন তাদের দূরে সরিয়ে দেয়া হচ্ছে? তিনি উত্তর দিবেন : আপনি জানেন না যে, আপনার চলে আসার পর তারা ধমের্র মধ্যে কি কি নতুন বিষয় আবিস্কার করেছে। (ইবনে মাজাহ)
অন্য এক বর্ণনায় আছে এর পর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই তাদের উদ্দেশে বলবেন : দূর হও! দূর হও!!
(৯) বিদ‘আত মুসলিম সমাজে কুরআন ও হাদীসের গুরুত্ব কমিয়ে দেয়
কুরআন ও সুন্নাহ হল মুসলিম উম্মাহ ও ইসলামের রক্ষা কবচ। ইসলাম ধর্মের অস্তিত্বের একমাত্র উপাদান। তাইতো বিদায় হজ্জেও নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
আমি তোমাদের জন্য দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি যতক্ষণ তোমরা তা আঁকড়ে রাখবে ততক্ষণ বিভ্রান্ত হবে না।
বিদ‘আত অনুযায়ী ‘আমল করলে কুরআন ও সুন্নাহর মর্যাদা মানুষের অন্তর থেকে কমে যায়। ‘যে কোন নেক ‘আমল কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত হতে হবে’ – এ অনুভূতি মানুষের অন্তর থেকে ধীরে ধীরে লোপ পেতে থাকে। তারা কুরআন ও হাদীসের উদ্ধৃতি বাদ দিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি, পীর-মাশায়েখ ও ইমামদের উদ্ধৃতি দিয়ে থাকে।
(১০) বিদ‘আত প্রচলনকারী অহংকারের দোষে দুষ্ট হয়ে পড়ে ও নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থে দ্বীনকে ব্যবহার ও বিকৃত করতে চেষ্টা করে
বিদ‘আত প্রচলনকারী তার নিজ দলের একটি আলাদা কাঠামো দাঁড় করিয়ে ব্যবসায়িক বা আর্থিক সুবিধা লাভের জন্য এমন কাজের প্রচলন করে থাকে যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্মীয় রূপ লাভ করলেও কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা সমর্থিত হয় না। কারণ সেই কাজটা যদি কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা সমর্থিত হয় তাহলে তার দলের আলাদা কোন বৈশিষ্ট থাকে না। কেননা কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত ‘আমল সকল মুসলিমের জন্যই প্রযোজ্য। তাই সে এমন কিছুআবিস্কার করতে চায় যার মাধ্যমে তার দলের আলাদা পরিচয় প্রতিষ্ঠা করা যায়।
এ অবস্থায় যখন হাক্কানী উলামায়ে কিরামগণ এর প্রতিবাদ করেন বা এ কাজটি চ্যালেঞ্জ করেন তখন তার ঔদ্ধত্য বেড়ে যায়। নিজেকে সে কুতুবুল আলম, ইমাম-সম্রাট, হাদীয়ে উম্মাত, রাহবারে মিল্লাত, যিল্লুর রহমান বলে দাবী করতে থাকে। প্রচার করতে থাকে এ দুনিয়ায় সে’ই একমাত্র হক পথে আছে, বাকী সবাই ভ্রান্ত।

*রিপোর্ট করুন

প্রতিদিন ফ্রী আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন

‘আপনিও হোন ইসলামের প্রচারক’। প্রবন্ধের লেখা অপরিবর্তন রেখে এবং উৎস উল্লেখ্য করে আপনি Facebook, Twitter, ব্লগ, আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন, মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। “কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা” [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]

অসীলাহ বলতে কি বোঝায় ও শরীয়াত সম্মত অসীলাহ কি কি
Posted by QuranerAlo Editor • নভেম্বর 4, 2012 • Printer-friendly
Download article as PDF

প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন না

আত্তাওয়াস্সুল এর আভিধানিক অর্থ ‘নৈকট্য লাভ করা’। অসীলাহ হচ্ছে যার মাধ্যমে অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌছা যায়। অর্থাৎ অসীলাহ হচ্ছে সেই উপায় ও মাধ্যম যা লক্ষ্যে পৌছিয়ে দেয়। ইবনুল আছীর (রাহিমাহুল্লাহ) প্রণীত নিহায়াত্ গ্রন্থে এসেছে আলঅসিল অর্থ আররাগিব অর্থাৎ আগ্রহী। আর অসীলাহ্ অর্থ নৈকট্য ও মাধ্যম বা যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট বস্তু পর্যন্ত পৌছা বা নিকটবর্তী হওয়া যায়। অসীলাহর বহু বচন হচ্ছে অসায়েল। (আন্নিয়াহায়াত ৫খন্ড ১৮৫ পৃষ্ঠা) কাসূম অভিধানে এসেছে, অর্থাৎ, এমন আমল করা যার মাধ্যমে নৈকট্য অর্জন করা যায়। ইহা তাওয়াস্সুলের অনুরূপ অর্থ। (ক্বামূসুল মুহীত্ব ৪র্থ খন্ড ৬১২পৃঃ)
কুরআনে অসীলাহর অর্থ
ইতিপূর্বে অসীলাহর যে আভিধানিক অর্থ বর্ণনা করেছি। সালাফগণ (পূর্বসূরী বিদ্বান তথা সাহাবা ও তাবেঈগণ) কুরআনে উল্লেখিত অসীলাহ শব্দের অর্থ তাই করেছেন। যা সৎ কর্মের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা অর্থের বহির্ভূত নয়। কুরআন কারীমে দু’টি সূরার দু’টি আয়াতে অসীলাহ শব্দটির উলেখ এসেছে। সূরা দু’টি হচ্ছে মায়িদাহ ও ইসরা।

আয়াত দু’টি নিম্নরূপঃ অর্থঃ
“হে মুমিনগণ তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর নিকট অসীলাহ সন্ধান কর এবং তাঁর পথে জিহাদ কর। অবশ্যই মুক্তিপ্রাপ্ত হবে।” (সুরা মায়িদাহঃ ৩৫)
“তারা (কতিপয় জনসমষ্টি) যাদেরকে আহ্বান করে তারাই তাদের প্রতিপালকের নিকট অসীলাহ সদ্ধান করে। তাদের মধ্যে কে অধিক নিকটবর্তী; আর তারা তার (আল্লাহর) রহমতের আশা করে ও তার আযাবকে ভয় করে। নিশ্চয় তোমার প্রতিপালকের আযাব ভীতিযোগ্য।” (সুরা ইসরা ৫৭)

প্রথম আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমামুল মুফাসসিরীন হাফিয ইবনু জারীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেনঃ তোমাদের প্রতি আরোপিত যাবতীয় আদেশ ও নিষেধ মান্য করতঃ আনুগত্যের সাথে আল্লাহর ডাকে সাড়া দাও। অর্থাৎ আল্লাহর নিকট নৈকট্য তালাশ কর তাকে সন্তুষ্টকারী আমলের মাধ্যমে।
হাফিয ইবনু কাছীর ইবনু আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, অসীলাহ অর্থ নৈকট্য। অনুরূপ অর্থ সংকলিত হয়েছে মুজাহিদ, হাসান, আব্দুলাহ বিন কাছীর, সুদ্দী, ইবনু যায়েদ ও অপরাপরগণ থেকে। কাতাদাহ থেকেও এরূপ সংকলিত হয়েছে। আল্লাহর নৈকট্য থেকেও এরূপ সংকলিত হয়েছে। আল্লাহর নৈকট্য অর্জন কর তাঁর আনুগত্যের মাধ্যমে ও তাকে সন্তুষ্টিকারী আমলের মাধ্যমে। অতঃপর ইবনু কাছীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ এ সকল নেতৃস্থানীয় আলিমগণ আয়াতের তাফসীরে যা বলেছেন এতে (নির্ভরযোগ্য) তাফসীরকারদের মাঝে কোন দ্বিমত নেই। আর তা হচ্ছে এই যে, অসীলাহ হচ্ছে ঐ বিষয় যার মাধ্যমে অভিষ্ঠ লক্ষ্য উদ্দেশ্যে পৌছা যায়। (তাফসীর ইবনু কাছীর ৫খন্ড ৮৫ পৃষ্ঠা)
দ্বিতীয় আয়াতঃ বিশিষ্ট সাহাবী ইবনু মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার উপলক্ষ্য সম্পর্কে যা বলেছেন তাতে তার অর্থ স্পষ্ট হয়ে যায়। তিনি বলেছেন- অর্থঃ “কিছু সংখ্যক মানুষ কিছু সংখ্যক জ্বিনের পূজা করত, অতঃপর পূজ্য জ্বিন সম্প্রদায় ইসলাম গ্রহণ করে, কিন্তু তারা (ঐ মানব সম্প্রদায়) নিজেদের ধর্মে (জ্বিন পূজায়) বহাল থাকে”। (বুখারী শরীফ)
হাফিয ইবন হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ জ্বিনের পূজাকারী মানব সম্প্রদায় জ্বিন পূজায় বহাল থাকে, অথচ এ সকল জ্বিন তা পছন্দ করতো না, যেহেতু তারা ইসলাম গ্রহণ করে আল্লাহর নিকট অসীলাহ কামনা করতে শুরু করেছে। (ফাতহুল বারী ৮ম খন্ড ৩৯৭ পৃষ্ঠা) উক্ত আয়াতের এটাই হচ্ছে নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা। যেমনটি ইমাম বুখারী ইবনু মাসউদ থেকে বর্ণনাপূর্বক তার ছহীহ্ বুখারী গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন।
অসীলাহ বলতে যে ঐ সকল বিষয় বস্তু উদ্দেশ্য যার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা যায়, এ ব্যাপারে আয়াতটি অত্যন্ত স্পষ্ট। এজন্য আল্লাহবলেন, অর্থাৎ তারা সন্ধান করে এমন সৎ আমল যার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়।
দু’টি আয়াতের তাফসীর সম্পর্কে সালাফদের (পূববর্তী মুফাস্সিরদের) থেকে যা সংকলিত হয়েছে তা নির্দেশ করে আরবী ভাষা সম্পর্কে জ্ঞান (অভিধান) ও সঠিক বোধশক্তি।
পক্ষান্তরে,
যারা এ আয়াত দু’টি থেকে নবীগণ ও নেককারগণের অবয়ব সত্ত্বা আল্লাহর নিকট তাদের অধিকার ও সম্মানের অসীলাহ গ্রহণ করা বৈধ হওয়ার ব্যাপারে দলীল গ্রহণ করে থাকে তাদের ব্যাখ্যা বাতিল এবং বাক্যকে নিজের স্থান থেকে বিকৃত করণ,
শব্দকে তার প্রকাশ্য নির্দেশনা থেকে পরিবর্তন করণ
ও দলীলকে এমন অর্থে ব্যবহার করার শামিল যার সম্ভাবনা রাখে না।
তদুপরি এমন অর্থ কোন সালাফ তথা সাহাবাহ্ তাবিঈ ও তাদের অনুসারীগণ বা গ্রহণযোগ্য কোন তাফসীরকারক বলেননি। যখন প্রতিভাত হলো যে,
অসীলাহ শব্দের অর্থঃ ঐ সকল সৎকর্ম যার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা যায়। এবার এই সৎকর্মটির শরীয়ত সম্মত কিনা জ্ঞাত হওয়া বাঞ্ছনীয়।
কারণ, আল্লাহ এ সকল আমল নির্বাচন করার দায়িত্ব আমাদের দিকে সোপর্দ করেননি, বা তাহা চিহিৃত করার ভার আমাদের বিবেক ও রুচির উপর ছাড়া হয়নি। কেননা এমনটি হলে আমলে বৈপরিত্য ও বিভিন্নতা সৃষ্টি হতো। তাই আল্লাহ আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন আমলের ক্ষেত্রে তার দিকে প্রত্যাবর্তন করতে এবং তার নির্দেশনা ও শিক্ষার অনুসরণ করতে। কেননা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেনা কোন্ বিষয় তাকে সন্তুষ্ট করতে সক্ষম। সুতরাং আমাদের কর্তব্য হলো আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করার মাধ্যমগুলো জানা। আর তা এভাবে সম্ভব; প্রতিটি মাস্আলার (বিষয়) আল্লাহ ও তদীয় রাসূল (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যা প্রবর্তন ও বর্ণনা করেছেন তার দিকে প্রত্যাবর্তন করা। অর্থাৎ কুরআন ও সুন্নাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।

ইতিপূর্বে উল্লেখিত হয়েছে যে, কোন আমল সৎ হওয়ার জন্য তাকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে খাঁটি হতে হবে এবং আল্লাহর দেয়া নিয়ম অনুযায়ী হতে হবে। এ কথার ভিত্তিতে প্রমাণিত হয় যে,
তাওয়াস্সুল দু’ভাগে বিভক্ত শারঈ (শরীয়ত সম্মত) ও বিদঈ (বিদ’আতী বা শরীয়ত বিরোধী)

• শরীয়ত সম্মত অসীলাহ
কুরআন সুন্নাহ অধ্যয়ন করে শরীয়ত সম্মত অসীলাকে তিন ভাগে সীমাবদ্ধ পাওয়া গেছে।
• (ক) আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর অসীলাহ।
• (খ) সৎ আমলের অসীলাহ।
• (গ) সৎ ব্যক্তির দু’আর অসীলাহ।
প্রিয় পাঠক! আপনার সমীপে প্রকারগুলো দলীল সহ বিশদ বর্ণনা দেয়া হলোঃ-
• প্রথমতঃ আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর অসীলাহ ধারণ সম্পর্কেঃ আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর অসীলাহ গ্রহণ করার নিয়ম, যেমন মুসলিম ব্যক্তি তার দু’আয় বলবেঃ অর্থঃ “হে আল্লাহ তুমি প্রজ্ঞাময় পরাক্রমশালী করুণাময়, কৃপানিধান, আল্লাহ তাই তারই অসীলায় সমগ্র বস্তুকে পরিব্যপ্তকারী তোমার রহমতের অসীলায় তোমার নিকট আমার জন্য রহমত ও ক্ষমা ভিক্ষা করছি। অথবা অনুরূপ আল্লাহর সুন্দরতম নাম ও গুণাবলীর মাধ্যম ধরে দু’আ করবে।” কিতাব ও সুন্নাহ এ প্রকার অসীলাহর প্রতি নির্দেশ দান করেছে। আল্লাহ বলেনঃ অর্থঃ “আর আল্লাহর অনেক সুন্দরতম নাম রয়েছে। অতএব সেগুলোর অসীলায় তাকে আহবান কর এবং পরিত্যাগ কর ওদেরকে যারা তার নাম সমূহের ভিতর বিকৃতি সাধন করে”।(সূরা আ’রাফঃ ১৮০)
• দ্বিতীয়তঃ আল্লাহর নিকট সৎ আমলের দ্বারা অসীলাহ গ্রহণ করাঃ সৎ আমল যার ভিতর কবুল হওয়ার নির্ধারিত শর্ত পরিপূর্ণভাবে বিদ্যমান*।আল্লাহ্‌র নিকট সৎ আমলের দ্বারা অসীলাহ গ্রহণ করা আর তা এরূপ যেন দু’আকারী বলবে- অর্থঃ “হে আল্লাহ! তোমার প্রতি আমার ঈমান,তোমার জন্য আমার ভালবাসা এবং তোমার রাসূলের অনুসরণ ও অনুকরণের অসীলায় আমাকে ক্ষমা করো।” আরো এরূপ শরীয়ত সম্মত দু’আহর অসীলাহ গ্রহণ করা যায়। এ সকল অসীলাহ নির্দেশনায় কুরআন থেকে আল্লাহ তা’আলার কিছু বাণী উদ্ধৃত হলোঃ অর্থঃ “হে আমাদের প্রতিপালক নিশ্চিতরূপে আমরা ঈমান এনেছি অতএব আমাদের গুনাহ্ সমূহ ক্ষমা করা এবং নরকের শান্তি থেকে রক্ষা কর।” (সূরা আলে ইমরানঃ ১৬)
আরো আল্লাহর বাণীঃ অর্থঃ
“হে আমাদের প্রতিপালক তুমি যা অবতীর্ণ করেছে আমরা তার উপর ঈমান এসেছি এবং তোমার রাসূলের অনুসরণ করেছি অতএব আমাদেরকে সাক্ষ্যপ্রদানকারীদের (মুহাম্মদী উম্মাতের সৎকর্মশীল বান্দাদের) দলে লিপিবদ্ধ কর।” (আলে ইমরানঃ ৫৩)
আরো আল্লাহর বাণীঃ অর্থঃ
“হে আমাদের রব! আমরা শ্রবণ করেছি ‘তোমাদের প্রতিপালকের উপর ঈমান আনো বলে’ ঘোষণা প্রদানকারীর ঘোষণা অতঃপর আমরা ঈমান এনেছি, অতএব আমাদের গুনাহ্সমূহ ক্ষমা কর এবং আমাদের পাপরাশি মোচন কর এবং সৎ ব্যক্তিদের সাথে মৃত্যু দান কর।” (সূরা আলে ইমরানঃ ১৯৩)
সুন্নাহ থেকে বুরাইদা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাদীস প্রনিধানযোগ্য, অর্থঃ বুরাইদাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন,
নবী (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক ব্যক্তিকে বলতে শুনলেন, হে আল্লাহ আমি তোমার নিকট এই অসীলাই চাচ্ছি যে, আমি সাক্ষ্য প্রদান করছি তুমি সেই আল্লাহ যিনি ব্যতীত আর কেউ প্রকৃত উপাস্য নেই। তুমি একক, মুখাপেক্ষীহীন, যিনি কাউকে জন্ম দেননি, এবং কেউ তাঁকে জন্ম দেয়নি তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই। এতদশ্রবণে নবী (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, এ ব্যক্তি আল্লাহর নিকট তাঁর এমন সুমহান নামের অসীলায় আবেদন করেছে যে, তার মাধ্যমে আবেদন করা হলে, প্রদান করেন এবং প্রার্থনা করা হলে, কবুল করেন (হাদীসটি বর্ণনা করেছেন তিরমিযী ও ইবনু মাজাহ)
আরো এ বিষয়ে সাক্ষ্য প্রদান করে তিন ব্যক্তির ঘটনা সম্বলিত আব্দুলাহ্ বিন উমার (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এর হাদীস। তারা এক গর্তে প্রবেশ করে আশ্রয় নিলে একটি পাথর উপর থেকে নিক্ষিপ্ত হয়ে গর্তের মুখ বন্ধ করে দেয়। এমতাবস্থায় তারা একে অপরকে বলল, তোমরা তোমাদের সৎ আমলসমূহের অসীলায় আল্লাহ আল্লাহর নিকট দু’আ কর। অতঃপর তাদের একজন পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহারের দ্বারা অসীলাহ্ গ্রহণ করল। দ্বিতীয় ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে অবাধ্যতায় কাজ থেকে বিরত হওয়ার অসীলাহ গ্রহণ করল। তাঁর চাচাতো বোনকে আয়ত্তে পাওয়ার পর যখন সে আলাহ্কে স্মরণ করিয়ে দেয় তখন সে আল্লাহর ভয়ে তাকে ছেড়ে দেয়। তৃতীয় ব্যক্তি তার আমানত দারিতা ও সততার অসীলাহ গ্রহণ করল। আর তা এভাবে, এক শ্রমিক তার পারিশ্রমিক ছেড়ে চলে গেলে সে তার পারিশ্রমিক সম্পদকে বিপুল সম্পদে পরিণত করে। পরবর্তীকালে সে এসে তার সমস্ত সম্পদ নিয়ে যায় কিছুই ছেড়ে যায়নি। (বুখারী ও মুসলিম হাদীসটি বর্ণনা করেছেন) এখানে ঘটনার সারাংশের উলেখ করা হয়েছে। ঘটনাটি মুসলিম ব্যক্তির খুলুসিয়াত পূর্ণ আমলের অসীলাহ গ্রহণ শরীয়ত সম্মত হওয়ার প্রতি নির্দেশ করে।
• তৃতীয়তঃ আল্লাহর নিকট সৎ ব্যক্তির দু’আর অসীলাহ গ্রহণ যেমন মুসলিম ব্যক্তি চরম সংকটে পড়লে বা তার উপর কোন বিপদ আপতিত হলে এবং নিজেকে আল্লাহর হক আদায়ে ক্রটি সম্পন্ন মনে করলে সে আল্লাহর নিকট মজবুত উপায় গ্রহণ করতে ভালবাসে। এজন্য এমন এক ব্যক্তির নিকটগমন করে থাকে যাকে পরহেযগারী, পরিশুদ্ধি, মর্যাদা ও কুরআন-হাদীসের বিদ্যায় অধিক উপযুক্ত মনে করে তার নিকট বিপদমুক্তির ও দুশ্চিন্তা দূরীকরণের জন্য আল্লাহর নিকট দু’আ করার আবেদন করে। এ ব্যাপারে সুন্নাহ ও সাহাবাগণের আচরণ নির্দেশ করে।
সুন্নাহ থেকে দলীলঃ আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এর বর্ণিত হাদীস
“এক পল্লীবাসী নবী (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মিম্বরে খুৎবাহ দানকালে মসজিদে প্রবেশ করে বলল, হে আল্লাহর রাসূল আমাদের সম্পদ নষ্ট হয়ে গেল, রাস্তা ঘাট বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল অতএব আপনি আল্লাহর নিকট দু’আ করুন যেন তিনি আমাদেরকে বৃষ্টি দান করেন। নবী (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দু’খানা হাত উঠিয়ে দু’আ করলেন, এ পরিমাণ হাত উঠিয়েছিলেন যে, আমি তার বগলের শুভ্রতা পর্যন্ত দেখেছিলাম। (দু’আটি এই) অর্থঃ “হে আল্লাহ! আমাদের বৃষ্টি দান কর, হে আল্লাহ! আমাদেরকে বৃষ্টি দান কর, হে আল্লাহ! আমাদেরকে বৃষ্টি দান কর। লোকেরাও তাদের হাত উঠিয়ে দু’আ করলো। আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আল্লাহর কসম করে বলছি, (দু’আর পূর্বে) আমরা আসমানে ব্যাপক অংশ জুড়ে মেঘের একটিও খন্ড দেখি নাই, আমাদের মাঝে ও সিলা’র মাঝে কোন ঘরবাড়ীও ছিলনা। দু’আর পর রাসূল (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর পিছন দিক থেকে মেঘ প্রকাশিত হলো ঢালের ন্যায়। আসমানের মাঝা-মাঝি স্থানে এসে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়লো এবং বর্ষিত হলো। সেই যাতের কসম যার হাতে আমার জীবন নবী (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাত রাখেননি যে পর্যন্ত মেঘমালা পাহাড় সম আকারে বিস্তৃতি লাভ না করেছিল। অতঃপর মিম্বর থেকে অবতরণ করার পূর্বেই তার দাড়ির উপর দিয়ে বৃষ্টি গড়িয়ে পড়তে দেখেছি। অতঃপর তিনি সালাত আদায় করলেন এবং আমরা সালাতান্তে বের হলাম পানিতে ভিজতে ভিজতে বাড়ীতে পৌছলাম। দ্বিতীয় জুমু’আহ্ পর্যন্ত এ বৃষ্টি অব্যাহত থাকে। অতঃপর ঐ পল্লীবাসী লোকটি কিংবা অন্য কোন ব্যক্তি এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করুন, যেন তিনি আমাদের থেকে বৃষ্টি বন্ধ করে দেন। নবী (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মৃদু হাসলেন এবং তার হাত দু’খানা উত্তোলন পূর্বক বললেন, অর্থঃ “হে আল্লাহ আমাদের আশে পাশে বৃষ্টি বর্ষণ করুন, আমাদের উপর নয়। হে আল্লাহ ঢিলার উপর, ছোট ছোট পাহাড়ের উপর, মাঠের ভিতর ও গাছপালা উৎপাদনস্থলগুলোতে। (বুখারী ও মুসলিম) মেঘ সরে গেল এবং মদীনার পাশ্বস্ত ভূমিগুলিতে বর্ষিতে লাগল, মদীনায় আর একটুও বৃষ্টি বর্ষিত হলো না।
সাহাবাগণের আমল হতে প্রমাণ:
এ মর্মের হাদীসটিও আনাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিতঃ
লোকেরা যখন অনাবৃষ্টিতে ভুগতো তখন উমার (রাদিয়াল্লাহু আনহু) আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিব এর মাধ্যমে বৃষ্টি চাইতেন। তিনি বলতেন, অর্থঃ “হে আল্লাহ! আমরা তোমার নিকট আমাদের নবীর অসীলা ধারণ করলে তুমি আমাদেরকে বৃষ্টি দিয়ে থাকতে, আর এখন আমরা তোমার নিকট আমাদের নবীর চাচার অসীলাহ ধারণ করছি। অতএব আমাদেরকে বৃষ্টি দান কর। বর্ণনাকারী বলেন, ফলে তারা বৃষ্টি প্রাপ্ত হতো। (বুখারী)
উমার (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এর বাণী আমরা তোমার নিকট আমাদের নবীর অসীলাহ ধারণ করতাম এখন আমরা তোমার নিকট আমাদের নবীর চাচার অসীলা ধারণ করছি, এর অর্থঃ আমরা আমাদের নবীর শরণাপন্ন হতাম এবং তাঁর নিকট দু’আর আবেদন করতাম এবং তাঁর দু’আর অসীলায় আল্লাহর নৈকট্য কামনা করতাম। আর এমন যেহেতু তিনি উর্দ্ধতন বন্ধুর সান্নিধ্যে চলে গেছেন (মৃত্যুবরণ করেছেন) সেহেতু আমাদের জন্য তাঁর পক্ষে দু’আ সম্ভব নয় তাইআমরা নবীর চাচার সম্মুখীন হচ্ছি এবং আমাদের জন্য দু’আর আবেদন করছি। এসব কথার অর্থ এটা নয় যে, তাঁরা তাদের দু’আয় এরূপ বলতেন, হে আল্লাহ তোমার নবীর সম্মানের অসীলায় আমাদেরকে বৃষ্টি দান কর। অতঃপর তার মৃত্যুর পর তারা বলতেন, হে আল্লাহ! আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর মান মর্যাদার অসীলায় আমাদের বৃষ্টি দান কর ! কারণ এ ধরনের দু’আ বিদআতী। কুরআন ও সুন্নাহতে এর কোন ভিত্তি নেই। এরূপ অসীলাহ পূর্বসূরী কোন বিদ্বান ধারণ করেননি।
অনুরূপভাবে মু’আবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর যুগে ইয়াযীদ বিন আস্অদ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর অসীলাহতে অর্থাৎ তাঁর দু’আর অসীলাহতে বৃষ্টি চেয়েছিলেন। তিনি (ইয়াযীদ) সম্মানিত তাবেঈগনের একজন ছিলেন।
এখানে বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়, যদি ব্যক্তিসত্তা, সম্মান ও মর্যাদার অসীলাহ ধারণ করা শরীয়ত সম্মত হতো তাহলে উমার ও মু’আবিয়াহ (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) আল্লাহর রাসূল (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অসীলাহতে পানি চাওয়া বাদ দিয়ে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ও ইয়াযীদ বিন আস্অদ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর অসীলাহ ধারণ করার শরণাপন্ন হতেন না।

JOBAV DIN

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: